ধর্ষণের সময় ‘উল্লাস’ করেছিল ধর্ষকরা

যোগফল ডেস্ক

27 Sep, 2020 09:46am


ধর্ষণের সময় ‘উল্লাস’ করেছিল ধর্ষকরা
ছবি প্রতীকী

অন্ধকারে গাড়ির ভেতরেই পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয় এক গৃহবধূকে। এ সময় বেঁধে রাখা হয় তার স্বামীকে। নিজেকে রক্ষা করতে ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছিল গৃহবধূ। স্বামীও চিৎকার করছিলেন। এ সময় উল্লাস করছিল ছাত্রলীগ কর্মীরা। চিৎকারের আওয়াজ রোধ করতে তারাও করে চিৎকার। চিৎকার শুনলেও হোস্টেলে থাকা শিক্ষার্থীরা কেউ এগিয়ে আসেনি।

তবে, তারা ফোন করে ঘটনা জানায় শাহপরান থানা পুলিশকে।

পুলিশ আসতে আসতেই গণধর্ষণের শিকার হয় ওই বধূ। রাত নযটার দিকে যখন পুলিশ এমসি কলেজের হোস্টেলে পৌঁছায় ততক্ষণে ধর্ষকরা সটকে পড়ে। হোস্টেলের সামনে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন স্বামী-স্ত্রী। গণধর্ষণের কারণে স্ত্রী শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে স্বামী কাঁদছিলেন। পুলিশকে দেখেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন স্বামী-স্ত্রী দুইজনই। এরপর পুলিশ তাদের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা গণমাধ্যমের কাছে এভাবেই ঘটনার বর্ণনা দেন। 

এমসি কলেজের শতবর্ষী ছাত্রাবাস। কয়েক বছর আগে ওই ছাত্রাবাস আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর সরকারের তরফ থেকে উপহারস্বরূপ দেওয়া হয়েছিল নতুন এই ছাত্রাবাস। এটির অবস্থান ছাত্রাবাসের একেবারে পেছনে। নির্জন টিলাময় ভূমি। টিলার পাদদেশেই নির্মাণ করা হয়েছে চার তলা ভবন। সন্ধ্যা নামলেই নির্জন হয়ে পড়ে ওই হোস্টেল এলাকা। আলো নেই আশেপাশেও। ফলে অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে এলাকা। আর এই হোস্টেলের সামনেই এমসি কলেজে কলঙ্কময় অধ্যায় রচিত হলো। এমন ঘটনা কখনও এমসি কলেজে ঘটেনি। পাহাড়, টিলার আবরণে বেষ্টিত এমসির ক্যাম্পাস। সেই বৃটিশ আমলের কলেজ। অনেক স্মৃতি এই কলেজের। এ কারণে বিকাল হলেই ক্যাম্পাসে ঘুরতে যান অনেকেই। এর মধ্যে বেশিরভাগই যান প্রাক্তন শিক্ষার্থী। ক্যাম্পাসে ঘুরে স্মৃতি রোমন্থন করেন তারা। ওই স্বামী-স্ত্রীও ক্যাম্পাস দেখতে গিয়েছিল। ফেরার পথে ধর্ষণের শিকার হন গৃহবধূ। মার্চ থেকেই বন্ধ এমসি কলেজ। সব হোস্টেলই বন্ধ। এরপরও সরব ছিল এমসির ছাত্রাবাস। এই সরবের পেছনের কারণও ভিন্ন। ছাত্রাবাস বন্ধ করা হলেও ছাত্রলীগ হোস্টেল ছাড়েনি। ছাত্রাবাসের নিয়ন্ত্রক ছিল ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর ও রনি। দুই জনই ছাত্রলীগের টিলাগড়ের রঞ্জিত গ্রুপের কর্মী। রঞ্জিত সরকারের বলয়ের হওয়ার কারণে তারা হোস্টেলে ছিল বেপরোয়া। কলেজ কর্তৃপক্ষ হোস্টেল বন্ধ করলেও তারা হোস্টেলের বিভিন্ন রুম দখল করে রেখেছে। বসবাস করতো হোস্টেলে। খাওয়া-দাওয়া সব করতো ওখানেই। তাদের ভয়ে কেউ কোনো কথা বলতো না। ছাত্রাবাসের দারোয়ানরা তাদের ভয়ে থাকতো তটস্থ। ঘটনার পর থেকে তারা আরও ভড়কে গেছে। একজন দারোয়ান জানালেন, ছাত্রাবাসে সাইফুর ও রনির আধিপত্য ছিল একতরফা। তারা সব অপকর্মের কেন্দ্রে পরিণত করেছিল হোস্টেলকে। সন্ধ্যা নামলেই চলে আসতো বহিরাগতরা। তারা সবাই গিয়ে একত্রিত হতো নতুন ভবনের ২০৫ নম্বর কক্ষে। কখনও কখনও তারা হোস্টেলের বাইরের নির্জন জায়গায় অবস্থান নিতো। মধ্যরাত পর্যন্ত চলতো তাদের আড্ডা-মস্তি। এসব সবাই দেখলেও কেউ কোনো কথা বলতো না। কথা বললেই করা হতো মারধর। এ কারণে নিরবে সব সহ্য করে চলছিল সবাই। সাইফুর, রনি ছাড়াও রবিউল, অর্জুন, তারেকুল, মাসুমও ছিল আড্ডার মধ্যমনি। মধ্যরাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে তারা হলের বিভিন্ন কক্ষেই ঘুমিয়ে পড়তো। বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে কয়েকজন শিক্ষার্থী লুকিয়ে হোস্টেলে অবস্থান করছিল। ঘটনার সময় তারাও ছিলেন নতুন বিল্ডিংয়ে। দোতলা ও তিনতলায় অবস্থান করছিল তারা। ওখান থেকে এক মহিলার চিৎকার শুনলেও কেউ বাইরে এসে প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। এছাড়া হোস্টেলের সিড়িতেও তাদের অনুসারী দাঁড়িয়ে ছিল। শনিবার দুপুরে তারা জানান, ঘটনার সময় তারা চিৎকার শুনেছেন। এক মহিলা ও এক পুরুষ সম্ভ্রম রক্ষার জন্য সাহায্য চেয়েছিল। কিন্তু প্রাণভয়ে তারা কেউ বের হননি। ঘটনার পরপর তারাও হোস্টেল ছেড়ে চলে যান। শনিবার দুপুরে এসে তাদের বইপত্র নিয়ে গেছেন। নতুন হোস্টেলটি চারতলা। এই চারতলার মধ্যে তিনতলা পুরোটারই কাজ শেষ। এ কারণে ওখানে ছাত্রদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। হোস্টেলের এক শিক্ষার্থী জানান, নতুন হোস্টেলে দুইতলা ও তিনতলায় ৯৬ জন শিক্ষার্থী বাস করেন। কলেজ বন্ধ হওয়ার পর সবাই বাড়িতে চলে গেছেন। বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কয়েকজন ছিলেন। এর বাইরে ছাত্রলীগের রনি ও সাইফুরের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ সবসময় হোস্টেলে অবস্থান করতো। তারা হোস্টেলকে মাদকের আখড়ায় পরিণত করেছে। এর মধ্যে রনির পুরো নাম শাহ মাহবুবুর রহমান রনি। সে এখন আর এমসি কলেজের শিক্ষার্থী না। মাস্টার্স পাস করেছে গত বছর। এরপরও সে এমসি কলেজের নতুন বিল্ডিংয়ের ২০৫ নম্বর কক্ষটি দখলে রেখেছে। তার কক্ষে বসেই মাদকের আসর বসাতো বহিরাগত ছাত্রলীগ কর্মীরা। করোনাকালে মহিলাদেরও যাতায়াত করতে দেখেছেন অন্য শিক্ষার্থীরা। কিন্তু কেউ কোনো প্রতিবাদ করেননি। রনির কক্ষে শনিবার ভোররাতে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। ওই কক্ষ থেকে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। পুরাতন ছাত্রাবাসের ৪ নম্বর ব্লকে একটি শিক্ষক বাংলো ছিল। ওই বাংলো এখন ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমানের দখলে। সে শিক্ষক বাংলোতে বসবাস করতো। ছাত্রাবাসে সবাই তাকে ভয় পায়। ভয়ঙ্কর সাইফুর নামে চিনেন সবাই। বেপরোয়া জীবনযাপন তার। যখন যা ইচ্ছা তাই করে। শিক্ষক বাংলো দখলে রাখলেও শিক্ষকরা এর প্রতিবাদ করতেন না। সাইফুর ইয়াবাসহ নানা নেশায় আসক্ত বলে হোস্টেলে বাসরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে। সাইফুর অনার্স পাস করেছে এমসি কলেজ থেকেই। শুক্রবার রাতে ধর্ষণের ঘটনাটি তারই নেতৃত্বে ঘটেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। প্রথমে জোর করে ওই বধূকে সাইফুরই ধর্ষণ করে বলে জানা গেছে। শনিবার ভোররাতে সাইফুরের কক্ষ থেকে পুলিশ অবৈধ আগেয়াস্ত্র পেয়েছে। ধর্ষক মাহফুজুর রহমান মাহফুজও এমসি কলেজের শিক্ষার্থী। সে হোস্টেলে থাকতো। রবিউল আগে শিক্ষার্থী ছিল। এখন সে হল দখল করে আছে। অর্জুন ও তারেক বহিরাগত। আসামিদের মধ্যে সাইফুরের বাড়ি বালাগঞ্জে, রবিউলের দিরাই, মাছুমের কানাইঘাট, অর্জুনের জকিগঞ্জ, রনির হবিগঞ্জ এবং তারেকের বাড়ি সুনামগঞ্জে। এমসি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সালেহ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, হোস্টেল থেকে ওদের বার বার তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওরা বারণ মানেনি। সবার অগোচরে এসে আবার হোস্টেলেই বসবাস শুরু করে। তিনি জানান, ‘ধর্ষণের ঘটনার পর আমরা এখন ওই হোস্টেলটিকে সিলগালা করে দেবো। কাউকে সেখানে বাস করতে কিংবা ঢুকতে দেওয়া হবে না।’ 

এই ঘটনার আগে তিনি প্রশাসনকে জানিয়ে কোন ব্যবস্থা নেয়নি।

সিলেট মহানগর পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) জ্যোতির্ময় সরকার জানিয়েছেন, ‘ঘটনার সময় ধর্ষণের শিকার নারী ও তার স্বামী সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিল। হোস্টেল থেকেই পুলিশকে ফোন করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে।’


বিভাগ : অপরাধ


এই বিভাগের আরও