প্রতারণা-চাঁদাবাজির মামলায় কাপাসিয়ার ‘সাখাওয়াত’ কারাগারে ও পল্লী বিদ্যুৎ সমাচার

যোগফল রিপোর্ট

27 Jul, 2020 03:55pm


প্রতারণা-চাঁদাবাজির মামলায় কাপাসিয়ার ‘সাখাওয়াত’ কারাগারে ও পল্লী বিদ্যুৎ সমাচার
সাখাওয়াত হোসেন

গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহক সমিতির নির্বাচিত পরিচালক এএসএম মুমিত ওরফে জাকির হোসেনের জাতীয় পরিচয়পত্র নকল করে জালিয়াতি, প্রতারণা, চুরি ও ভয়-ভীতি দেখিয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগে সাখাওয়াত হোসেন নামে এক ব্যক্তি গ্রেফতারের পর এখন কারাগারে রয়েছেন। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের বাসন থানায় করা মামলায় গত ২৩ জুলাই গ্রেফতার হয়ে একদিনের রিমান্ড শেষে তিনি জেলহাজতে আছেন। 

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পরিচালক পদকে ঘিরে একাধিক অভিযোগ দাখিল হয়েছে বিভিন্ন দফতরে। দায়িত্বে না থেকেও পদের দাবি করার অভিযোগ রয়েছে একজনের। থানায় জিডি দায়ের ও আদালত প্রাঙ্গণে থাকার সময়ে ২০ কিলোমিটার দূরে হুমকির পাল্টা জিডির কৈফিয়ত তৈরি হয়েছে। সমিতির সর্বোচ্চ দফতরে দাখিল হয়েছে অভিযোগ।

গাজীপুর পল্লী বিদুৎ সমিতি-২, কাপাসিয়া উপজেলার টোক ইউনিয়নের চেওরাইট গ্রামের বাসিন্দা এএসএম মুমিত ওরফে জাকির হোসেনকে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর রিটার্নিং অফিসার ও নির্বাচন কমিশন প্রধান গত পাঁচ মাস আগে এককভাবে বৈধ প্রার্থী ও নির্বাচিত বলে ঘোষণা করেন। চলতি বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রায় পাঁচ মাস গত হলেও তাকে দায়িত্বভার দেওয়া হয়নি। পরিচালক হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই সাখাওয়াত হোসেন তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে বিভিন্ন উপায়ে ক্ষতির অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় সাখাওয়াত জাকিরের স্মার্ট কার্ডের নম্বর পুরাতন জাতীয় পরিচয়পত্রে প্রতিস্থাপন করে জালজালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ার নিকট সরবরাহ করে। জাকিরকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টায় মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় অপবাদ ছড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ করে।

বিবাদী সাখাওয়াত হোসেন টোক ইউনিয়নের বাসিন্দা না হয়েও জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটানোর কারণ মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে সে ক্ষিপ্ত হয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে। গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে হলে চাঁদা না দিলে নানাভাবে হয়রানির হুমকি দেয়। পরে জাকির হোসেন তার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় পুনরায় তার বিরুদ্ধে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন তথ্য উপাত্ত দিয়ে আবেদনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিভিন্ন স্থানে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। 

জাতীয় পরিচয়পত্রে ১৩ ডিজিট থাকলেও সাখাওয়াত যে ‘নকল জাতীয় পরিচয়পত্র’ দিয়েছেন তাতে রয়েছে ১০টি ডিজিট। এমনকি ডিজিটের শুরুতেই কয়েকটি ঘর ফাঁকা রয়েছে। এতে প্রমাণ হয় ওই পরিচয়পত্রটি ঘষামাজা করে বানানো হয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই না করেই কেবল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার পরিচালক বাদ দিয়েছেন কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়ে দিয়ে। এখানে তৃতীয় পক্ষের হাত রয়েছে বলেও জাকির দাবি করেন। এই নিয়ে সম্প্রতি গাজীপুর জেলার একাধিক থানায় পাল্টাপাল্টি জিডি হয়েছে। বর্তমানে চালু হওয়া স্মার্টকার্ডে ১০ ডিজিট ব্যবহার করা হয়েছে। স্মার্টকার্ডের ১০ ডিজিট জাতীয় পরিচয়পত্রের আসল ডিজিট ঘষামাজা করে সেখানে বসিয়ে দিয়ে পরিচালক জাকিরের জাতীয় পরিচয়পত্র নকল করেছে। আর পল্লী বিদ্যুত সেই ফাঁদে পা দিয়ে তার পদ বাতিল করেছে। তিনি লিখিত অভিযোগেও এসব কথা জানিয়েছেন।

সাখাওয়াত কারাগারে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়ার সুযোগ হয়নি যোগফলের।

জাকির হোসেন আরও জানান, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নির্বাচনে হলফনামায় সে কাপাসিয়ার টোক ইউনিয়ন পরিষদের ভোটার দাবি করে কোন কাগজপত্র দাখিল করেন নাই। নির্বাচনী তফসিলের শর্ত ভঙ্গ বা জালজালিয়াতি করে কোন নাগরিকত্ব সনদপত্র জমা দিয়ে পরিচালক পদে মনোনীত হননি। টোক ইউনিয়নের বীর উজলী চেওরাইট নামক স্থানে তার ক্রয় করা সম্পত্তি রয়েছে। সেখানে প্রস্তাবিত মেসার্স মুমিত ফিলিং স্টেশন নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণাধীন রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের নামে টোক ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স, বাস্তÍভিটার উপর ট্যাক্স, নাগরিকত্ব সনদ, বৈধ বিদ্যুতিক মিটার, বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার আপডেট কপি, ট্যাক্স রশিদ, শিক্ষাগত সনদসহ নির্বাচনী তফসিলের সকল শর্ত পূরণ করে প্রার্থী হন। নির্বাচন কমিশন তাকে এককভাবে বৈধ প্রার্থী এবং নির্বাচিত ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই সাখাওয়াত তার সাফল্য দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে বিভিন্ন জালজালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে মিথ্যা অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। সে বিভিন্ন সময় ভিন্ন নাম ব্যবহার করে জায়গা-জমি বিক্রয় ও দলিল সম্পাদন করে মানুষের সাথে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেয়। এ ব্যাপারে তার কাছে যথেষ্ট প্রমাণ আছে বলে জাকির হোসেনের দাবি। এসব কাগজপত্র যোগফল মর্গেও রয়েছে।

সাখাওয়াতের দায়ের করা বিভ্রান্তিমূলক তথ্যের ভিত্তিতে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর রিটার্নিং অফিসার ও নির্বাচন কমিশন প্রধান মো. সাব্বিউল ফেরদৌস গত ১৬ জুলাই এক পত্র পাঠান। এতে তিনি উল্লেখ করেন, প্রার্থীর জালিয়াতি ও অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় সূত্রীয় স্মারকের প্রকাশ হওয়া পত্রের শর্তানুযায়ী এলাকা পরিচালকের পদ বাতিল করা হলো। এ ব্যাপারে ২০ জুলাই ওই পরিচালক এ এস এম মুমিত ওরফে জাকির হোসেন নির্বাচন কমিশন বরাবর তার বিরুদ্ধে জাল সনদের অভিযোগকারী মো. সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেছেন। 

গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) হাসান শাহনেওয়াজ যোগফলকে জানিয়েছেন, জাকিরকে বাদ দেওয়া হয়েছে সাখাওয়াতের আবেদনের কারণে। এর পিছনে আরও ইন্ধন আছে বলেও জানান তিনি।

পরে গত ২১ জুলাই এএসএম মুমিত ওরফে জাকির হোসেন গাজীপুর আদালতে সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে একটি সি আর মামলা (নম্বর ৫৭৩) দায়ের করেন। ২২ জুলাই আদালতের আদেশক্রমে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের বাসন থানায় পেনাল কোডের ৪১৯/৪৬৫/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/৪২০/৩৮৫/৩৮০/৫০৬ ধারায় মামলা রুজু করেন। মামলা নম্বর ৩১।

এই মামলায় আসামি সাখাওয়াত হোসেনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তাকে একদিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। আদালত এর আগে ওই রিমান্ড দেন। এই ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।

গত ২৪ জুলাই জাকির হোসেন গাজীপুর আদালত অঙ্গণে মামলা পরিচালনার কাজে আসলে তাকে আসামি সাখাওয়াতের পোষ্যরা মামলা প্রত্যাহারের হুমকি দেন। ওই অভিযোগে জাকির জিএমপির সদর থানায় অচেনা ৪-৫ জনের নামে একটি জিডি করেছেন। জিডি নম্বর ১১২৭। তারিখ: ২৪ জুলাই ২০২০। তিনি দাবি করেছেন যারা তাকে হুমকি দিয়েছেন তাদের দেখলে তিনি চিনতে পারবেন।

পরিচালক নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ: 

গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর আওতায় ভাওয়াল গড়, মির্জাপুর, পিরুজালী ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ২১, ২২ ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান পরিচালক মো. নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে দালালি ও সুবিধা না পেয়ে লাইন স্থাপনে বাধাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। গাজীপুর সদরের জানাকুর গ্রামের আব্দুর রহমানের সন্তান মো. নুরুল ইসলাম নরওয়ের পাসপোর্টধারী। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ ক্যান্টনমেন্ট এলাকার নয়নপুরে দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ নরওয়ে ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল’ পরিচালনা করছেন। পল্লী বিদ্যুৎ অফিসটি একই এলাকায় হওয়ায় স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে  দ্বিতীয় মেয়াদেও পরিচালক নির্বাচিত হন। পরিচালক হওয়ার পর থেকে সার্বক্ষণিকভাবে অফিসে বিচরণ করেন এবং সাধারণ গ্রাহকের যে কোন কাজ করতে হলে তার শরণাপন্ন হতে হয়। অফিসের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজসে তিনি দালালি করে বিপুল পরিমাণ টাকা-পয়সার মালিক হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে জানাকুর এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মহল্লার উপর দিয়ে ১১ হাজার ভল্টের লাইনটি রাস্তার পাশে স্থানান্তরে বাধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

জিএম হাসান শাহনেওয়াজ যোগফলকে জানিয়েছে, নুরুল ইসলামের আচরণ বিরক্তিকর। ফলে তাকে অফিসে আসতে বারণ কর হয়েছে।

অভিযোগকারী মো. বাবুল হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার মো. কামরুজ্জামান, সার্জেন্ট মো. শহিদ, মোসা. তাসলিমা গত একবছর যাবৎ তাদের ঝুঁকিপূর্ণ লাইনটি সরানোর কাজে প্রতিনিয়ত বাধার সম্মূখীন হচ্ছেন। গত বছরের মে মাসে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদনের প্রেক্ষিতে নতুন করে নকশা তৈরি করা হয়। লাইন স্থানান্তরে ঠিকাদার পদক্ষেপ নিলে নুরুল ইসলামের অনুগত ব্যক্তিরা বারবার বাধা সৃষ্টি করছে। 

বাবুল হোসেন যোগফলকে জানিয়েছেন, নুরুল ইসলাম সাবেক সভাপতি হয়েও রানিং সভাপতি পরিচয় দেন। জিডিতেও তিনি সভাপতি পরিচয় দিয়েছেন। জিএম শাহেনেওয়াজও যোগফলকে জানিয়েছেন নুরুল ইসলাম এখন সভাপতি নেই। আগেই তার মেয়াদ শেষ হয়েছে।

এদিকে গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর থানায় বাবুল হোসেন গত ২৫ জুলাই নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একটি জিডি করেছেন। ওই জিডির নম্বর ১০৩৭। জানাকুর গ্রামের মৃত আ. রহমানের সন্তান ওই জিডিতে অভিযোগ করেছেন অভিযুক্ত নুরুল ইসলাম জিডি দায়েরকারীকে চিঠি লিখেও আচরণে হুমকি দিয়েছেন। এছাড়া এসব অনিয়মের কারণে গাজীপুর জেলার একটি দেওয়ানি আদালতে দেওয়ানি মামলা নম্বর ১০৫/২০২০ দায়ের করেছেন বলেও জানা গেছে।

এদিকে নুরুল ইসলাম জয়দেবপুর থানায় জাকির হোসেনের নামে একটি জিডি করেছেন গত ২৫ জুলাই। তিনি অভিযোগ করেছেন জাকির নুরুল ইসলামের অফিসে হাজির হয়ে ২৪ জুলাই তাকে হুমকি দিয়েছেন। জিডি নম্বর ১০৩৪।

এ ব্যাপারে জাকির হোসেন যোগফলকে জানিয়েছেন, তিনি গাজীপুর সদর থানায় হাজির হয়ে ২৪ জুলাই তাকে আদালত প্রাঙ্গণে হুমকি দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে একটি জিডি করেছেন। এ ছাড়া সারাদিন তিনি আদালতেই ছিলেন। আদালত এলাকা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার  দূরে একই সময়ে নুরুল ইসলামকে হুমকি দেওয়া মোটেও সম্ভব নয়। নুরুল ইসলাম সভাপতি না হয়েও সভাপতি পরিচয় দিয়ে প্রতারণার আশ্রয়ে জিডি করেছেন বলে জানান জাকির। নুরুল ইসলাম সব ক্ষেত্রেই এমন করে থাকেন।

এ ব্যাপারে নুরুল ইসলামের ব্যবহার করা মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে তাকে দুইবার এসএমএস পাঠানো হয়। এতেও তিনি সাড়া দেননি। তার ইমো নম্বরেও মেসেজ পাঠানো হয় যোগফল থেকে। তাতেও তিনি সাড়া দেননি।


বিভাগ : অপরাধ