সংবাদে ‘জনস্বার্থ’ ও ‘ভারসাম্য’ রক্ষায় যোগফল

যোগফল বার্তা বিভাগ

06 Jul, 2020 06:06am


সংবাদে ‘জনস্বার্থ’ ও ‘ভারসাম্য’ রক্ষায় যোগফল
ছবি : সংগৃহীত

গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকতার মৌলিক কাজ হচ্ছে, জনসাধারণের রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য তাদের যেসব তথ্য প্রয়োজন, সেগুলো পরিবেশন করা। কিন্তু সেক্ষেত্রে জনস্বার্থের সংজ্ঞা কী হবে তা জেনে নিয়ে রিপোর্টিং করতে হবে।

সকল সাংবাদিকতা জনস্বার্থে করা হয়। তার কিছুটা আসলেই করা হয়। আবার অনেকটা কারও স্বার্থেরও হয়।

সাংবাদিকতায় ‘জনস্বার্থ’ হচ্ছে সোনার হরিণের মত একটি ভাবনা। অথচ, সাংবাদিকতার মূলেই রয়েছে এই ভাবনা। হরিণও সোনার হয় না, জনস্বার্থও জনতার হয় না।

অবশ্য, কোন সমাজে শুধু একক ‘জনসাধারণ’ থাকে না। অনেক জনগোষ্ঠী আছে যাদের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্বার্থ থাকে। আমরা সবাই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট জনগণের সাথে সক্রিয়। জনস্বার্থ নামক এই ভাবনার সাথে আর একটি সমস্যা যুক্ত: ‘স্বার্থ’ শব্দটির দ্বিমুখী অর্থ।

যে বিষয় জনগণের স্বার্থে, সেটা জনগণকে আগ্রহী নাও করতে পারে। অথবা, যখন জনগণ ওই বিষয়ে কিছু একটা করার ক্ষমতা রাখে তখন তারা আগ্রহী নাও হতে পারে।

যেমন ২০১০ খ্রিস্টাব্দে অর্থনৈতিক মন্দা সম্পর্কে তথ্য এবং জ্ঞান অবশ্যই জনস্বার্থে ছিল। কিন্তু ওই বিষয়ে জনগণকে আগ্রহী করা খুব কঠিন ছিল। ১৯৭০ ও ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে উপকুল এলাকায় দুর্যোগের আগে জনগণকে সচেতন করা যায়নি। ফলে প্রচুর প্রাণহানি ঘটে।

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একই রকম ব্যাপার ঘটেছে। মিডিয়া ও বিনিয়োগকারীদের সম্পর্ক মোটেও স্বাভাবিক মনে হয়নি।

বাংলাদেশে জঙ্গি কার্যক্রম ও রোহিঙ্গা ইসু রাজনৈতিক আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। প্রকৃত অবস্থান কেউ ঠিক করতে পারেনি। মিডিয়া রোহিঙ্গাদের সমস্যা কি ও কিভাবে সমাধান করা যেতে পারে এমন কোন তথ্য প্রচারের চেয়ে ত্রাণ বিতরণের চিত্র নিয়ে ব্যস্ত।

আসল কথা হচ্ছে, সাংবাদিক এবং জনসাধারণ সবাই তখন অন্য খবরে বেশি ‘আগ্রহী’ ছিল, যখন শেয়ার বাজারের এই ঘটনা, তখনও আমাদের টার্গেট অন্যত্র। গার্মেন্টস শিল্প বিরাট সম্ভাবনাময় হলেও খবরের ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া যায় না। কৃষি আরও বেশি অবহেলিত ও কোটায় আবদ্ধ।

অগ্রাধিকার

জনস্বার্থ সম্পর্কে দাম্ভিক হয়ে খুব সহজেই বলা যায় যে, সাংবাদিকতা শুধু সেসব বিষয় নিয়ে হবে যেগুলো আসলেই গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতি, অর্থনীতি, অপরাধ ইত্যাদি।

এটা সত্য যে, সাংবাদিকতার সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হচ্ছে উল্লেখযোগ্য ঘটনা এমন ভাবে প্রচার করা যেটা হবে সময়োপযোগী এবং প্রাসঙ্গিক এবং আকর্ষণীয়।

যে কোনো বাণিজ্যিক সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের সাথে তার পাঠকের আকর্ষণ করার ক্ষমতার একটি পরিষ্কার এবং সরাসরি সম্পর্ক আছে।

প্রতিটি পত্রিকা বা সংবাদ মাধ্যমের নিজস্ব অগ্রাধিকার বা প্রায়োরিটি থাকবে। তারা জনস্বার্থের ভাবনাকে তাদের নিজস্ব পাঠকের স্বার্থ এবং সার্বিক জনসাধারণের আগ্রহের আলোকে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করবে।

আর একটি কারণে সাংবাদিকতার জন্য জনস্বার্থের ভাবনাটি গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক কাজ আছে, যেমন ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য সংগ্রহ বা প্রকাশ করা, যেগুলো করার পেছনে যুক্তি নেই, কিন্তু আমরা সেগুলোর সত্যতা প্রতিপাদন করি এই বলে যে, কাজটা জনস্বার্থে করা হয়েছে।

জনস্বার্থ ছাড়া, এসব কাজ এবং কৌশল হবে একবারেই হঠকারী এবং অনাহূত প্রবেশমূলক। ভোটে পরাজয়ের খবরের পেছনে না গিয়ে জয়ের কারণ খুঁজে দেখা যেতে পারে। পরাজয়ের কারণে নতুন করে জয়ের কোন সম্ভাবনা থাকে না।

যোগফলের জন্য, জনস্বার্থে সাংবাদিকতার অর্থ হচ্ছে, যেসব বিষয় বৃহৎ পরিসরে পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক, সেগুলো নিয়ে রিপোর্টিং করা। এগুলোর মধ্যে রয়েছে:

জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা সমুন্নত রাখা: তথ্য সংগ্রহ এবং পরিবেশন করা যাতে সরকার এবং অন্য যারা ক্ষমতার অধিকারী বা সাধারণের জীবনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, তাদের কর্মকাণ্ড জনগণের নজরে থাকে।

জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিতর্কে তথ্য জোগানো: গুরুত্বপূর্ণ ইসু সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, পরীক্ষা এবং পরিবেশন করা, যাতে জনসাধারণ তাদের নামে নেওয়া সিদ্ধান্ত বুঝতে পারে এবং সেটা নিয়ে আলোচনা করতে পারে। দেশে বাজেট বিষয়ে কোন আগ্রহ নেই। দাম বাড়ানো কমানো নিয়ে সব আগ্রহ।

দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং প্রতারণা প্রতিরোধ করা: পাঠকের পথ দেখানো যাতে তারা কোন বক্তব্য বা পদক্ষেপ দ্বারা বিভ্রান্ত না হন, বিশেষ করে যেখানে সরকারি অর্থ যুক্ত আছে।

অপরাধ এবং সমাজ-বিরোধী ব্যবহার: উল্লেখযোগ্য সমাজ-বিরোধী এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ফাঁস করে দেওয়া, বিশেষ করে যেখানে ক্ষমতাধর বা মানুষ জড়িত।

গোটা বিশ্ব: বিশ্বের যেসব এলাকায় সংঘাত চলছে সেখান থেকে তথ্য পরিবেশন করা; যেসব জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে উপলব্ধির প্রয়োজন (যেমন, মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন); অথবা যেখানে বাংলাদেশ বা তার মিত্রদের নীতি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। 

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা

জনস্বার্থমূলক সাংবাদিকতা কোন কোন সময় এবং অনিবার্যভাবে কোন সাধারণ ব্যক্তির স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক হবে।

গ্রহণযোগ্য সাংবাদিকতা এবং ব্যক্তিগত জীবনে অনাহূত প্রবেশের মধ্যে যে সীমানা, এবং কোন কাজ জনস্বার্থে যুক্তিযুক্ত বলে গণ্য হতে পারে, তা আগের যেকোন সময়ের চেয়ে বর্তমানে খুব গভীরভাবে আলোচিত হচ্ছে এবং আদালতের প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

এই বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, শুধু সাংবাদিকতার জন্য নয়, গোটা সমাজের জন্য। অনেকে দুর্যোকালে ত্রাণ বিতরণের সংবাদকে উপজীব্য করে তুলে। যোগফল এক্ষেত্রে ত্রাণ বিতরণের চেয়ে ত্রাণ পাওয়ার যোগ্যরা বঞ্চিত কিনা, ত্রাণ বিতরণের চেয়ে ফটোসেশন বেশি কিনা এসব ব্যাপারে সতর্ক।

যে কোনো ধরনের সাংবাদিকতার উচিত কোন কর্তৃপক্ষের বেঁধে দেওয়া সীমানার বাইরে যাবার অধিকারের ওপর জোর দেওয়া। এই ধরনের অনেক সীমানা হয় সরানো হয়েছে নয় পুরোপুরিই বাতিল হয়েছে।

সময়ের সাথে সাথে এই ধরনের সীমানাগুলো ছোট হয়ে আসতে দেখা গেছে এবং এগুলো আরও সংকুচিত করার জন্য সাংবাদিকরা অনবরত চাপ সৃষ্টি করেছেন। আমরা যে যুক্তি দেখাই তা হচ্ছে, ‘জনস্বার্থ’।

যোগফল তার রীতিনীতিতে বলেছে:

যেসব ঘটনা উল্লেখযোগ্য, আমরা সেগুলো বলার চেষ্টা করি। আমরা  গল্পের গভীরে যাবার জন্য বলিষ্ঠ ভাবে চেষ্টা করবো এবং আমাদের ব্যাখ্যা তথ্যসমৃদ্ধ হবে। আমাদের বিষয়-ভিত্তিক অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা আমাদের জটিল বিশ্বে  কর্তৃত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ নিয়ে আসবে। যারা ক্ষমতার আসনে আছেন তাদের আমরা অনুসন্ধানী প্রশ্ন করবো এবং খোলা বিতর্কের জন্য প্লাটফর্ম সৃষ্টি করবো ।

যোগফলের সাংবাদিকদের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করছে জনসাধারণের চোখে তার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। একই সাথে, যেসব বিষয় মানুষের জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোতে তার সাংবাদিকতা এবং অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিতে হবে।

ভারসাম্য

জনস্বার্থ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য সব সময়ই বিচার-বিবেচনার ওপর নির্ভর করবে, এবং প্রতিটি উদাহরণই ভিন্ন হবে। অনেক ক্ষেত্রেই কোন ধরা-বাঁধা সঠিক উত্তর থাকবে না অথবা এমন কোন ভারসাম্য যার সাথে সবাই একমত হবে।

সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে সব ব্যক্তির যুক্তিযুক্ত প্রত্যাশা রয়েছে। এবং যারা তাদের জীবনের কিছুটা অংশের জন্যও জনসমক্ষে থাকেন, এই প্রত্যাশা তাদের বেলায়ও প্রযোজ্য।

যে কোন ব্যক্তি রাজনীতিক হতে পারেন বা সেলেব্রিটি তারকা হতে পারেন, কিন্তু তার মানে এই না যে তাদের সন্তানের কোন স্কুলে পড়ে, তা নিয়ে খবর নেওয়ার  বা তাদের বাসায় ঢুকে প্রশ্ন করার অধিকার সাংবাদিকদের আছে।

কারও জীবনের কিছুটা অংশ জনসমক্ষে থাকার ফলে সেখানে সাংবাদিকদের  অনাহূত প্রবেশ কতটুকু যুক্তিযুক্ত হতে পারে, তা নিয়ে প্রবল বিতর্ক রয়েছে।  মিডিয়ার বিভিন্ন অংশ ভিন্ন অবস্থান নেয়, বিশেষ করে সেলেব্রিটি তারকাদের ক্ষেত্রে। সেলেব্রিটি তারকারা নিজেরাই তাদের ক্যারিয়ার বা নিজেদের পছন্দসই বিষয়ের প্রচার মিডিয়াকে ব্যবহার করে থাকেন।

যোগফল সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে প্রত্যাশা করে, কোন ব্যক্তির জীবনে তাদের অনুমতি ছাড়া অনাহূত প্রবেশ যুক্তিযুক্ত করার জন্য অবশ্যই জনস্বার্থের ভাবনাটা পরিষ্কারভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

ফলে যোগফল সাধারণত জনব্যক্তিত্বদের ব্যক্তিগত, আইনসিদ্ধ ব্যবহার তখনই রিপোর্ট করবে, যখন ওই ব্যবহারের ফলে বা ওই ব্যবহার জানাজানি হয়ে যাবার পরিণাম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় চলে আসে।

বিষয়টি প্রায়ই জটিল হয়ে যায় যখন অন্য মিডিয়া এরকম স্টোরি প্রকাশ করেছে যেটা যোগফল প্রকাশ করবে না। কোন কোন ক্ষেত্রে, এরকম স্টোরি এত বড় হয়ে যায় যে যোগফল সেটাকে এড়িয়ে চলতে পারে না। তবু কোন কোন ক্ষেত্রে নীতি বিসর্জন দিয়ে সংবাদ প্রককাশের প্রতিযোগিতা এড়ানো হয়েছে।

একজন ক্রিকেটার ধর্ষণ মামলার আসামি হিসাবে অভিযুক্ত হওয়ার পর ওই মামলার বাদিকে গণমাধ্যমে নাম, পরিচয়, ছবি, ঠিকানা প্রচারের প্রতিযোগিতায় নামিয়েছে। এমনকি কয়েকটি টেলিভিশন লাইভ প্রচার করেছে। এটি আমাদের আইনে নিষেধ ও দণ্ডনীয়। সব গণমাধ্যম যখন এই বেহিসাবি প্রতিযোগিতা করেছে যোগফল তখনও এড়িয়ে গেছে।

২০২০ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ করোনা ভাইরাসকে বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তফশিল অনুযায়ী সংক্রামক ব্যাধি আইনের শর্ত মোতাবেক করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়া ও সংক্রমিত হয়ে মারা যাওয়াদের ব্যাপারে নীতিমালা রয়েছে। দুর্যোগে সাংবাদিকতার জন্য দেশে ১৪টি আইন কার্যকর রয়েছে। কিন্তু প্রথম দিকে কয়েকটি মিডিয়া নীতিমালা মেনে সংবাদ প্রচার করলেও শেষে সব মিডিয়া লুটিয়ে পড়েছে। যোগফল এক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত নিয়মের ভারসাম্য রক্ষা করতে আগ্রহী।


বিভাগ : মর্গ