রাজেন্দ্রপুরে ‘হাসপাতাল’ নাম দিয়ে নুরুল ইসলামের ‘অভিনব প্রতারণা’

যোগফল প্রতিবেদক

05 Oct, 2020 07:15pm


রাজেন্দ্রপুরে ‘হাসপাতাল’ নাম দিয়ে নুরুল ইসলামের ‘অভিনব প্রতারণা’
ছবি : সংগৃহীত

গাজীপুর জেলার সদর উপজেলার রাজেন্দ্রপুর এলাকায় বিদেশি নামের মিশেলে হাসপাতাল নাম ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের জানাকুর গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক। তিনি ওই গ্রামের মৃত আব্দুর রহমানের সন্তান।

নুরুল ইসলাম স্থানীয়ভাবে নুরচান নামেও পরিচিত।

‘বাংলাদেশ নরওয়ে ফেন্ডশিপ হসপিটাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ নাম ব্যবহার করে বাহারি সাইনবোর্ড ঝুলানো প্রতিষ্ঠানটি মোটেও ‘হাসপাতাল’ নয়। কিন্তু  হাসপাতাল নামে রোগী আকৃষ্ট করার প্রতারণা চালানো হচ্ছে হরদম।

প্রতি শুক্রবার রনজিৎ পাল ও রোজিনা আমিন নামে দুইজন ডাক্তার রোগী দেখেন সেখানে। কিন্তু বিশাল সাইনবোর্ড লাগিয়ে রাখা হয়েছে ১০-১২ জন ডাক্তারের নাম দিয়ে। 

যোগফল অনুসন্ধান করে গত শনিবার [৩ অক্টোবর ২০২০] জানতে পারে ব্যাপারটি। তাৎক্ষণিক সিভিল সার্জন অফিসকে জানানো হলে সিভিল সার্জন ডাক্তার খায়রুজ্জামান হাসপাতাল নামের প্রতিষ্ঠানটিকে ‘ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ বলে নিশ্চিত করেন।

সোমবার [৫ অক্টোবর ২০২০] সিভিল সার্জন ডাক্তার খায়রুজ্জামান ওই প্রতিষ্ঠানে লাগিয়ে রাখা সাইনবোর্ড নামানোর নির্দেশ দিয়েছেন। সময়মতো ওই সাইনবোর্ড নামানো না হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন যোগফলকে।

আইনি ব্যবস্থা বলতে সিভিল সার্জন ডাক্তার খায়রুজ্জামান জানান প্রয়োজনে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

সোমবার [৫ অক্টোবর ২০২০] সন্ধার পরেও ওই সাইনবোর্ড নামানো হয়নি। সীমা আক্তার নামের একজন নার্স সাইনবোর্ড নামোনোর কোন নির্দেশনা পাননি বলেও জানান। নির্দেশনা পায়নি বলে সাইনবোর্ডও নামাননি।

ওই এলাকার বাসিন্দা ও ভাওয়ালগড় ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার তরিকুল ইসলাম রিপন যোগফলকে জানিয়েছেন, নুরুল ইসলাম একটু বেকায়দা পড়েছে। ফলে তার নিকটজনরাও ঠিকমতো তথ্য দিতে পারছেন না। তবে তিনিও শুনেছেন সিভিল সার্জন অফিস থেকে একটি মৌখিক নির্দেশনা দেওয়ার কথা।

ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নার্স ও রিসিপসনিস্ট নিলুফা আক্তার যোগফলের নিকট শনিবার স্বীকার করেন, এটি ‘হাসপাতাল’ লেখা সাইনবোর্ড হলেও মূলত হাসপাতাল নয়। আরও অন্তত দেড় বছর আগে হাসপাতালের কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলা হয়। লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি। কিন্তু ভাড়া নেওয়া ভবনের কেবিন নম্বর সাঁটানো চেয়ার টেবিল ও বেড রাখা হয়েছে আগের মতোই। ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে পুরাতন অনুমতিপত্রও।

একজন সার্বক্ষণিক ডিউটি ডাক্তার রয়েছে সেখানে। তার নাম জিয়াউর রহমান। তিনি এখনও মেডিক্যাল শিক্ষার্থী হলেও তাকে দিয়েই ব্যবস্থাপত্র করানো হয়। তিনি ৩০০-৪০০ টাকা ভিজিট নেন। যোগফল অনুসন্ধাকালেও দুইজন রোগী অপেক্ষমান ছিল।

নুরুল ইসলাম এলাকাবাসীর মনে এমন ধারণা জন্মিয়েছেন এটি নরওয়ের সহায়তায় গড়ে তোলা একটি দাতব্য হাসপাতাল। নুরুল ইসলাম নরওয়ের পাসপোর্টধারী। সম্প্রতি একজন গার্মেন্টস শ্রমিক নুরুল ইসলামের নামে শ্রীপুর থানায় ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন। ওই মামলা সূত্রে জানা গেছে নুরুল ইসলাম ওই হাসপাতালের মালিক। নিলুফা আক্তার জানিয়েছেন নুরুল ইসলাম একাই ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যান। ট্রেড লাইসেন্সেও নুরুল ইসলামের নাম লেখা রয়েছে প্রোপাইটর হিসাবে। কিন্তু অনুসন্ধানে হাসপাতালের নামেরই কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

যেখানে ‘বাংলাদেশ নরওয়ে ফেন্ডশিপ হসপিটাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ নামে কোন হাসপাতাল নেই সেখানে প্রতারণার আর এক মাত্রা যোগ করা হয়েছে ভিন্ন কায়দায়। একই ভবনে ‘বাংলাদেশ নরওয়ে ফ্রেন্ডশিপ হসপিটাল ফিজিও থেরাপি সেন্টার’ নামের সাইনবোর্ড ঝুলানো হয়েছে। আবার মূল সাইনবোর্ডে ব্র্যাকেট দিয়ে লেখা হয়েছে ‘শুধু ডায়াগনিস্টিক ও কনসালটেশন সেন্টার।’ সাধারণ জনগণ নামের এই ‘মারপ্যাচ’ বুঝতে সক্ষম কিনা এই প্রশ্নের উত্তর নেই কারও নিকট। কিন্তু এভাবেই নামের মারপ্যাচে চলছে হাসপাতাল নামের ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

হাসপাতাল মালিক রোগীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করেছে এমন শিরোনামে প্রকাশ হওয়া বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে। কোথাও কোথাও নুরুল ইসলামই ডাক্তার এমন পরিচয় দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে নুরুল ইসলাম নিজেকে ডক্টর পরিচয় দেন। 

১৯৮৯ সালে নুরুল ইসলাম রাজেন্দ্রপুর হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন। এসএসসির সার্টিফিকেটে তার নাম ‘মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম’ লেখা হলেও পাসপোর্ট ও অন্য ডকুমেন্টে নুরুল ইসলাম ‘শেখ’ লেখা রয়েছে। তিনি ঢাকার সিটি কলেজ থেকে পরে ডিগ্রি পাশ করেছেন বলে তার চাচাতো বোনের সন্তান নিলুফা ইয়াসমিন যোগফলকে জানিয়েছেন। নিলুফা বর্তমানে নুরুল ইসলামের বাড়িতে থাকেন। নুরুল ইসলাম তার ভিজিটিং কার্ডে নিজের নামের সঙ্গে পিএইচডি (ইংল্যান্ড) লিখে রেখেছেন। তার পিএইচডির বিষয় কি জানতে চাইলে নিলুফা ইয়াসমিন মাইক্রো ফিনান্স বলে জানান। এ ব্যাপারে নুরুল ইসলামের স্ত্রী জাকিয়া সুলতানার মোবাইল ফোনে কল ও এসএমএস পাঠনো হলেও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি।

ডায়গনস্টিক সেন্টারের কর্মচারী মোছা. মর্জিনা ধর্ষণের মামলার ব্যাপারে বলেন, এমন খবর তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য বিব্রতকর। এলাকার বাসিন্দা সেলিম মিয়া জানিয়েছেন, রোগী যদি চিকিৎসা করতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়, তা হলে পুরো ব্যাপারটিতে ভাবমূর্তির জটিলতা তৈরি হয়।


মামলার বরাত দিয়ে এসআই এখলাসউদ্দীন যোগফলকে বলেন, জ্বর-সর্দি নিয়ে গত ২০ সেপ্টেম্বর ওই নারী নুরুল ইসলামের কাছে চিকিৎসার জন্য যান। সেদিন সেখানে চিকিৎসকের পরামর্শ মত রক্ত ও প্রসাব পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়ে তিনি বাসায় চলে যান। পরদিন ওই নারীকে জানানো হয় আগের দেওয়া নমুনা নষ্ট হয়ে গেছে তাই আবারও তাকে নমুনা দিতে হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২১ সেপ্টেম্বর দুপুরে ওই হাসপাতালে রক্ত দিতে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে রওনা হন ওই নারী।

পথে তিনি ধলাদিয়া এলাকায় রাজেন্দ্রপুর-কাপাসিয়া সড়কের পাশে নূরুলসহ তার ২-৩ জনকে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। তারা মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন বলে গাড়িতে উঠার প্রস্তাব দেন।

পরে মেয়েটি গাড়িতে উঠলে নুরুল তাকে হাসপাতালে না নিয়ে ধলাদিয়া কলেজের পাশে নুরুল ইসলামের বাংলোতে [এটি মূলত একটি কলাবাগান। এখানে একটি টিনসেড আছে। বাগানে যাওয়ার রাস্তা নেই বনের জমি ছাড়া।] নিয়ে যান। পরে বাংলোর একটি রুমে নিয়ে হত্যার ভয় দেখিয়ে ওই নারীকে ধর্ষণ করেন। এ ঘটনা প্রকাশ করলে হুত্যার হুমকি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।

পল্লী বিদ্যুতের পরিচালনা বোর্ডে নানা কাণ্ড, বনের জমি ঘেঁষে বাড়ি বানানো ও কলাগাছ লাগিয়ে বাগান বাড়ির প্রপাগাণ্ডা, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও কনসালটেন্সির নামে নুরুল ইসলামের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি রয়েছে যোগফল মর্গে। অনুসন্ধান শেষে বিস্তারিত জানানো হবে আগ্রহী পাঠককে।


বিভাগ : তালাশ


এই বিভাগের আরও