যোগফল ‘সত্য, সময়, সুন্দর, সংবাদ’ বদলে ফেলে না

যোগফল বার্তা বিভাগ

06 Jul, 2020 05:09am


যোগফল ‘সত্য, সময়, সুন্দর, সংবাদ’ বদলে ফেলে না
ছবি : সংগৃহীত

সত্য, সময়, সুন্দর ও সংবাদ বদলে ফেলা যায় না। চারটি শব্দে ‘স’ ব্যবহার হয়। যা গণমাধ্যমের জন্য আকর্ষণীয়। যোগফল এক্ষেত্রে আরও বেশি গুরুত্ব দেয়।

আপনার পাঠকের যদি আস্থা না থাকে যে, আপনি ঘটনার সঠিক বিবরণ দিচ্ছেন, তা হলে আপনার পেশার মৌলিক দায়িত্ব পালনে আপনি ব্যর্থ হবেন। কোন উদ্ধৃতি বা অভিমত ঠিকভাবে রিপোর্ট করা এবং তার নির্ভুল প্রেক্ষাপট তুলে ধরা সাংবাদিকের জন্য খুবই জরুরি।

সাংবাদিক হিসেবে আপনার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে আপনার নির্ভুলতা বা এ্যাকুরেসি। আপনার পাঠক যদি এই আস্থা না থাকে যে, আপনি ঘটনার সঠিক বিবরণ দিচ্ছেন, তাহলে আপনি আপনার পেশার মৌলিক জিনিসটিও অর্জন করছেন না।

সাংবাদিক হিসেবে আপনার পাঠকের সাথে একটি অলিখিত চুক্তি আছে: যেটা খুঁজে বের করার সময় বা আগ্রহ তাদের নেই, আপনি সেটা দেখছেন এবং খুঁজে বের করছেন। তারপর আপনি যা খুঁজে বের করলেন সেগুলো তাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।

আপনি তাদের বলছেন আপনার ওপর আস্থা রাখতে যে, আপনি সব খোঁজ-খবর নিয়ে যা বলছেন সেগুলো ঠিক। শুধু যে প্রতিটি তথ্য আলাদা আলাদা ভাবে ঠিক, তাই না; আপনি চাইছেন তারা আপনার ওপর এই আস্থা রাখুক যে, ঘটনা সম্পর্কে আপনার  সামগ্রিক বিবরণ তাদের ভুল পথে চালিত করবে না।

আপনি তাদের ধোঁকা না দেওয়ার অঙ্গীকার করছেন

আপনি হয়তো সামাজিক নেটওয়ার্কিং এর মাধ্যমে আপনার  পাঠকের সাথে কাজ করছেন। আপনি হয়তো তাদের অভিজ্ঞতা এবং কোন বিষয়ে পারদর্শিতার সাহায্য নিতে চাইছেন। অথবা কিছু সময়-বহুল কাজ করে দেওয়ার জন্য তাদের অনুরোধ করছেন, যেমন হরেক রকমের ডকুমেন্ট খতিয়ে দেখা বা সরকারি বিবরণের সাথে অন্য বিবরণ মিলিয়ে দেখা।

তারপরও, ধোঁকা না দেওয়া আপনার দায়িত্ব

আপনি সাংবাদিক, সব খবর এবং তথ্য এভাবে সংগ্রহ করার পর তা সাজিয়ে-গুছিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কীভাবে কোনটা পরিবেশন করবেন। তবে এটা বলা যথেষ্ট হবে না যে, সামাজিক নেটওয়ার্কিং এর মাধ্যমে সংগ্রহ করা তথ্য সব ‘খাঁটি’, কাজেই তার ‘সততা’ অপ্রাসঙ্গিক বা মূল্য কম।

অবশ্য, ‘সত্য’ একটি জটিল ধারণা। নির্ভুলতা আর সততা এক জিনিস নয়, একটি অসত্য ঘটনার পুরোপুরি সঠিক বর্ণনা দেওয়া সম্ভব। এখানে অন্য ধারণা যুক্ত আছে যেমন, পরীক্ষা এবং যাচাই এর মাধ্যমে ‘সত্য প্রতিপাদন’, ‘সততা’, ‘যথার্থতা’।

হয়তো সত্য এবং নির্ভুলতার মূল্যবোধের নতুন নাম দেওয়া উচিত ‘ধোঁকা না দেওয়ার প্রতি অঙ্গীকার’। ভুল পথে পরিচালিত হওয়া বা ধোঁকার শিকার হওয়া কী জিনিস সেটা বেশির ভাগ মানুষই জানেন।

এবং যারা ধোঁকা না দেওয়ার  ব্যাপারে যথেষ্ট যত্নশীল নন, তাদের বিশ্বাস করা আমরা কীভাবে থামিয়ে দেই, তা আমরা বুঝি।

নির্ভুলতা

‘সত্য’  বা ‘প্রকৃত ঘটনা’ এবং ‘অভিমত’ এর মধ্যে পার্থক্য নিয়ে আপনার মতামত যাই থাকুক, ‘নির্ভুলতার’  ধারণাটা বেশ সোজা-সাপটা। নির্ভুলতার মানে শুধু এই না যে আপনি সব কিছু সত্যনিষ্ঠ ভাবে যাচাই এবং পরীক্ষার পর ‘প্রকৃত ঘটনা’ বের করবেন, যেমন মানুষের নাম, স্থান, জন্মের তারিখ, উদ্ধৃতি। এর মানে, আপনি যাদের নিয়ে রিপোর্ট করছেন তাদের অভিমত ঠিকভাবে তুলে ধরছেন।

এখন, আপনি  যদি লেখেন বা বলেন, ‘মন্ত্রী তার শ্রোতাদের বললেন যে, রাজধানী শহর দেশের সাংস্কৃতিক এবং শৈল্পিক কেন্দ্রবিন্দু’, তা হলে আপনি সম্ভবত দুই স্তরে ভুল করেছেন। প্রত্যেক দেশের এক বা একাধিক রাজধানী থাকে। সেক্ষেত্রে রাজধানী কোন স্থান হিসাবে চিহ্নিত হয় না। বরং স্থানের পরিচিতি হিসাবে চিহ্নিত হয়। বাংলাদেশের সব গণমাধ্যম রাজধানীর উত্তরা থানা এ জাতীয় শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করে। কিন্তু উত্তরা রাজধানীর থানা নয়। বরং ডিএমপির একটি থানা। আবার এসব গণমাধ্যম কেউ রাজধানীর সুপ্রীমকোর্ট শব্দ ব্যবহার করে না। এমনকি রাজধানীর অমুক বিশ্ববিদ্যালয় শব্দও ব্যবহার করে না। আবার এসব গণমাধ্যম রাজধানীর অদুরে আশুলিয়া শব্দ ব্যবহার করে। পারতপক্ষে এসব গণমাধ্যম বৈষম্য তুলে ধরে অজান্তেই।

এটা সম্ভব যে, যেসব তথ্যের সত্য প্রতিপাদন করা সম্ভব সেগুলো ভুল এবং আপনি ব্যক্ত অভিমতের ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছন বা ভুল রিপোর্ট করেছেন।

বক্তা আসলেই কী বলেছিলেন? তিনি কি আসলেই ভাষণটি দিয়েছিলেন? আপনি কি নিশ্চিত যে আপনি শুধু একটি প্রেস রিলিজ পান নি? আপনি তার উদ্ধৃতি দিয়ে যা বলেছেন, তিনি কি আসলেই সেসব শব্দ ব্যবহার করেছিলেন?

সাংবাদিকরা কতবার যে এধরনের সহজ তথ্যে ভুল করে, সেটা আসলেই বিস্ময়কর। অথচ, এইসব ভুল করা হচ্ছে আপনার ওপর পাঠকের আস্থা দুর্বল করার এবং আপনার নিজস্ব ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার সবচেয়ে সহজ রাস্তা।

অভিমত রিপোর্ট করার সময়ও আপনার একই রকমের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। মন্ত্রী আসলেই যা বলেছেন, আপনার রিপোর্ট কি সেটা ঠিকভাবে তুলে ধরছে? তিনি কি মস্করা করছিলেন, নাকি নজর কাড়ার জন্য বেশি ফুলিয়ে বলছিলেন? তার বক্তব্যের আগে বা পরে কি অন্য কোন বাক্য ছিল, যেটা তার কথাকে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিতে পারে?

কাজেই, এটা নিশ্চিত করুন যে আপনি কোন উদ্ধৃতি বা অভিমত ঠিকভাবে রিপোর্ট করছেন, এবং ওই বক্তব্যের অর্থ আপনি ঠিকভাবে তুলে ধরছেন।

কোন উদ্ধৃতির উল্লেখযোগ্য কোন অংশ যেটা অর্থ পরিবর্তন করতে পারে, সেটা বাদ দেওয়া গ্রহণযোগ্য না। একইভাবে, উদ্ধৃতি যে পটভূমি মাথায় রেখে করা হয়েছিল সেটা বদলে ভিন্ন পটভূমিতে উদ্ধৃতিটি ব্যবহার করা গ্রহণযোগ্য নয়। উদ্ধৃতিতে যেসব শব্দ ব্যবহার করছেন সেগুলো ঠিক হতে পারে, কিন্তু যে অর্থ আপনার রিপোর্ট প্রকাশ করছে সেটা ঠিক হবে না, কারণ আপনি গুরুত্বপূর্ণ  অংশ বাদ দিয়ে উদ্ধৃতিটি বিকৃত করেছেন।

যে সব তথ্য বস্তুনিষ্ঠ ভাবে পরীক্ষা এবং যাচাই করা সম্ভব সেগুলো ‘ভেরিফাই’ করে তা প্রকৃত ঘটনা বা ‘ফ্যাক্ট’ হিসেবে উপস্থাপন করা সাংবাদিক হিসেবে আপনার দায়িত্বের অংশ। আপনাকে প্রকৃত ঘটনা থেকে সেই সব তথ্যকে পার্থক্য করতে হবে যেগুলো পরিষ্কারভাবে কারও অভিমত।

তথ্যে ঘাটতি

আপনার বর্ণনায় কোথায় তথ্যে ঘাটতি আছে সেটা নির্ধারণ করাও সাংবাদিক হিসেবে আপনার দায়িত্ব। এমন কোন প্রধান তথ্য বা ফ্যাক্ট কি আছে যেটা এখানে নেই? কোন ভাষণের শ্রোতা কি দুয়োধ্বনি করেছে নাকি হা হা করে হেসেছে, নাকি অবাক হয়ে নীরব থেকেছে? কোন অনুপস্থিত তথ্যগুলো এখানে লক্ষণীয় বা গুরুত্বপূর্ণ? 

এখানে যদি মতামতের বিভেদ থাকে যেগুলো আপনার রিপোর্টে থাকা দরকার, কোনটাকে আপনি কতটুকু গুরুত্ব দেবেন?

যদি কোন অনুষ্ঠানে বা ঘরে সবাই একই সুরে কথা বলেন, সেটা কী প্রকৃত মতৈক্যের ইঙ্গিত বহন করছে, নাকি ব্যাপারটা শুধুই এরকম যে কোন ভিন্নমতাবলম্বী আপনার যাত্রাপথ দিয়ে যায়নি?

ভুল সংশোধন করা

কোন ভুল সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সাথে সাথেই ভুল স্বীকার করে তা সংশোধন করা উচিত।

ভুল স্বীকার করতে অনিচ্ছার জন্য সাংবাদিকতার বড় দুর্নাম আছে।

কিন্তু পাঠক এ ব্যাপারে বেশ পরিষ্কার: সেই সব সংগঠনের ওপর তাদের আস্থা আছে যারা ভুল স্বীকার করে এবং সংশোধন করে। যেসব সংগঠন ভান করে যে তারা সব ভুলের ঊর্ধ্বে, তাদের ওপর পাঠকের আস্থা কম।

তাছাড়া, সাংবাদিক হিসেবে আপনার উদ্দেশ্য হচ্ছে ঘটনা প্রবাহের সঠিক এবং সৎ বর্ণনা দেওয়া। আর আপনি যখন বুঝবেন আপনি কোন ভুল করেছেন, সেটা পাঠক জানিয়ে দেওয়া আপনার নৈতিক দায়িত্ব।

অনলাইন সাংবাদিকতায় বা ওয়েবসাইটে ভুল সংশোধন করা অত্যন্ত জরুরি, আপনার স্টোরি তাদের সময়সীমা পার হবার দীর্ঘ দিন পরেও রয়ে যাবে এবং অন্য স্টোরির সাথে লিঙ্ক করা হবে। নির্ভুল না হলে অন্যায্য রিপোর্টিং এর অভিযোগ উঠতে পারে, এমনকি আপনি মানহানির মামলায় জড়িয়ে পড়তে পারেন।

কোন ভুল সংশোধনের সব চেয়ে কার্যকরী উপায় হচ্ছে, ঠিক করে দেওয়ার পাশাপাশি কোথায় ভুল হয়েছে সেটাও জানিয়ে দেওয়া।


বিভাগ : মর্গ