নাইমুল ইসলাম খানের চোখে দৈনিক ‘প্রথম আলো’

নাইমুল ইসলাম খান

23 Sep, 2020 06:21pm


নাইমুল ইসলাম খানের চোখে দৈনিক ‘প্রথম আলো’
ছবি : সংগৃহীত

দৈনিক প্রথম আলো যে দৈনিক আজকের কাগজ থেকে যাত্রা শুরু করে, ভোরের কাগজ হয়ে, একই ধারাবাহিকতায় সূচনা ও পরিচালিত, এই বিষয়ে এক ধরনের সাধারণ ঐক্যমত রয়েছে।

দৈনিক আজকের কাগজ, সাংস্কৃতিক সংগঠন স্বরশ্রুতি এবং বিশেষ করে সাপ্তাহিক খবরের কাগজ থেকে অনুপ্রেরণা, সাহস এবং চিন্তা ও ভাবনা নিয়ে এর উদ্ভব। দৈনিক আজকের কাগজের পরিকল্পনা ও উদ্যোগ যে সাপ্তাহিক খবরের কাগজ থেকে এই কথাটা সর্বসাধারণের মধ্যে অতোটা জানা নেই।

কেবল যদি দৈনিক দিয়েই সূত্রপাত ও বিকাশ বিবেচনা করা হয় সেক্ষেত্রে দৈনিক আজকের কাগজের যাত্রা শুরু হয়ে, ভোরের কাগজে অনেকখানি বিকশিত হবার পর পরিণত ও পূর্ণ বিকশিত অধ্যায়টা হচ্ছে দৈনিক প্রথম আলো।

দৈনিক আজকের কাগজে কর্মরত প্রায় শতভাগ কর্মী ২৯ জানুয়ারি ১৯৯২ সালে বিদ্রোহ করে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ এর মধ্যেই, মাত্র ১৫ দিনের প্রস্তুতিতে দৈনিক ভোরের কাগজের জন্ম দেন। এক্ষেত্রে দৈনিক আজকের কাগজ যেন নাম পরিবর্তন করে হয়ে যায় দৈনিক ভোরের কাগজ। কেবল নাম পরিবর্তন মাত্র বিবেচনা করে মোটামুটি একই ধ্যান ধারণায় দৈনিক ভোরের কাগজ প্রকাশ চলতে থাকে। তবে উল্লেখ করে রাখা ভালো, ভোরের কাগজ নিজেও অবশ্যই সময়ের সাথে বিকশিত হয়েছে।

দৈনিক ভোরের কাগজ থেকে মতিউর রহমানের উদ্যোগে ভোরের কাগজের প্রায় সকল নেতৃস্থানীয় ও মেধাবীদের সঙ্গে নিয়ে ৪ নভেম্বর ১৯৯৮ সালে দৈনিক প্রথম আলো প্রকাশ করা হয়। হিসাব, বিজ্ঞাপন, সার্কুলেশন ও সম্পাদকীয় এর প্রায় সকল নেতৃস্থানীয় কর্মী কেবল ভোরের কাগজ থেকে গিয়েছিলেন তা নয়, এদের অনেকে দৈনিক সংবাদপত্রে কর্মজীবন শুরু করে দৈনিক আজকের কাগজ থেকেই ধারাবাহিক ছিলেন।

ভোরের কাগজের তৎকালীন ‘মালিক’ সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে বিরোধের কারণে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়ে ভোরের কাগজ ত্যাগ এবং প্রথম আলো প্রতিষ্ঠা করা হয়।

প্রথম আলোতে আমরা যেটা পাই সেটা হচ্ছে আজকের কাগজ ও ভোরের কাগজের পরিকল্পনার ধাপে ধাপে পরিণতি এবং প্রসার।

দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার মধ্যে যা কিছু সত্যিই ভালো এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তার সবই দৈনিক আজকের কাগজের জন্য তৈরি লিখিত পরিকল্পনার ধাপে ধাপে সময়োচিত উন্নয়ন, বিকাশ, বিশুদ্ধকরণ।

প্রথম আলো যেমন মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে ইভেন্ট করে, দেশের উন্নয়ন অর্থনীতি, রাজনীতি নিয়ে গোলটেবিল সেমিনার করে, সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে বিভিন্ন রুচির ম্যাগাজিন করে, এর সবই আমরা যুব সংগঠন সময়, পত্রিকা সচিত্র সময়, সাংস্কৃতিক সংগঠন স্বরশ্রুতি, সাপ্তাহিক খবরের কাগজ এবং আজকের কাগজ থেকেই চিন্তা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শুরু করি।

প্রথম আলো যে, লেখক বুদ্ধিজীবী, সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের বলয় নিয়ে চলে তারও সৃষ্টি সময়, সচিত্র সময়, সময় শিল্পীগোষ্ঠী, স্বরশ্রুতি, সাপ্তাহিক খবরের কাগজ, তারকা কাগজ, আজকের কাগজ এর মাধ্যমে। আজকের কাগজ পর্যন্ত সময়ে এই বলয়ের বিকাশ হয়ে গেছে ভরা যৌবন পর্যন্ত। এখানেও উল্লেখ করা ভালো এই বিকাশও বিগত কয়েক দশকে ধাপে ধাপে  আরও অনেক সুবিস্তৃত ও সুসংগঠিত হয়েছে।

খবরের কাগজে ১৯৮৮ থেকে বর্তমানের ২০২০ সাল পর্যন্ত বিগত তিন দশকের বেশি সময়ে আমরা যেমন কয়েকটি নতুন প্রজন্মকে পেয়েছি তেমনি দুই-একটি প্রজন্মকে আমরা হারিয়েছিও বটে। কিন্তু পরম্পরাটা হারিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সাপ্তাহিক খবরের কাগজ এবং দৈনিক আজকের কাগজে আমরা প্রায় অভিজ্ঞতামুক্ত সৃজনশীল কর্মী এবং লেখক গোষ্ঠী সংগঠিত করার বিশাল ঝুঁকি নিয়ে সৃজন করতে হয়েছে। দৈনিক প্রথম আলো এতো ব্যাপক নতুন চিন্তা শক্তি ও অভিজ্ঞতামুক্ত লেখক কর্মী নেওয়ার ঝুঁকি নেয়নি। নিতে চায়নি। নিতে হয়নি। তারা ধারাবাহিকতায় ও বিকাশে সাফল্যের প্রমাণ ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের উপরই নির্ভরশীল থাকতে চেয়েছে।  

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, বাঙালি সংস্কৃতি, বাম রাজনীতি (মিশ্রদলীয়), মধ্যপন্থী, উদারপন্থী রাজনীতি, তিন জোটের রূপরেখা, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন, টিএসসি, শাহবাগ ও রেখায়নের আড্ডা, বিচিন্তা, দেশবন্ধু, পূর্বাভাষ, সাপ্তাহিক খবরের কাগজ, সময়, সময় শিল্পী গোষ্ঠী, সচিত্র সময়, ডেলটা বাংলাদেশ, লিওক্লাব, স্কাউটং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষা ও শিক্ষক, তারকা কাগজ ইত্যাদির ধ্যান ধারণা ও অভিজ্ঞতা বিপুল ভাবে দৈনিক আজকের কাগজ সূচনা ও পরিচর্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং এদের জন্য প্ল্যাটফর্ম হয়েছে।

আজকের কাগজের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা কেবলই বিকাশ ও বিস্তৃতি লাভ করেছে দৈনিক ভোরের কাগজে এবং সেটাই শেষ পর্যন্ত ব্যাপক বিস্তৃতি, পরিণতি ও পরম্পরা লাভ করেছে দৈনিক প্রথম আলো পর্যন্ত।

মোট কথা দৈনিক আজকের কাগজ ও দৈনিক ভোরের কাগজ এর সঙ্গে ভিন্ন এমন কোনো মৌলিক পৃথক গুণ প্রথম আলোতে স্পষ্টত নেই। তবে মতিউর রহমানের প্রচেষ্টায় প্রথম আলোর কিছু আচরণের প্রকাশ দেখা যাচ্ছে, যেটা জেনেটিক্যালি আজকের কাগজ ও ভোরের কাগজ থেকে ধারাবাহিকতায় লব্ধ নয়। মতিউর রহমানের প্রভাবে সময়ান্তরে চর্চা (একোয়ার্ড সিনড্রোম)। যেমন:

এক] মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে পক্ষপাত পরিহার ও নিরপেক্ষতা গ্রহণ।

দুই] বহুমতের প্ল্যাটফর্মে সাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতা বিরোধী মতের জায়গা দেওয়া।

তিন] সাংবাদিকতায় সিলেক্টিভ তীব্র পক্ষ ও বিপক্ষপাত এবং পৃষ্ঠপোষকতা।

চার] সহকর্মীর কৃত ভুল, ভ্রান্তি, বিপদে অবিচল পাশে থাকা বা নিজে দায়িত্ব গ্রহণে অনেক ক্ষেত্রে সম্পাদকের অনীহা।

আমার আলোচনা প্রস্তাবনার উদ্দেশ্য বিশেষ করে দৈনিক আজকের কাগজ, দৈনিক ভোরের কাগজ এবং দৈনিক প্রথম আলোর মধ্যে কী সর্ম্পক, বিজ্ঞান ভিত্তিক পর্যালোচনায় সেই বিষয়ে আলোকসম্পাত প্রয়াসের সূচনা করা। সূত্র: নাইমুল ইসলাম খানের ফেসবুক আইডি।


বিভাগ : মুক্তমত