তেলিপাড়ায় মসজিদ ফান্ডের টাকা নিয়ে ‘নয়ছয়’ যুবলীগনেতা রনি সরকারের

যোগফল রিপোর্ট

09 Sep, 2020 07:08am


তেলিপাড়ায় মসজিদ ফান্ডের টাকা নিয়ে ‘নয়ছয়’ যুবলীগনেতা রনি সরকারের
ছবি : সংগৃহীত

মসজিদের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকার পরও প্রায় ৭ লাখ টাকা নিজেদের কাছে রেখেছে গাজীপুর মহানগরের স্বঘোষিত যুবলীগ নেতা মসজিদটির কোষাধ্যক্ষ রনি সরকার ও তার ভাগ্নে অপু সরকার। সেইসাথে মসজিদের টাকা দিয়ে নিজের সন্তানের বিয়ের কাজ সেরেছেন সভাপতি শাহাজ উদ্দিন সরকার। মন্ত্রীর দেওয়া অনুদান ৫০ হাজার টাকাও ব্যাংকে রাখেননি তিনি। 

গাজীপুর নগরের তেলিপাড়া এলাকায় ২০১১ সালের আগস্ট মাসে স্থাপিত স্বরুপ উদ্দিন সরকার জামে মসজিদের সভাপতি ওই এলাকার মৃত আফাজউদ্দিনের সন্তান শাহাজউদ্দিন সরকার, মোতয়াল্লি মৃত রাইজউদ্দিন সরকারের সন্তান শাজাহান সরকার ও কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন স্বঘোষিত যুবলীগ নেতা রনি সরকার। 

রনি সরকার নিজেকে যুবলীগের নেতা দাবি করলেও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মহানগর যুবলীগে তার কোনও পদবি নেই। কিন্তু তার কিছু বিলবোর্ড সাটানো রয়েছে এলাকায়। এতে অনেক যুবলীগ নেতার ছবি রয়েছে। রনি সরকার যুবলীগের পদে না থাকলেও কোন নেতা এসবের প্রতিবাদ করেনি।

মসজিদটির দাতা সদস্য সাইদুল সরকার জানিয়েছেন, ২০১১ সাল থেকেই ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পালন করছেন রনি সরকার। মসজিদের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকলেও বর্তমানে অ্যাকাউন্টে মাত্র কয়েক হাজার টাকা রয়েছে। তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলছে টাকা হাতে আছে। সে টাকা অ্যাকাউন্টে না রেখে অন্যায় করেছে।

আর একজন দাতা সদস্য মৃত রাইজউদ্দিন সরকারের সন্তান লেহাজউদ্দিন সরকার জানিয়েছেন, মসজিদের দায়িত্বশীল তিনজনের স্বাক্ষরে মসজিদের নামে অ্যাকাউন্ট করা হয়েছে। অ্যাকাউন্ট করার পর থেকে শুক্রবারের টাকা শনিবারে হিসেব করে প্রতি রোববার ব্যাংকে রাখার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। মসজিদের টাকা দিয়ে সন্তানের বিয়ের কাজ, ব্যক্তিগত কাজ ও ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে রাখা উচিত নয়। 

করোনাকালীন সময়ের আগে সভাপতি শাহাজউদ্দিন ১৫ দিনের কথা বলে দেড় লাখ টাকা মসজিদের অ্যাকাউন্ট থেকে তুলে নিয়ে তার সন্তান সাজ্জাদ সরকারের বিয়ে দেয়। এখন পর্যন্ত মসজিদের ওই টাকা পরিশোধ করেননি তিনি।

দাতা সদস্য সাইদুল সরকারের সন্তান সবুজ সরকার জানিয়েছেন, মসজিদের শুরু থেকেই রনি সরকারকে সমাজের ব্যক্তিরা মিলে ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব দিয়েছিল। সে দায়িত্ব পালন করতে না পারলে সবাইকে জানিয়ে অব্যাহতি নিতে পারতো। সেটা না করে তার ভাগ্নে অপুকে দিয়ে কাজ করিয়েছে কেন? এখন তার দায় অপুকে চাপিয়ে দিচ্ছে কেন? করোনার আগে মসজিদের টাকার হিসেব জানতে জানতে চাইলে রনি সরকার আমাদের হিসেব না দিয়ে বলেছিল, সকল টাকা ব্যাংকে রাখা আছে। পরে ব্যাংক থেকে হিসেবের কাগজ তুলে দেখি মাত্র ১৪ হাজার টাকা রয়েছে! বাকি টাকা গেলো কোথায় ? জানতে চাইলে সে বলে, 'টাকা হাতে আছে! সে একটা মিথ্যেবাদী। শুধু তাই নয়, সভাপতি শাহাজউদ্দিন, রনি ও আব্দুল আলী  মসজিদের টাকা দিয়ে জমি সংক্রান্ত (ব্যক্তিগত কাজে) খরচ করেছে। বাকি টাকা নিজের সংরক্ষণে রেখে ইচ্ছেমতো খরচ করছে। মসজিদের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকাকালে এসব কাজ অন্যায়। এসব অন্যায়ের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই রনি সরকারসহ অন্য দায়িত্বশীলদের।

কোষাধ্যক্ষ রনি সরকারের কাছে এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই মসজিদের কোনও কমিটি নেই। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্বাক্ষর থাকার প্রশ্নে তিনি বলেন, আমাকে ২০১১ সালে মৌখিকভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে আমার ভাগ্নে অপুকে বুঝিয়ে দেই। বিস্তারিত হিসেব জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার খাতা বের করে রনি ও অপু বলেন, (৫ আগস্ট ২০১১) সাল থেকে (৩ এপ্রিল ২০২০) পর্যন্ত মোট শুক্রবারের দান ১৩ লাখ পাঁচ হাজার ৫০২ টাকা, মোট অনুদান পাঁচ লাখ ৪৭ হাজার ৯০ টাকা। এই দুই খাতে মসজিদের আয় ১৮ লাখ ৫২ হাজার ৫৯২ টাকা। বিভিন্ন খাতে মোট ব্যয় ১১ লাখ ৬১ হাজার ৮৯১ টাকা। আয় থেকে ব্যয় বাদ দিলে মোট ক্যাশ থাকে ছয় লাখ ৯০ হাজার ৭০১ টাকা।

মসজিদটির খসড়া আয় ব্যয়ের হিসেব রনি সরকার দেখাতে পারলেও ওই টাকা ব্যাংকে কেন রাখা হয়নি এমন প্রশ্নের কোনও উত্তর দিতে পারেননি। তিনি নিজের দায় এড়িয়ে বলেন, মসজিদের কমিটি নেই। ব্যাংকে কিছু টাকা ছিল। পরে সভাপতি ও মোতয়াল্লির স্বাক্ষরে দেড় লাখ টাকা তিনি তুলে নেন। ওই টাকা মসজিদের কোনও কাজে লাগেনি। কোন খাতে ওই টাকা ব্যয় করা হয়েছে সেটাও জানিনা। এর আগেও ৩০ হাজার টাকা নিয়েছিল সে, ওই টাকারও কোনও হিসেব নেই। তিনি আরও বলেন, নিউজ হওয়ার পর থেকে মসজিদের দানের টাকা অনেক কমে গেছে। মসজিদের প্রসঙ্গে নিউজ না করাই ভালো।

স্মরণীয় আনন্দ টিভিতে এই ব্যাপারে একটি সংবাদ প্রকাশের জেরে রনি সরকার টিভি কর্তৃপক্ষ ও প্রতিনিধি বরাবরে মানহানির অজুহাতে লিগ্যাল নোটিশ দেন।

এসব ব্যাপারে মোতয়াল্লি শাজাহান সরকার (৮ সেপ্টেম্বর ২০২০) দুপুরে মোবাইল ফোনে জানিয়েছেন, ব্যাংকের চেকবই রনি সরকারের কাছে। সে চেক দিয়েছে সভাপতি শাহাজউদ্দিনকে। সে আমার থেকে এক লাখ ৭০ হাজার টাকার চেকে স্বাক্ষর নিয়েছে। তখন বলছিল ১৫ দিন পর মসজিদের টাকা ব্যাংকে জমা দিয়ে দিবে। পরে জানতে পারলাম ব্যাংকে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় দেড় লাখ টাকা তুলেছে সভাপতি। এরপরই আমার সন্দেহ শুরু হয়। তখন সবুজ সরকারকে নিয়ে ব্যাংক থেকে (৩ মে ২০২০) তারিখ সকালে হিসেবের কাগজ তুলে দেখি মাত্র ১৪ হাজার ১২৫ টাকা আছে। ব্যাংকে একটানা সাত বছর (২০১১-২০১৮ পর্যন্ত)  কোনও টাকা রাখা হয়নি। ২০১৮ সালের মার্চ মাসের ৭ তারিখের পর থেকে কিছু কিছু টাকা রেখেছে রনি সরকার। নয়ছয় করে মসজিদের টাকা নিজের টাকার মতো ব্যবহার করছে।

বাকি টাকা কোথায় জানতে চাইলে রনি সরকারের পরিবারের সবাই ক্ষুব্ধ হয়ে মারতে আসে। সে মানুষের কাছে বলে বেড়ায় তার কাছে ক্যাশ টাকা রয়েছে।  সে রাজনীতি করে তাই ভাগ্নে অপুকে দিয়ে কাজ করায়। তাদের বলছিলাম টাকা ব্যাংকে রেখে আসতে সেটাও তারা করেনি।

এছাড়াও তার ভাই ১৫ দিনের কথা বলে যে দেড় লাখ টাকা নিয়েছে তিন মাস পেড়িয়ে গেলেও তা এখনও ফেরত দেয়নি। মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল ইদের আগে ৫০ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছিল, ওই টাকাও সভাপতি শাহাজউদ্দিন নিয়ে ব্যাংকে জমা দেয়নি। এসব অন্যায় কাজ। তাদের থেকে টাকার ঝামেলা শেষ হচ্ছেনা বলে নতুন কমিটিও দেওয়া যাচ্ছে না। এসবের সমাধান হওয়া উচিত। 

ওই মসজিদের সভাপতি শাহাজউদ্দিন সরকার মহানগর বিএনপির ১৮ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি। তিনি মসজিদের টাকা কিভাবে নিজের সন্তানের বিয়ে ও ব্যক্তিগত কাজে লাগিয়েছেন? জানতে চাইলে তিনি প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান এবং ফোনের লাইন কেটে দেন।


বিভাগ : হ-য-ব-র-ল


এই বিভাগের আরও