২৭ বছরের সম্পর্ক শেষ ভগ্নিপতিকে খুনের মাধ্যমে

যোগফল প্রতিবেদক

10 Aug, 2020 07:53am


২৭ বছরের সম্পর্ক শেষ ভগ্নিপতিকে খুনের মাধ্যমে
ছবি প্রতীকী

দীর্ঘ দুই যুগের দেনা-পাওনা নিয়ে বিরোধ থেকে জন্ম নেয়া ক্ষোভের জেরে আবাসন ব্যবসায়ী আবুল খায়েরকে (৫২) খুন করেছে তার সম্বন্ধী মো. মিলন (৪৪)। গ্রেফতারের পর মিলন রোববার [৯ আগস্ট ২০২০] আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এদিন দুপুরে নিজ কর্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করে ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এসব তথ্য জানান।

সুদীপ কুমার চক্রবর্তী জানান, দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে আবুল খায়ের ও তার সম্বন্ধী (স্ত্রীর বড় ভাই) মো. মিলন ঠিকাদারি করে আসছিলেন। ধীরে ধীরে তাদের উন্নতি শুরু হয়। সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতায় মিলন নিজের বোনের সঙ্গে আবুল খায়েরের বিয়েও দেন। লেখাপড়া জানা আবুল খায়ের গড়ে তোলেন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ‘সজীব বিল্ডার্স’। সেই প্রতিষ্ঠানে তিনি নিজে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হন। তার বাড়ি-গাড়ি হলেও মিলন রয়ে যান নির্মাণ শ্রমিকই। সেখান থেকেই মূলত মিলনের মনে জমতে থাকে ক্ষোভ। মিলন প্রাপ্ত মজুরিটাও ঠিকঠাক পেতেন না বলে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে বোনের সঙ্গে ভগ্নিপতি আবুল খায়েরের মনোমালিন্য তৈরি হয়। হাতও তোলেন বলে অভিযোগ মিলনের। সব মিলিয়ে মিলন গত ৬ আগস্ট বিকালে ভগ্নিপতিকে নির্মাণাধীন একটি ভবনে ডাকেন কথা বলার জন্য। মূলত তাদের দুইজনের মধ্যে দেনা-পাওনা নিয়ে দেন দরবারের একপর্যায়ে রাগান্বিত হয়ে মিলন প্রথমে রড এবং পড়ে কাঠ দিয়ে মাথায় একের পর এক আঘাত করে ভগ্নিপতি আবুল খায়েরকে আঘাত করে। এতে ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করেন। আদালতেও ১৪৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন মিলন।

তিনি জানান, শুক্রবার সকালে ঢাকার ভাটারা থানাধীন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এম ব্লকে একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে সজীব বিল্ডার্সের মালিক আবুল খায়েরের (৫২) রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় আবুল খায়েরের মেয়ে খাদিজা আক্তার স্বর্ণা বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঘটনার ১৫ ঘণ্টার মধ্যে শনিবার রাতে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় একই এলাকা থেকে মূল অভিযুক্ত মিলনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। 

জিজ্ঞাসাবাদে আসামি মিলন হত্যার দায় স্বীকার করেন এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী জানান, গত ৬ আগস্ট বিকেল তিনটায় একটি ফোন পেয়ে বসুন্ধরা এলাকার বাসা থেকে বের হন আবুল খায়ের। অন্য দিন সন্ধ্যার মধ্যে বাসায় ফিরলেও সেদিন ফেরেননি। তার ফোনও বন্ধ ছিল। পরে তার স্ত্রী রূপালী বেগম কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে এলাকায় স্বামীকে খুঁজতে শুরু করেন। একপর্যায়ে বাসা থেকে বেশ কিছুটা দূরে এম ব্লকে সজীব বিল্ডার্সের তত্ত্বাবধানে নির্মাণাধীন একটি ভবনের সামনের রাস্তায় তার স্বামীর মোটরসাইকেল দেখতে পান। ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে স্বামীর রক্তাক্ত লাশ দেখতে পান তিনি। খবর পেয়ে পুলিশ সেখান থেকে আবুল খায়েরের লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠায়। 

হত্যার মোটিভ সম্পর্কে সুদীপ কুমার চক্রবর্তী জানান, মিলন একাই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছেন। তবে তিনি পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ডটি ঘটাননি। হিট অব দ্যা মোমেন্টে (মেজাজ হারিয়ে) তিনি প্রথমে লোহার রড দিয়ে ও পরে নির্মাণ কাজে ব্যবহার করা কাঠ দিয়ে খায়েরের মাথায় আঘাত করলে তার মৃত্যু হয়। অভিযুক্ত মিলন ও আবুল খায়ের দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে একসঙ্গে কাজ করতেন। প্রথমে দুইজনই ছিলেন নির্মাণ শ্রমিক। পরে তারা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তিল তিল করে গড়ে ওঠা এ প্রতিষ্ঠানের এমডি হন আবুল খায়ের। তার ভাগ্য ফিরলেও ফেরেনি মিলনের। তিনি এখনও নির্মাণ শ্রমিকই রয়ে গেছেন। মিলন মূলত দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরিতে সজীব বিল্ডার্সেই রড বাইন্ডার হিসেবে কাজ করতেন। তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল। নির্মাণ ব্যবসা করেই তারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করতেন। সম্প্রতি যে প্রজেক্টে কাজ চলছিল, সেখানে ভিকটিম আবুল খায়ের ছিলেন মূল ঠিকাদার এবং সেখানে অভিযুক্ত মিলন ছিলেন প্রধান শ্রমিক। তিনি জানান, মিলন দাবি করেছেন, তিনি তার প্রাপ্য মজুরি হিসেবে প্রায় আট লাখ টাকা আবুল খায়েরের কাছে পেতেন। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে যে মুনাফা আসত, তার কোন ভাগই মিলনকে দিতেন না ভগ্নিপতি আবুল খায়ের। একই প্রজেক্টে দুইজন কাজ করলেও ভগ্নিপতি মুনাফা পাচ্ছেন, কিন্তু তিনি পাচ্ছেন না। তাছাড়া শ্রমিক হিসেবেই মিলনকে ট্রিট করতেন আবুল খায়ের। ডাকতে হতো বস বলে। এসব মানতে পারেননি মিলন। 

সুদীপ কুমার জানান, মিলন আদালতে ১৬৪ ধারায় হত্যার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেন, মিলন প্রায়ই বোনের বাসায় যেতেন। বোন এবং বোনজামাই আবুল খায়েরের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। সেটি ভেবেই তিনি ঘটনার দিন আবুল খায়েরকে ওই নির্মাণাধীন ভবনে কথা বলতে ডেকেছিলেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তাদের মধ্যে তুমুল বাগবিতণ্ডা হলে ক্ষেপে গিয়ে ওই ভবনে থাকা লোহার রড ও কাঠ দিয়ে আবুল খায়েরের মাথায় আঘাত করেন তিনি। এতেই তার মৃত্যু হয়।

সুদীপ কুমার জানান, আমরা পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হয়েছি যে আবুল খায়েরের স্ত্রীর বড় ভাই মিলন একাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। হত্যাকাণ্ডের পর তার চাঁদপুর চলে যাওয়া এবং চাঁদপুর থেকে ঢাকা আসা নিয়ে পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরিতে সন্দেহ হয়। গ্রেফতারের পর সব দায় স্বীকার করেন তিনি। 

এরই মধ্যে তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় হত্যায় জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আমরা খুব দ্রুতই এ মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করব।


বিভাগ : অপরাধ


এই বিভাগের আরও