নীরবতা কুণ্ডলীতে নিমজ্জিত গাজীপুরের বেহিসাবিরা

আসাদুল্লাহ বাদল

05 Jul, 2020 12:31pm


নীরবতা কুণ্ডলীতে নিমজ্জিত গাজীপুরের বেহিসাবিরা
আসাদুল্লাহ বাদল

রাস্তায় দেখা হলে অনেকে বলে আপনি তো বেশ ‘সরব’। এই কথাটি অনলাইন কেন্দ্রিক হলে মতটি অনলাইনেই প্রকাশ করা উচিত। কিন্তু কোন ভয় তাড়িয়ে বেড়ায় যে অনলাইনে এই সামান্য মতটিও প্রকাশ করতে পারে না। এভাবেই একটি গণতান্ত্রিক মত হারায়। নিমজ্জিত হয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও গণযোগাযোগের একটি আলোচিত ও বিতর্কিত তত্ত্ব ‘নীরবতা কুণ্ডলী’। জনমতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অল্পবিস্তর ধারণার মত এটি। সমাজে মানুষের মত প্রকাশ, বিতর্কিত কোন বিষয়ের জনমতের গঠন প্রক্রিয়া ও প্রভাব সম্পর্কে একটি কার্যকর তাত্ত্বিক কাঠামো প্রদান করে।

১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে এই মতের যাত্রা শুরু হলেও ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে এটি ছাপা যোগ্য হয়ে জনগণের সামনে আসে। প্রথমে এটি আলোচিত হয়েছিল মনোবিজ্ঞানের একটি গবেষণা হিসাবে। পরে এটি ‘জার্নাল অব কমিনিকেশন’ তত্ত্ব হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে।

`No person is your friend who demands your silence, or denies your right to grow’ : Alice Walker [2009]

আমাদের সীমাবদ্ধতা হচ্ছে যাদের কেন্দ্র করে এই তত্ত্ব আলোচনা করছি, তারা আদৌ আগে কখনও এই তত্ত্বের ‘নাম’ বা ধারণা সম্পর্কে অবগত আছেন কিনা। না থাকাও অস্বাভাবিক নয়। থাকলে কলম ফেটে যেতো অনেক আগেই। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন যেমন দুর্নীতির পাহারাদার ও রক্ষকের ভূমিকায় হাজির হচ্ছে, চাপা পড়া কলমও তেমনই। যুগে যুগে নানা কালাকানুন দিয়ে কণ্ঠ চেপে রাখার চেষ্টা অপচেষ্টায় পরিণত হয়েছে। আবারও হচ্ছে।

সমাজ বিজ্ঞানী ‘নোয়েল নিউম্যান’ নীরবতা কুণ্ডলী নিয়ে আলোচনা করার পর অনেকেই এটিকে গতিময় হিসাবে ব্যাখ্যা করছেন। “ব্যক্তি যখন নিজের মতামতকে সংখ্যালঘু অবস্থানে দেখতে পায়, তখন সে অন্যদের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়ে তার মতামত প্রকাশ্যে ব্যক্ত করা হতে বিরত থাকে বা নিজের মধ্যেই রেখে দেয়। এভাবে এক পর্যায়ে ব্যক্তি পুরোপুরি নীরব হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ার নাম ‘নীরবতা কুণ্ডলী’। দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায়, যোগফল সম্পাদক ও প্রকাশকসহ চার সাংবাদিক ও ভুক্তভোগী অভিযোগ দাখিল করা নারীর নামে মামলা দায়েরের পর কারও কারও ভূমিকা ‘কলম ছাড়া’ মনে হয়েছে। ঘটনাটি কেন, কিভাবে ঘটেছে, যিনি অভিযোগ দিয়েছেন, তিনি অসত্য তথ্য দিয়ে সাংবাদিকদের ফাঁদে ফেলতে চেয়েছেন কিনা এসব যাচাই করার অক্ষমতায় ডুবে গেছে অনেকে। নিরপেক্ষতার ভান করে বোবা হয়ে থাকা কোন যোগ্যতায় আটকায়? এমনকি কেউ সরব হতে চাইলে তাকেও নীরব রাখার অপচেষ্টা দৃশ্যমান। যাদের নামে মামলা দায়ের হয়েছে, তাদের নামে মামলা দায়েরের পরই তাদের অপরাধী বিবেচনা করলেও আদি থেকে বিরোধীতা করা সাংবাদিক মহল যে আচরণে আবদ্ধ ঠিক এর বিপরীতে দেখা গেলো অনেককে। একটি সংবাদ প্রকাশের আগে, অনুসন্ধানকালে সাংবাদিকদের ‘আটক’ করা যায় কিনা এই প্রশ্ন জারি করতে না পারার ব্যর্থতার পরিণতি দেখবো এতে কোন সন্দেহ নাই। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ওই তিন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়নি। অথচ তারা কারারুদ্ধ আছে।

বলে রাখা উত্তম, নিকটস্থরা ‘রা’ শব্দ উচ্চারণ করতে না পারলেও দেরিতে হলেও এতো সংগঠন সক্রিয় হয়েছে, ফলে নীরবতা কুণ্ডলী পাকানোদের তলিয়ে যাওয়া দৃশ্য দেখার অপেক্ষা ছাড়া আর কোন পথ রইলো না। আবার কোন আপোস করা যায় কিনা এহেন বয়ানও শুনতে হয়েছে। টপ লেভেলেই পৌঁছে গেছে ব্যাপারটি। দণ্ডিত হলেও ওই প্রশ্ন অবান্তর। কেবল দিনের বেলায় শিয়াল কিভাবে পালায় এটি দেখা যেতে পারে। মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী যেমন বলেছেন, মামলা নিয়ে ছিলাম, মামলা নিয়েই আছি।

বিচ্ছিন্নতার ভীতি মানুষের এক রকমের সামাজিক প্রকৃতি। দার্শনিক জন লকের মতে, বিচ্ছিন্নতার ভয়ে মানুষ জনমতকে মেনে নেয়। আর জনমতের বিরুদ্ধে যাওয়ার পরিণতি হয় ভয়ঙ্কর। এখন ব্যাপার হচ্ছে সত্য প্রকাশ হয় ভয়ঙ্কর। কিন্তু যখন আসল সত্য বেরিয়ে আসবে, তখন ঠাহর করা যাবে কি ছিল রাতের শিয়ালের চেহারা। মানুষ স্বাভাবিকভাবে চারপাশের মানুষের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে। অনুকুল বা প্রতিকুল দেখে মত বদলায় বা নীরব থাকে।

গণমাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বাংলাদেশে সক্রিয় সম্পাদক পরিষদভুক্ত সংবাদপত্রগুলো যে কারণেই হউক মূলধারা খ্যাত। কিন্তু এদের যোগ্যতম প্রতিনিধিরাও মূলধারা থেকে বিচ্যুত। অবশ্য সম্পাদক পরিষদ যোগফলের নামে মামলা দায়ের হওয়ার পর নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।

সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে জনগণ পরস্পরবিরোধী মতামত পোষণ করে। এই মতামতগুলোর যেগুলো প্রাধান্য অর্জন করে, সাধারণত সেগুলাই জনমত হিসাবে স্বীকৃতি পায়। দুই হাজার ৩০০ বছর আগেও এমন আচরণ দেখা গেছে। কিন্তু তাাত্ত্বক মর্যাদা ছিল না।

মানুষ কখনও তার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায় না। সে কোন বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের বিরুদ্ধে মতামত দিতে চায় না। ১০০ জনের মধ্যে অবশ্যই ৯৯ জন সংখ্যাগরিষ্ঠ। ১০০ জনের ৯৯ জন দিনকে ‘রাত’ বললে ‘দিন’ রাত হয় না। এক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠাতার চেয়ে প্রান্তিক সংখ্যা অনেক শক্তিশালী। বিশেষত একজন দিনকে ‘দিন’ বলে ‘দিন’ টিকিয়ে রাখতে পারে। এমন শক্তিশালী তথ্য বের হয়ে আসতে পারে, যা সব কুণ্ডলীকে তলিয়ে দিতে পারবে। একজনই পারে। 

দল পাকিয়ে বা সিন্ডিকেট সাজিয়ে সাময়িক অনেক সুবিধা অর্জন করা যায়। কিন্তু এক্স-রে করলে যদি মেরুদণ্ড খুঁজে না পাওয়া যায়, তা হলে এমন সুবিধা বরং অসুবিধার চেয়ে জঘন্য হয়ে পড়ে।

বরাবরই গণমাধ্যম সংখ্যাগরিষ্ঠাকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে ভিন্নমতে আরও চাপা পড়ে যায়। ফলে নীরবতা কুণ্ডলী আরও বেশি কার্যকর হয়।

এসব পরিস্থিতিতে যারা নীরবতা কুণ্ডলী মতকে অগ্রাহ্য করেন তাদের বলা হয় অগ্রসেনা। এই শ্রেণিতে থাকেন সমাজের ভ্যানগার্ড খ্যাত শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কারক ও বুদ্ধিজীবী। আমাদের দেশে বর্তমানে অন্তত আট হাজার পোর্টাল রয়েছে, যাদের নামের সঙ্গে ‘টুয়েন্টিফোর’ শব্দ জুড়ে দেওয়া। তারা ২৪ ঘণ্টাই সজাগ থাকে। ঘুমায় না, কিন্তু ছয় থেকে আট ঘণ্টা না ঘুমিয়ে তারা সুস্থ থাকে কিভাবে? এ যেন আর এক নীরবতা কুণ্ডলীর দেখাদেখি। নিজস্ব বোধ বা স্বকীয়তা কোথায়। কেউ একটা চালু করেছে, দেখেই এর পিছনে দৌড় শুরু করেছে! এই ২৪ ঘণ্টা ওয়ালাদের কেউ কেউ রীতিমত ‘ঘণ্টা’ বানান লিখতেও ভুল করে। এদের ‘নামধারী’ বলা ছাড়া আর কি বলা যায়? এহেন জটিলতা ভেদ করেই টিকে থাকতে হয়। যদি সম্প্রচার নীতিমালা মেনে লাইসেন্স নিতে হয়, তা হলে ৮০টি পাওয়া যাবে কিনা কে জানে। এর চেয়ে বেশি সম্পাদক পাওয়া সম্ভব?

নীরবতা কুণ্ডলী তত্ত্বকে পাশ কাটানোর এক সুযোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। কিন্তু নিরাপত্তা বা সুরক্ষার নামে এমন জটিল জাল পাতা হয়েছে, তাতে আসল ‘কারবার’ মার খাবেই। যদি সত্য, সময়, সুন্দর ও সংবাদকে না বদলাতে চান তা হলে প্রশ্ন তোলার সুযোগ দিতে হবে। একজন পেশাদার সাংবাদিক কখনও এই চারটি [সত্য, সময়, সুন্দর ও সংবাদ] ব্যাপারকে বদলাতে পারে না। স্থির থাকা কাজ না হলেও, সত্যনিষ্ঠতা থেকে এগুলোকে মৌলিক ধরে স্থির থাকতে হয়। অনুমান থেকে ধরে নিবেন, যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তিনি আগেই ‘সহী’ তা হলে বাকি আয়োজন অর্থহীন। তদন্ত ব্যাপারটিকে কি কারণে রাখা হয়েছে?

পুলিশের আইজি ডক্টর বেনজীর আহমেদ গত ১৬ জুন থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত পুলিশ বাহিনীতে দুর্নীতি, মাদক ও সুবিধাজনক বদলিসহ বিট পুলিশিং নিয়ে যে মত তুলে ধরছেন এর সঙ্গে একমত হলে এক পয়েন্টে লড়বো। দ্বিমত হলেও লড়বো, প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও লড়বো। করোনায় হলেও মুক্তিযুদ্ধ পরের সময়ে পুলিশ একটি ভূমিকায় হাজির হয়েছে। এটি ধরে রাখা উচিত। ঘটনার সূত্রপাত পুলিশ দিয়ে শুরু হওয়াতে আমরা প্রেক্ষাপট বদল করিনি। প্রশাসনের কোন শাখাকেই ঢিলেমিতে দেখলে চলে না। কলম বন্ধক দিয়ে সাংবাদিকতা করার কোন ইচ্ছা নেই। যারা যাদের ম্যানেজ করে চলতে চান, তারা তাদের পথে হাঁটেন। অন্য কারও ব্যাপারে আগেও নীরব ছিলেন, এখনও থাকেন। 

বেকায়দায় পড়ে হলেও, ষড়যন্ত্রের শিকার হলেও একটা স্পষ্ট ধারণা চর্চার সুযোগ এবার পেয়েছি। সেটি ডিপার্টমেন্টের তৃতীয় বা চতুর্থ স্তরে রাখার ব্যাপার নয়। টপ বলতে যা বলতে চেয়েছি আগেই। অন্তত ব্যক্তি সৎ হলেও কিছু হয়, এই কাজের একটি গতি পেয়েছি। চালাচালি করতে করতে ডিপার্টমেন্টের টপ, সরকারের টপ, এমনকি আন্তর্জাতিক যেসব সীমায় [রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারর্স, আর্টিকেল নাইনটিন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউমান রাইটস ওয়াচ] হাত দিলে ডায়নামিক কিছু ইঙ্গিত মিলে।

‘জলকেলি’ বলতে যা বোঝায় সেটিও পরখ করেছি। অপেক্ষা করব বেহিসাবিদের হিসাব দেখার। রাগে হলেও বড় বড় সম্পাদকদের এবারই প্রথম চ্যালেঞ্জ করেছি। নিজেকে মিলিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছি। হিসাব আরও কড়াকড়ি করলাম। মাছ ধরার সেটআপ কিন্তু ভেঙে যাচ্ছে। ‘জমি বেচা’ নিয়োগও কুণ্ডলী পাকিয়ে বেরিয়ে যাবে।

ক্ষুদিরাম বসু, সূর্য সেন, প্রফুল্ল চাকী, কল্পনা দত্তা, ইলা মিত্ররা ব্রিটিশদের চোখে সন্ত্রাসী ছিল। আমরা তাদের স্বাধীনতাকামী ভেবেই এতদূর এগিয়েছি। এখনও তাদের নাম মনে এলেই গা ঝাড়া দেই। নীরবতা কুণ্ডলী ভাঙবোই।

আসাদুল্লাহ বাদল: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক যোগফল। ৫ জুলাই ২০২০।



এই বিভাগের আরও