ভারতের অপ্রত্যাশিত বীর আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ

যোগফল ডেস্ক

01 Sep, 2020 06:22pm


ভারতের অপ্রত্যাশিত বীর আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ
ছবি : সংগৃহীত

গত সপ্তাহে রিচার্ড অ্যাটেনবোরোর অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র গান্ধী’র একটি ক্লিপ ভারতজুড়ে হোয়াটসএপে ছড়িয়ে পড়ে। ক্লিপটিতে দেখা যায়, ভারতের স্বাধীনতার জনক মহাত্মা গান্ধী (বেন কিংস্লে অভিনীত) বৃটিশ এক বিচারকের বিরুদ্ধে উঠে দাড়িয়েছেন। প্রত্যেক শুনানিতে বেড়ে চলেছে উত্তেজনা। এক পর্যায়ে বিচারকের কথা মেনে, প্রদেশ ছাড়তে বা অর্থ দিয়ে জামিন পেতে সম্মত না হলে, বিচারক তাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি জেলে যেতে চান? উত্তরে গান্ধী বলেন, আপনার যা ইচ্ছা।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় কিছুটা একইরকমের দৃশ্য দেখা গেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও। আদালতের বিচারকদের সমালোচনা করেছিলেন আইনজীবী ও অধিকারকর্মী প্রশান্ত ভূষণ। সে সমালোচনার জন্য তাকে ক্ষমা চাইতে বলে যাচ্ছেন আদালতের তিন বিচারকের বেঞ্চ। ভূষণও বারবার তাদের প্রত্যাখ্যান করে যাচ্ছেন। এই দ্বন্দ্ব সাড়া ফেলেছে পুরো দেশজুড়ে।

ভূষণ বলেন, ‘সরল বিশ্বাসে’ বিচারকদের সমালোচনা করেছেন তিনি।

এর জন্য ক্ষমা চাওয়া ‘কপটাচারী’ ও ‘বিবেকের সঙ্গে অবজ্ঞা করা’ হবে। কারাদণ্ডের হুমকি মুখে তিনি গান্ধীকে উদ্ধৃত করে বলেন, আমি কৃপা চাই না। আমি মহানুভবতার আপিল করছি না। আদালত আমায় যে সাজাই দেবেন আমি প্রফুল্লভাবে তা মেনে নেবো।

১৪ আগস্ট ভূষণকে আদালতের অবমাননার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে সুপ্রিম কোর্ট। বিচারকদের সমালোচনা করে দুইটি টুইট করায় সোমবার তাকে এক রূপি প্রতীকি জরিমানা পরিশোধের নির্দেশ দেন আদালত। তিন বিচারকের বেঞ্চ রায় দেন, ওই প্রতীকি জরিমানা পরিশোধ না করলে তিন মাস জেলে কাটাতে হবে ভূষণকে। একইসঙ্গে আগামী তিন বছর আইনজীবী হিসেবেও কাজ করতে পারবেন না তিনি।

ভূষণ জানিয়েছেন, তিনি জরিমানা পরিশোধ করবেন। এই নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করার অধিকার চর্চা করে নির্দেশটি পর্যালোচনার আহ্বান জানাবেন না। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আমি এরমধ্যে বলেছি যে, আদালত আমার ওপর আইনিভাবে প্রয়োগয্যো যে সাজাই দেবেন, আমি তা মেনে নেবো। আমি নিজেকে এই নির্দেশের কাছে সপে দিচ্ছে ও সম্মানের সঙ্গে জরিমানা পরিশোধ করার কথা জানাচ্ছি।

ভূষণের সমালোচকরা বলছেন, জরিমানা দিতে সম্মত হওয়ার মানে হচ্ছে, তিনি নিজের দোষ স্বীকার নিয়েছেন। কিন্তু বাকস্বাধীনতা ও বিচারিক নিরপেক্ষতা নিয়ে তার প্রফুল্ল লড়াই ভারতজুড়ে তাকে সমর্থন এনে দিয়েছে। তিনি পেয়েছেন ‘গণতন্ত্রের রক্ষক’ ও ‘আমাদের সময়ের প্রজন্মের বীর’সহ নানা খেতাব। তার তুলনা হয়েছে গান্ধীর সঙ্গে।

বিচার বিভাগের সঙ্গে ভূষণের দ্বন্দ্ব শুরু হয় গত জুনে। টুইটারে ১৬ লাখ অনুসারীর উদ্দেশ্যে বিচারকদের সমালোচনা করেছিলেন তিনি। তৎকালীন সময়ে প্রধান বিচারপতি শরদ বোবদের একটি ছবি ভাইরাল হয়েছিল। তাতে তাকে হার্লে ড্যাভিডসনের একটি মোটরসাইকেলে বসে থাকতে দেখা যায়। এই ছবির সমালোচনা করেছিলেন ভূষণ। অপর এক টুইটে গত ছয় বছর ধরে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনকারী চার বিচারকের নানা কর্মকা-ের সমালোচনা করেন তিনি।

ভারতের সাবেক এক আইনমন্ত্রীর ছেলে ভূষণ। ভারতের সবচেয়ে সম্মানিত আইনজীবীদের একজন হিসেবে তার পরিচিতি রয়েছে। একজন স্পষ্টভাষী মানবাধিকারকর্মী হিসেবেও কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। পুরো জীবন জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলা লড়েছেন। গত ৩৫ বছর ধরে, সরকারের দুর্নীতি, পরিবেশ, আদালতে স্বচ্ছতাসহ অসংখ্য মানবাধিকার ইসু নিয়ে শত শত মামলা লড়েছেন তিনি। এক প্রতিবেদন অনুসারে, ৮০ শতাংশ সময়ই তিনি ‘প্রো-বোনো’ (স্বেচ্ছাকৃত ও বিনা মজুরিতে করা) কাজ। গরীব ও বাস্তুচ্যুতদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি।

বিচার বিভাগের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বে তার পক্ষে লড়েছেন দেশের সেরা আইনজীবীরা। তাকে দোষী সাব্যস্ত করার রায় ঘিরে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। প্রায় ৩ হাজার অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, আইনজীবী ও বিশিষ্ট নাগরিকরা এক সই করা বিবৃতিতে বলেছেন, ভূষণকে দোষী সাব্যস্ত করলে তা আদালতের কর্মকা- নিয়ে মানুষের সমালোচনাকারী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের ওপর শীতল প্রভাব ফেলবে।

হাজার হাজার মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভূষণের পক্ষে সমর্থন জানান। শত শত মানুষ নেমে আসেন রাস্তায়। প্রায় ১০ দিন আগে এক শুনানিতে, দিল্লিতে সুপ্রিম কোর্টের সামনে মেঘলা আকাশের নিচে হাজির হয় কয়েক ডজন মানুষ। প্লেকার্ড হাতে নিয়ে তারা ভূষণের পক্ষে বিক্ষোভ করেন। তাকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তার পাশে থাকার নিশ্চয়তা দেন।

প্রায় এক হাজার মাইল দূরের হায়দ্রাবাদে আইনজীবীরা হাইকোর্টের বাইরে প্লেকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে নীরব প্রতিবাদ জানান। এছাড়া, বেঙ্গালুরু, রানচি, জয়পুরসহ দেশের কোনায় কোনায় আইনজীবী, শিক্ষার্থী, অধিকারকর্মী ও সাধারণ জনতা ভূষণের সমর্থনে এগিয়ে আসে।

সোমবার তাকে জরিমানা পরিশোধের রায়কে ভূষণের সমর্থকরা ‘নৈতিক বিজয়’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, এক রূপি জরিমানা প্রতীকী দেওয়ার রায় বিচার বিভাগের মুখ বাঁচানোর জন্য দেওয়া হয়েছে। লড়াই এখানেই থামিয়ে দেওয়ার জন্য এ রায় দেওয়া হয়েছে বলে জানান তারা।

রায়ের শেষে ভূষণ এক রূপির পয়সা হাতে নিজের একটি ছবি টুইট করেন। বলেন, পয়সাটি তার আইনজীবী দান করেছেন। এজন্য তিনি কৃতজ্ঞ।


বিভাগ : ভিনদেশ