পান থেকে চুন খসলেই ডিজিটাল আইনে মামলা

যোগফল রিপোর্ট

07 Jul, 2020 06:48pm


পান থেকে চুন খসলেই ডিজিটাল আইনে মামলা
ছবি : সংগৃহীত

করোনার মধ্যে ‘আলেচিত’ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার বাড়ছে। আর এই আইনটি এই সময়ে সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় আ্যাক্টিভিস্টদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে। 

একটু পান থেকে চুন খসলেই মামলায় পড়তে হচ্ছে ব্যবহারকারীদের। আর মামলাবাজির এই যথেচ্ছ কাজ কারবারে ক্ষমতার বলয়ের আশপাশে থাকা নেতা কর্মী ও পুলিশকে উৎসাহী হতে বেশি দেখা যায়। যে আইন এরমধ্যে নিপীড়নমূলক হিসেবে সাধারণ মানুষের নিকট দিন দিন প্রকাশ পাচ্ছে এবং কোন ধরনের তদন্ত ব্যতিরেকে কারও অভিযোগের প্রেক্ষিতেই ধড়পাকড় করায় এটি জনবিরোধি অস্ত্র হিসেবে মানুষের নিকট প্রতীয়মান হচ্ছে।

গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর থানার একজন ইন্সপেক্টরের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ দিয়ে অভিযোগকারী নারী মামলার শিকার হয়েছেন। যে সাংবাদিকদের নিকট ওই নারী অভিযোগ করেছিলেন সেই তিন সাংবাদিককে [মো. মোজাহিদ, রুকনুজ্জামান খান ও মিলন শেখ] গ্রেপ্তার করার পর মামলা দেওয়া হয়। তারা প্রায় দেড়মাস যাবত কারারুদ্ধ রয়েছেন। ঘুষের ঘটনা তদন্ত হয়নি। এর আগেই মামলা দায়ের করা হয়েছে। পলাতক অবস্থায় ওই নারী পুলিশের আইজির নিকট দরখাস্ত জমা দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক শেখ মিজান যোগফলকে জানিয়েছেন, পুলিশ ঘুষের ঘটনা আড়াল না করে তদন্ত করে ফল দেখে মামলা করার দরকার হলে মামলা করতে পারত। এখন যেটি করেছে, সেটি নিতান্ত নিজের পিঠ বাঁচানো।

যেহেতু ডিজিটাল বাংলাদেশ, সেক্ষেত্রে নিরাপদ সাইবার দুনিয়ার জন্য আইন থাকা যুক্তিযুক্ত কিন্তু এই আইনের মাধ্যমে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ বাছবিচার না করে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে মামলার বেড়াজালে। মানুষের অধিকার হচ্ছে হরণ, ভার্চুয়াল লাইফ হয়ে পড়ছে ক্রমশ ঝুঁকিপুর্ণ।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে প্রথম ৫ মাসেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে ৪০৩টি, গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩৫৩ জন। করোনাকালে (মার্চ থেকে মে) মাসিক গড় মামলা ৮২ ছাড়াবে। অথচ এ সময় সারা দেশে অপরাধের মোট মামলা কমেছে। পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বলছে, বছরের প্রথম তিন মাসে সব ধরনের মামলা সংখ্যা ছিল মাসে গড়ে ১৭ হাজারের বেশি। এপ্রিলে এটা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।

দুর্যোগ মোকাবেলায় সমন্বয়হীনতা, ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব যদি গণমাধ্যম স্বাধীন ও কোন প্রকার ভয়ভীতির উর্ধে উঠে নিতে না পারে তা হলে গণমাধ্যমকর্মীদের অবস্থা ‘অর্ধমৃত’ হয়ে থাকারই শামিল। দেশের মানুষের ও সরকারের সামগ্রিক স্বার্থে কাজ করতে যেয়ে কারও ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্টিস্বার্থকে না দেখাটাই তো সাংবাদিকের কাজ।

আর এই কাজটি করলেও যখন কোন একটি পক্ষ রুষ্ট হন তখন এ কথা বলা যায় যে, সাংবাদিকতার মৌল অবস্থা বা এথিকস নির্ভর সাংবাদিকতা চলুক তা অনেকেই মেনে নিতে চান না। কারও গাফিলতি তুলে ধরলে সেটা ওই ব্যক্তির জন্য নেতিবাচক হলেও তা সামগ্রিকভাবে জাতি বা মানুষের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনে। খবরের পেছনের খবর না খুঁজে, সেলফ সেন্সর বজায় রেখে আর কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে সাংবাদিকতা এখন রাষ্ট্রের এই চতুর্থ স্তম্ভের স্থানে নেই।

সিলেট টুডে টোয়েন্টি ফোরের সাংবাদিক হৃদয় দাশ শুভ বলেন, ‘‘ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সাংবাদিকদের সাংবাদিকতা করার পথে অন্তরায়, অপ- সাংবাদিকতা ও অপকর্মের বিরুদ্ধে এ আইন ব্যবহার হলে আমাদের কোনও সমস্যা থাকার কথা নয়। কিন্তু, গঠনমূলক সমালোচনা সহ্য করতে না পারাটা বোধহয় অসহনশীলতা। তবে, এটাও সত্য যে, মফস্বলে অনেকেই সাংবাদিকতা পেশার আড়ালে নিজেদের রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা চালান, সেটাও দোষের কিছু নয় কিন্তু সাংবাদিকতাকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অস্থিরতা তৈরি করলে এর দায় এড়াতে পারেন না। মফস্বলের সাংবাদিকদের প্রায় ৮০ শতাংশ কোন ধরনের নিম্নতম আর্থিক সুবিধা ছাড়াই মনের খেদ মেটাবার জন্য পত্রিকায় লিখে থাকেন। সমাজের জন্য কিছু একটা করার তাড়না থেকেই এই মানুষগুলো লাভ – লোকসানের হিসাব না কষে কাজ করেন। শিক্ষিত তরুণরাও ইদানিং এ পেশায় আসছেন একপ্রকার নেশা ও শখ থেকে। পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের অভিশাপ ও হতাশা থেকে বাঁচতেও অনেকে অর্থনৈতিক ভিত্তিবিহীন এ পেশায় আসছেন। অল্প সংখ্যক টিকে থাকছেন বাকিরা পেশাগত চাপ সইতে না পেরে নীরবে প্রস্থান করছেন। আমি নিজে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার আসামি হয়েছিলাম সত্য সংবাদ প্রকাশ করার কারণে, জনৈক ব্যক্তি মামলা করে দিয়েছিলেন ট্রাইবুনালে, আদালত তা খারিজ করে দেন। তবে, খারিজ হওয়ার পুর্ব পর্যন্ত আমার যে মানসিক দুশ্চিন্তা, কি না কি হবে, রিমান্ডে নিয়ে শরীরটাকে না আরও ফুলিয়ে – ফাঁপিয়ে দেয় ও জীবনে প্রথমবারের মতো জেল জীবনে যাওয়ার সমুহ সম্ভাবনার চিত্র মনে ফুটে উঠেছিলো, অর্থবিত্তেরও মালিক নই, বাঁধাধরা আয়ও নেই, কে দেবে মামলার খরচ? সেই ট্রমা থেকে কে আমাকে মুক্তি দেবে? এসব চলতে থাকলে, সম্মানজনক জীবন নির্বাহ করার মতো আর্থিক নিরাপত্তা না থাকলে কেনো একজন শিক্ষিত ব্যক্তি লাখ লাখ টাকা খরচ করে পড়াশোনা করে আসবে এ পেশায়? যার জীবনে নেই কোন অপরাধ কর্মের ছিঁটেফোটা সেই সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া ব্যক্তিটি কেন, শুধু সাংবাদিকতার খাতায় নিজের নাম লেখানোর কারণে যেকোন সময় যে কারো দ্বারা মিথ্যা মামলার আসামি হওয়ার ঝুঁকি নিবে। রাষ্ট্র যদি সাংবাদিকদের সর্বপ্রকার সুরক্ষা না দিয়ে নিজেদের দুশমন ভাবেন তা হলে তা দুঃখজনক। প্রফেশ্যনালিজম দিয়ে বিচার করতে হবে, কারও প্রতি অনুরাগ বা বিরাগভাজন হয়ে আইন চালিয়ে দেওয়া কাম্য নয়। নিশ্চয়ই সাংবাদিক নেতা ও তদারককারী কর্তৃপক্ষ এসব প্রশ্নের জবাব দেবেন।’’

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভয়াল থাবার শিকার হচ্ছেন সাংবাদিক ও সম্পাদকরাও। অনৈতিকতার বিরুদ্ধেকলম ধরলেই আসতে পারে এই আইনে মামলা ও গ্রেফতারের মুহুর্ত। সাংবাদিকতা হলো সমাজ ও রাষ্ট্র পরিষ্কার রাখার মাধ্যম। এই পরিষ্কার রাখতে গিয়ে আবর্জনার বিরুদ্ধে কলম ধরলেই ধেয়ে আসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়গ।

বাউল শরিয়ত সরকার ৬ মাস যাবত কারারুদ্ধ রয়েছেন। তার পরিবার অমানবিক জীবন যাপন করছেন।

দৈনিক যোগফলের সম্পাদক ও প্রকাশক আসাদুল্লাহ বাদলকে গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর থানার একটি মামলায় আসামি করা হয়েছে। কিন্তু কোন সংবাদের সূত্রে আসামি করা হয়েছে মামলায় এর কোন বর্ণনা নেই। এ ব্যাপারে বাংলাদেশি উদ্যোক্তা রিক্তা চক্রবর্তী লন্ডনে ক্রমাগত প্রচার চালাচ্ছেন আইনটি বাতিলের জন্য। তিনি বলেন, সংবাদ প্রকাশের আগে সম্পাদক প্রকাশককে মামলায় আসামি করার সুযোগ কই?

জামিন অযোগ্য এই আইনের কারণে জেলবন্দি জীবন কাটাতে হয় সাংবাদিকসহ ভুক্তভোগীদের।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও আইনের অধ্যাপক ডক্টর মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘আমরা উদ্বেগের সাথে এই সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যবহার বাড়ার বিষয়টি লক্ষ্য করছি। আর তা বেশি ব্যবহার হচ্ছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এটা আসলে আমাদের আতঙ্কিত করে।’’

তিনি বলেন, ‘‘এই সময়ে ত্রাণ নিয়ে কোথায় দুর্নীতি হচ্ছে। করোনা প্রতিরোধে কোথায় বাধা আছে এগুলো সরকারের জানা দরকার। সাংবাদিকেরাই তা জানাচ্ছেন। কিন্তু তা করতে গিয়ে তারা যদি মামলা গ্রেপ্তারের শিকার হন তা হলে তো দুর্নীতিবাজেরা সুবিধা পাবে, এটা তো হতে পারে না।’’

ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, মানুষ একে অন্যকে হেয় করে অবান্তর মন্তব্য করছে। সমাজে অসহিষ্ণুতা ও অস্থিরতা বেড়েছে। তুচ্ছ কারণে মানহানি, কটূক্তি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে মামলা হচ্ছে।

আইনজীবী শাহদীন মালিক অবশ্য মনে করেন, মতপ্রকাশের কারণে ফৌজদারি আইনে গ্রেপ্তারের বিধান দেশকে সামন্ত যুগে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। সরকার আপাতত হয়তো কিছু লোককে শায়েস্তা করছে, কিন্তু মানুষ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। নিজের ভালোর জন্যই সরকারের উচিত আইনটি বাতিল করা।

সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার ও সাংবাদিকতার শিক্ষক অধ্যাপক গোলাম রহমান বলেন, আইনটা প্রণয়নের সময়ই কিছু ধারা সংশোধন করতে বলা হয়েছিলে। কিন্তু করা হয়নি। এখন তো দেখা যাচ্ছে যে কাউকে মামলায় দেওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিক্যাল ১৯’র দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল ও বাংলাদেশের পরিচালক ফারুখ ফয়সল বলেন, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার বা জোর দেখানোর জন্যই এই আইনে মামলা বাড়ছে। সামনে নিপীড়ন ও হেনস্তা আরও বাড়বে।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলছেন, এ আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধগুলো দমনের জন্য আইনটি জরুরি। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আমি বলছি না যে আইনের অপব্যবহার হচ্ছে না। প্রমাণিত হলে যারা করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকার এটা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে।’



এই বিভাগের আরও