গণমাধ্যম যা প্রচার করে না, জগতে তা ঘটে না?

আসাদুল্লাহ বাদল

11 Jul, 2020 03:43am


গণমাধ্যম যা প্রচার করে না, জগতে তা ঘটে না?
ছবি: রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদের ফেসবুক আইডি থেকে

“জনগণ কতটা জানবে, কতটা শুনবে, তা একসময় স্থির করে দিতো শাসকরা [রাজা-বাদশাহ-পুরোহিত]। এখন নির্ধারণ করে দেয় গণমাধ্যম। গণমাধ্যম যা প্রচার করে না, জগতে তা ঘটে না? গণমাধ্যম কেবল এখন বাস্তবতার প্রতিফলন নয়, বাস্তবতার উৎস।” - বেন বাগডিকিয়ান।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ঘটনা ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য পাঁচ অচেনা ব্যক্তি ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটির হেড অফিসে দরজা ভেঙে প্রবেশ করেছিলেন। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ তাদের পত্রিকায় প্রথমে দুই কলামে একটি খবর ছাপে। ঘটনাটিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ মনে করে পত্রিকাটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকে।

এর যা প্রভাব, তা অচিরেই পড়ে। এর মাত্র এক বছর আগে নিক্সন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনায় বিরূপভাবে সমালোচিত। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মনে ওয়াটারগেট জায়গা পেয়ে যায়। ১০ মাস পরে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৯০ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক জনগণ মনে করতে থাকে ‘ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি’ একটা বড় ব্যাপার। এরইমধ্যে মার্কিন সিনেটে শুরু হয় শুনানি।

টিভি চ্যানেলগুলো ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশে যুক্ত হয়। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ ছড়িয়ে পড়ে সব গণমাধ্যমের ভিড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেডিডেন্ট নিক্সন নিজেকে নির্দোষ দাবি করতে থাকে, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নতুন মোড় ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি। নিক্সন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ফলে ওয়াটেরগেট কেলেঙ্কারির দায় পড়ে নিক্সনের ওপর।

নিক্সন অবশ্য বারবার দায়ি করেছিলেন গণমাধ্যমকে। পদত্যাগই শেষকথা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে ভাবাতে বাধ্য করা হয়, ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ছিল বড় রকমের অপরাধ। এজেন্ডা সেটিং করে গণমাধ্যম কি করতে পারে, এর উদাহরণ ও দৃষ্টান্ত ‘ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ও ওয়াশিংটন পোস্ট’।


চ্যানেল টুয়োন্টিফোর টেলিভিশনের অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘সার্চলাইট’ যদি খবর প্রচার না করতো তা হলে হয়তো আমরা কোনদিনই জানতে পারতাম না, লাইসেন্স ছাড়াও হাসপাতাল চালানো যায়। জার্মানির রেডিয়ো ডয়চে ভেলে জানিয়েছে, বাংলাদেশের ৫০ শতাংশ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নবায়ন হয়না। লাইসেন্স না থাকলেও বিশেষ রোগের বিশেষত বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা সেবা দেওয়া যায়। পরীক্ষা না করেও করোনা শনাক্ত করা যায়। এটিই হয়তো সব সম্ভব বলে খ্যাত।

স্মরণীয়, জুলাই মাসের ৬ তারিখে রিজেন্ট হাসপাতালে র‌্যাব অভিযান চালায়। অভিযানের আগে রিজেন্ট ছিল একটা ‘কীর্তিময়’ হাসপাতাল। করোনা চিকিৎসা দেওয়ায় এগিয়ে আসা বেসরকারি হাসপাতালের প্রথম সারিতে রিজেন্টের নাম। আইনজীবীদের জন্য যে তিনটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল সেখানে রিজেন্ট তালিকাভুক্ত। সত্য হচ্ছে ৪ জুলাই রিজেন্টের চেয়ারম্যান মো. সাহেদের পিতা সিরাজুল ইসলাম করোনায় সংক্রমিত হয়ে ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই ভর্তি সাহেদ নিজে করিয়েছেন। নিজের হাসপাতাল করোনা চিকিৎসার জন্য ডেডিকেট করে নিজের পিতাকে অন্য হাসপাতালে ভর্তি করার মধ্য দিয়ে সাহেদ তার প্রতারণাকে ‘খাঁটি’ হিসাবে প্রমাণ করেছেন।


এর আগে অবশ্য জিকেজের ডাক্তার সাবরিনা আরিফ চৌধুরী আলোচনায় চলে এসেছেন, পরীক্ষা না করে নকল রিপোর্ট দেওয়ার জন্য। পৃথিবীতে আর কোথাও এ জাতীয় প্রতারণা করা হয় কি না ভাবতেও সময় লাগবে। সাবরিনা বাংলাদেশে দ্বিতীয় হার্ট সার্জারির নারী ডাক্তার হলেও প্রথম ডাক্তারকে ‘আড়াল’ করে ফেলেছেন অপপ্রচারের মাধ্যমে। তিনি এমন আধুনিকতার ও প্রযুক্তির ব্যবহার করেছেন, যেন তিনিই প্রথম ডাক্তার হিসাবে গর্বিত। খোদ প্রধানমন্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি এমন দাবি করেছেন।

সম্প্রতি করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়ে ইতালিতে যাওয়া করোনা পজেটিভ বিমান যাত্রীদের ইতালির গণমাধ্যম ‘করোনা বোমা’ আখ্যা দিয়েছে।

অপরাধীর কোন দলীয় পরিচয় থাকে না, এই মেঠো বক্তব্য আর কতকাল শুনতে হবে। সব যুক্তি ছাড়িয়ে ক্যাসিনো ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক পদধারী ছিল এটি প্রমাণ হয়েছে। দলীয় পদ ছিল বলেই তারা এ জাতীয় অপরাধ করতে পেরেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করতে রাজনৈতিক পরিচয় দরকার হয়। পাপিয়াও একই রকমের কাজ করেছে দলীয় পদ দিয়ে। মো. সাহেদও রিজেন্ট থেকে শুরু করে, সব অপরাধ করেছে দলীয় বৃত্তে। ধরা পড়ার পর এসব অস্বীকারে কি আসে যায়। অপরাধী হিসাবে অভিযুক্ত হওয়ার পর সংগঠন থেকে বহিষ্কার করার প্রবণতা আর এক ধরনের ধাপ্পাবাজি। কেবল বহিষ্কার করে দেওয়া কোন শাস্তি নয়। বরং তাকে দলের ভেতরে রেখে আদালতের শাস্তি ঘোষণার পরই দলীয় সিদ্ধান্তে যাওয়া উচিত। এই যে পাপিয়া কিংবা সাহেদের এত এত ছবি ভাইরাল হচ্ছে, এসব কি কেবল সাহেদের দোষ। যারা সাহেদকে কাছে ঘেঁষার সুযোগ দিয়েছে, তাদের কোন দোষ নেই। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত ছবিতে ক্লোজ করে নেওয়া কি খুবই সোজা? আমি ইচ্ছা করলেই বড় বড় নেতা মন্ত্রী, এমপি, আমলাদের সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ পাব। সাহেদের অপকর্ম ধরা না পড়লে তার ছবি তোলা কি অপরাধ ছিল? সামনে পেছনে আসলে কত দূরত্ব এটি আমরা কেন বিবেচনা করি না। সাহেদ বেকায়দায়, সবাই কেটে পড়ার চেষ্টায় ব্যস্ত। কিন্তু সাহেদ কেন এই অপরাধ করার সুযোগ দিনের পর দিন পেলো, কারা তাকে এই সুযোগ করে দিলে, ওই পথ বন্ধ করবেন কিনা এটি নিশ্চিত করুন।


সাহেদের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে সূত্রেই জগতে সাহেদের ‘করোনা বোমা’ স্থান পেয়েছে। এই রকম অসংখ্য সাহেদ আমাদের আশেপাশেই আছে। জেনেও না জানার ভান করি বা না জানার কারণে প্রকাশ করতে পারি না। অথবা প্রকাশ করার জন্য যত আয়োজন দরকার, তত আয়োজন হাতে থাকে না। আবার থাকলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ‘খড়গ’ মাথার ওপর ভর করে থাকে। কিংবা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে খড়গের শিকার হলেও অন্যায় ঘটনাটি চেপে যাওয়ার প্রবণতা আর দশটা গণমাধ্যমের থাকে। মামলা দায়ের হলেও মামলার খবরটিও চেপে যেতে হয়। খবরটি আমজনতা জেনে গেলে কোন দুর্নীতিবাজ বেকায়দায় পড়তে পারে, এই ভাবনাও কেউ কেউ ভাবে! তবু আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা চাই।

গত ৩১ মে নাটকীয় ভঙ্গিতে গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর থানার পুলিশ তিন সাংবাদিককে [মো. মোজাহিদ. রুকনুজ্জামান খান ও মিলন শেখ] আটক করে। পুলিশের ভাষ্যমতে তাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরও ১৮ ঘণ্টা পরে একটি মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় কোন প্রকাশ হওয়া সংবাদের রেফারেন্স ‘না’ দিয়েই দৈনিক যোগফল সম্পাদক প্রকাশকের [অ্যাডভোকেট আসাদুল্লাহ বাদল] নাম জড়িত করে। সংবাদ প্রকাশের জের ছাড়া কি পত্রিকার সম্পাদক প্রকাশককে আসামি করা যায়? এই প্রশ্ন করার মতো ক্ষমতাবান সাংবাদিক আমাদের চারপাশে পাওয়া যায়নি। যদি ব্যক্তিগত কোন মতের কারণে কাউকে আসামি করা হয়, তা হলে কি ‘সম্পাদক প্রকাশক’ হিসাবে কাউকে আসামি করা যাবে?


ওই মামলার [ জয়দেবপুর থানা ০১(০৬)২০২০] সময় ৩১ মে রাত এগারোটা ২০ মিনিটের আগে নিশ্চিত করা হয়েছে এফআইআর এ। আগেও বলেছি, আবার বলছি, মামলার এজাহারে যে স্ট্যাটাসের স্কিনশট যুক্ত করা হয়েছে তা ‘৩১ মে রাত এগারোটা ২০ মিনিটের আগে’ নয়। তা হলে প্রশ্ন হচ্ছে ২০১৯ সালের পরীক্ষা কি ২০২০ সালের প্রশ্ন দিয়ে নেওয়া যাবে? জয়দেবপুর থানা পুলিশ অবশ্য পারতে পারে গোঁজামিল দিয়ে! এর একটা কথা হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় ডিজিটাল ডিভাইস ছাড়া ‘কাগুজে’ ব্যাপার কি প্রযোজ্য? ওই মামলায় সব বক্তব্য কাগুজে।

তিন সাংবাদিকের নামে গুপ্তচরবৃত্তির কোন অভিযোগ নেই। তারা একটি সংবাদের অনুসন্ধান চালাচ্ছিল মাত্র। অনুসন্ধানটি ওই মামলার পাঁচ নম্বর আসামি সাহিদা আক্তারের। সাহিদা সাংবাদিকদের যে বক্তব্য দিয়েছে তা সত্য-মিথা যেকোন একটা হতে পারে। এর পুরো দায় সাহিদার। আবার মিথ্যা হলে সাহিদার কত সাহস যে, আইজিপিকে অভিযোগ জানিয়েছে। সাংবাদিকদের দায় কি? সাংবাদিকরা জেনেশুনে মিথ্যা ঘটনা প্রকাশ করলে হয়তো দায়ি হতো। সংবাদ প্রকাশের আগেই তারা [সাংবাদিকরা] অভিযুক্ত হয়ে গেলো? এই সাধারণ প্রশ্নটি কলম সৈনিকরা করতে পারেনি বলে একটি সাধারণ খবর লেখা যায়নি। সংবাদ লেখার ‘সিক্স সেন্স’ হয়তো বিভোর ঘুমে ছিল।


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে দাঁড়ানো একটি ছবি রিজেন্টের সাহেদ তার ফেসবুক আইডির কভার ছবিতে যুক্ত করেছেন। তার আইডিতে হাজারও ছবি আছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ থেকে শুরু...। সাধারণ অনেকের ছবিও আছে। গাজীপুর জেলার একাধিক নেতার ছবিও আছে। চমক হচ্ছে সাহেদ প্রধানমন্ত্রীর সামনে দাঁড়ানো ছবিটি বেশ কয়েক বছর আগেই ফেসবুকে আপলোড করেছেন। এটি হয়তো তার বন্ধুবান্ধব ছাড়া কেউ জানতো না। কে এই সাহেদ, আমরা কতজনই জানতাম। যখনই তিনি ‘করোনা বোমা’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছেন, তখনই আমরা জানতে পেরেছি। এমনকি সাহেদ রাষ্ট্র ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে নিজের ফায়দা লুটেছেন এটিও জানান দিয়েছে ‘গণমাধ্যম’। ফলে গণমাধ্যম প্রচার করলেই ঘটনা ঘটে, প্রচার না করলে ঘটনা ঘটলেও ‘চাপা’ পড়ে থাকে। যেমন চাপা পড়েছে গাজীপুরের চার সাংবাদিক। কাউকে জানতেই দেয়নি কি ঘটনায় মামলা হয়েছিল? কেন মামলা হয়েছিল? মামলা হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছিল কিনা?

গণমাধ্যমই জানান দিবে কিভাবে ঘুস লেনদেন হয়েছিল।

আসাদুল্লাহ বাদল: প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক যোগফল। ১১ জুলাই ২০২০।



এই বিভাগের আরও