আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘জাজ, জুড়ি অ্যান্ড এক্সিকিউশনার’

আলী রীয়াজ

04 Aug, 2020 06:29am


আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘জাজ, জুড়ি অ্যান্ড এক্সিকিউশনার’
ছবি : সংগৃহীত

টেকনাফে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ ‘পুলিশের গুলিতে নিহত’ হবার পরে আলোচনার ঝড় উঠেছে। গত শুক্রবার রাত ককসবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কে পুলিশ তল্লাশি চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ ‘নিহত হন’। 

ঘটনার যে সব বর্ণনা গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে তাতে এই ধারণাই স্পষ্ট যে সিনহা রাশেদকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে। এটাই হচ্ছে বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাস্তায় দাঁড়িয়ে ‘জাজ, জুড়ি অ্যান্ড এক্সিকিউশনার’ এর ভূমিকা নিয়েছে পুলিশ। এরমধ্যে এই নিয়ে তদন্ত কমিটি হয়েছে, সেই তদন্ত কমিটি পুনর্গঠিত হয়েছে, বাহারছড়া ফাঁড়ির ইনচার্জসহ ১৬ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। যে কোনও অপঘাতে মৃত্যুই বেদনাবহ, যখন তা হত্যাকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে ঠান্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড তখন তা কেবল বেদনাবহ নয়। কেবল শোকের বিষয় নয়। পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে একাধারে ‘জাজ, জুড়ি অ্যান্ড এক্সিকিউশনার’ হয়ে উঠেছে এবং তা যে হয়েছে অনেক দিন আগেই সেই প্রশ্নটি আমাদের মাথায় রাখতে হবে। 

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের হিসাব অনুযায়ী এই বছরের ছয় মাসে ১৫৯ জন বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। গত বছর ৩৯১ জন, তার আগের বছরে ৪৬৬ জন। এরও পেছনে যেতে পারেন সংখ্যা পাবেন; আরও অনেক সংখ্যা। কিন্ত এই সংখ্যাগুলো হচ্ছে অনেক অনেক মেজর সিনহা রাশেদ এই অর্থে তারা মেজর সিনহা যে তারা বাংলাদেশের নাগরিক। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিক যে কোন স্থানে অবস্থানরত অবস্থায় আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার রাখে। ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, "আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।" কিন্ত সংবিধানের দেওয়া এই সব রক্ষা কবচ নাগরিককে রক্ষা করতে সক্ষম  হচ্ছেনা। বাংলাদেশে গত এক দশক বা তার চেয়ে বেশি সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যার দায়ে কেউ কি বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন? ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, বন্দুকযুদ্ধের নামে ২০০৪ থেকে ২০১৮ সালে পর্যন্ত নিহত হয়েছিলেন সোয়া দুই হাজার। ২০২০ সালের জুনের শেষ নাগাদ তা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪০২ জনে। 

ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মৃত্যু, নাকি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডএর বিহিত চেয়ে ভুক্তভোগী পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো উচ্চ আদালতে ২০০৬ এবং ২০০৯ সালে তিনটি রিট করেছিলো। আদালতও স্বপ্রণোদিত হয়ে রাষ্ট্রের কাছে জবাব চেয়েছেন। ২০০৯ সালের ২৯ জুন হাইকোর্ট ক্রসফায়ার কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং কেন এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি কার্যক্রম নেওয়ার আদেশ দেওয়া হবে না, এই মর্মে সরকারের প্রতি রুল জারি করেছিলেন। সেই রুলে আদালত বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে হুঁশিয়ারি উচ্চারণের পরও সরকারের প্রতি আনুগত্যের ছলে এ জঘন্য কর্মকাণ্ড চলছে, যা মূলত সরকারের ভাবমূর্তিকেই নষ্ট করছে বলে মনে করে নাগরিক সমাজ। এ ধরনের কিছু লোক আসলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও হেফাজতে নির্যাতনের মাধ্যমে সরকারেরই মানহানি করছে।’ (প্রথম আলো, ১৯ জুন ২০১৮)। ২০১৯ সালে একটি আদালত ‘বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে বিভিন্ন বাহিনীকে সতর্ক করে’ (বিবিসি, ৪ জুলাই ২০১৯)। সরকারের পক্ষ থেকে মন্ত্রীরা বলেন যে, বাংলাদেশে কোন বিচার বহির্ভূত হত্যা হয়না। 

শুধু তাই নয়।  ২০১৮ সালে টেকনাফে একরামুল হকের ‘মৃত্যুর’ পরে তার বাসায় উপস্থিত হয়ে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেছিলেন, ‘গাইড লাইন তৈরি হচ্ছে, বন্ধ হবে বিচার বহির্ভূত হত্যা। আইনের বাইরে যাতে কোনো মানুষের মৃত্যু না হয় সেই দায়িত্ব সরকারের’ (এনটিভি অনলাইন, ২৪ জুন ২০১৮)। সেই গাইডলাইনের কি হয়েছে আমরা জানিনা, মানবাধিকার কমিশন জানে কিনা সেটাও প্রশ্ন। গত কয়েক মাসে টেকনাফে যে ভয়াবহ আকারে এই ধরণের হত্যাকান্ড চলেছে তা যারা খবর রাখেন তারা জানেন। দেশের সবগুলো ক্রসফায়ারের এক চতুর্থাংশ হয়েছে ককসবাজার এলাকায় (কামাল আহমেদ, ডেইলি স্টার ৭ মার্চ ২০২০)। 

এই রকম একটা পটভুমিকায় সংসদে দাঁড়িয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সদস্য এবং বিএনপির সদস্য ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ক্রসফায়ারের দাবি তুলেছেন, বাংলাদেশের কোনও কোনও সাংবাদিক প্রকাশ্যে ক্রসফায়ারের পক্ষে ওকালতি করেন। আর টেকনাফ অঞ্চলের সাংবাদিকরা ক্রসফায়ারের হোতা বলে পরিচিত বলে পুলিশ কর্মকর্তার গুণ গাঁথা লেখেন, সেগুলো ছাপা হয়, প্রকাশ হয়। 

তারপরেও বুঝতে পারছেন না রাস্তাকে কেন পুলিশ আদালত বানিয়েছে এবং তাদের ‘রায়’ তারাই বাস্তবায়িত করেছে? যেখানে আইনের শাসন নেই, যেখানে আপনি ‘ক্রসফায়ারের’ আবেদন করে অভ্যস্ত সেখানে সিনহা রাশেদের মত অনেককেই প্রাণ দিতে হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আরও অনেকের প্রাণ যাবে --  যতক্ষণ না আপনি-আমি আইনের শাসন চাইছি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্রিয় হচ্ছি। সিনহা রাশেদের ‘মৃত্যুর’ জন্যে দায়িদের বিচার হউক, তার পরিবার ন্যায় বিচার পাক। কিন্ত সব নাগরিকের জন্যে ন্যায়বিচারের ব্যবস্থা কি সেটা ভাবুন। এর কোনও বিকল্প নেই।

আলী রীয়াজ তার ফেসবুক আইডিতে লেখাটি প্রকাশ করেছেন ৩ আগস্ট ২০২০।


বিভাগ : মুক্তমত


এই বিভাগের আরও