আশেপাশে কেউ জানে না, তবু চাঁদাবাজির মামলা জয়দেবপুর থানায়

যোগফল প্রতিবেদক

09 Oct, 2020 08:03am


আশেপাশে কেউ জানে না, তবু চাঁদাবাজির মামলা জয়দেবপুর থানায়
ছবি : সংগৃহীত

দেওয়ানী আদালতে মামলা করে চাঁদাবাজির মামলার আসামি হলেন দেওয়ানি মামলার বাদি। গাজীপুর জেলার প্রথম সিনিয়র সহকারি জজ আদালতে মামলাটি করেছিলেন বাবুল হোসেন। তিনি এখন জয়দেবপুর থানায় দায়ের হওয়া ২৫(৯)২০ মামলার আসামি। বাবুল এখন ফেরারি।

বাবুল জানাকুর গ্রামের মৃত হাসমত আলীর সন্তান। দেওয়ানি মামলা করে বাদি তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিবাদির আক্রোশে বিবাদীর কর্মচারীর দেওয়া মামলার ঘানি টানতে হচ্ছে তাকে। 

মামলার ঘটনাস্থল অভিনব নাম দিয়ে প্রতারণার ফাঁদ ‘বাংলাদেশ নরওয়ে ফেন্ডশিপ হসপিটাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার’। এটি মোটেও হাসপাতাল নয় বলে জানিয়েছেন গাজীপুর জেলার সিভিল সার্জন ডাক্তার খায়রুজ্জামান। তবু বাহারি সাইনবোর্ড ঝুলানো প্রতিষ্ঠানটি বহাল আছে। বৃহস্পতিবার [৮ অক্টোবর ২০২০] ওই প্রতিষ্ঠানকে লিখিত চিঠি দিয়ে সাইনবোর্ড নামানোর বিষয় জানানো হয়েছে জানিয়েছেন ডাক্তার শাহীন। তিনি সদর হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক।

এই প্রতিষ্ঠানের আশেপাশের কেউ ঘটনা শুনেনি। পুলিশ আসার আগে জানে না চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে বলে। মমতাজ মহলে আলোচিত ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টার অবস্থিত।

হারুন অর রশিদ মমতাজ মহলের পূর্ব পাশে লাগোয়া আদেল প্লাজায় ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। মমতাজ মহলের পশ্চিম পাশে লাগোয়া কর্নেল সোহরাবের মার্কেটে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা রক্ষী হিসাবে কাজ করেন জয়নাল। তারা কেউ চাঁদাবাজির ঘটনা শুনেনি। পুলিশ আসার পরে বাদির কথা শুনেছেন। আশেপাশের আরও কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে চাঁদাবাজির ঘটনার তথ্য জানা যায়নি।

একই রকম ব্যাখ্যা নিলুফা আক্তারের। তিনি চাঁদাবাজি মামলার বাদি। নিলুফা নিজেকে ‘বাংলাদেশ নরওয়ে ফেন্ডশিপ হসপিটাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ এর রিসিপসনিস্ট হিসাবে। বাদি নিজেও মামলায় প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন মামলায় সুবিধা করার জন্য। অথচ এটি একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

নিলুফা যোগফলকে বলেন, ঘটনার সময় রাত বেশি থাকায় আশে পাশে কেউ ছিল না। ফলে কেউ ঘটনা দেখেনি। নিলুফার বক্তব্য যোগফল মর্গে রয়েছে। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, কেউ ডাক চিৎকারও শুনেনি। কারণ দরজার গ্লাস লাগানো ছিল। তার কথা সমর্থন জানান এজাহারের সাক্ষি আয়া মর্জিনা ও নার্স সীমা আক্তার। তাদের উভয়ের পরিচয় উল্লখ করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ নরওয়ে ফেন্ডশিপ হসপিটাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ হিসাবে। তারা দুইজনও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন। ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে তারা সকলে ‘হাসপাতাল’ পরিচয় দিয়েছেন। এমনকি ধর্ষণ মামলার বাদিও আসামি নুরুল ইসলামকে হাসপাতাল মালিক বলে পরিচয় দিয়েছেন।

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর থেকে বাদি নিলুফা এজাহারে দেওয়া মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। এই নম্বরটি এখন ব্যবহার করেন সীমা আক্তার। তাদের প্রতিষ্ঠানের একজন মশিউর নামে একজন ম্যানেজার আছে। ওই ম্যানেজার চাঁদাবাজি মামলা দায়েরের পর থেকে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আসে না। সরেজমিনে ও ফোন করেও ম্যানেজারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ওই হাসপাতালে রোগী দেখেন জিয়াউর রহমান, তিনি ডাক্তার নন। মেডিক্যাল শিক্ষার্থী তিনি। চাঁদাবাজির ঘটনার সময়ে তিনি দোতলায় শুয়ে ছিলেন বলে দাবি করেন। ফলে ঘটনা দেখেননি।

কিন্তু জিয়াউর রহমানে বক্তব্যের বিরোধীতা করেন নিলুফা আক্তার। নিলুফা বলেন, জিয়াউর তখন বাথরুমে ছিল!

জিয়াউর নিজেই ভিকটিমদের চিকিৎসা করেছেন। বাদির দাবি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের টাকা ও সেন্টারের মালিক নুরুল ইসলামের বাসা ভাড়ার জমানো আনুমানিক এক লাখ ৬০ হাজার টাকা নিয়ে গেছেন আসামি বাবুল। ঘটনা  সেপ্টেম্বর মাসের ২৫ তারিখের। মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বাসা ভাড়া আদায় হয় বলে জানিয়েছেন নুরুল ইসলামের বাড়ির কেয়ারটেকার জহিরুল। কেয়ারটেকার নিজে, নুরুল ইসলামের স্ত্রী জাকিয়া সুলতানা বাড়ি ভাড়ার টাকা নেন। ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে নুরুল ইসলামের বাড়ি অন্তত দেড় কিলোমিটার দূরে। অথচ বাদি নিলুফার কাছে বাড়ি ভাড়ার জমানো টাকা রাখার কথা বলেছেন।

মামলার এজাহারে বাদি নিলুফা তার কয়েকটি চেয়ার ভেঙে ফেলার কথা উল্লেখ করেন। কয়েকটি প্লাস্টিক গদির বাতিল চেয়ার, বালতি, ঝাড়ুসহ দোতলায় জমিয়ে রাখা হয়েছে। মামলার আইও পরিদর্শক নাজমুল হুদাও জমানো চেয়ার দেখেছেন বলে জানিয়েছেন।

হোতাপাড়া ফাঁড়িতে যোগফল টিমের সঙ্গে কথা বলেন ইনচার্জ নাজমুল হুদা। তিনি মামলার তদন্ত চলমান বলে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন এসপি বা ওসি অনুমতি দিলে কথা বলতে পারবেন তিনি।

তবে তিনি আসামি গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়েছেন বলে দাবি করেন। ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্মীদের ছাড়া কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে কিনা এই তথ্য দিতে রাজি হননি নাজমুল হুদা।

এ ব্যাপারে গাজীপুর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) আমীনুল ইসলাম যোগফলকে বলেন, চাঁদাবাজি মামলা রেকর্ড করার ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। যেন মিথ্যা ঘটনায় কেউ মামলা দায়ের করতে না পারে। জয়দেবপুর থানার ২৫(৯)২০ নম্বর মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। 

যে দেওয়ানি মামলার সূত্র ধরে চাদাবাজির মামলা উৎপত্তি:

গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর আওতায় ভাওয়াল গড়, মির্জাপুর, পিরুজালী ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ২১, ২২ ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের পরিচালক হিসাবে মো. নুরুল ইসলামকে একক প্রার্থী ঘোষণা করার অভিযোগে আদালত তা স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। একই এলাকার অপর পরিচালক প্রার্থী মো. বাবুল হোসেনের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে গাজীপুর জেলার সিনিয়র সহকারী জজ আদালত গত ২৯ জুলাই এ আদেশ প্রদান করেন। 

গাজীপুরের জয়দেবপুর থানাধীন গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২, এর ৬ নম্বর এলাকার পরিচালক পদে আগ্রহী প্রার্থী হিসাবে মো. নুরুল ইসলাম ও মো. বাবুল হোসেন আবেদনপত্র দাখিল করেন। পরে নির্বাচনের দিনে কোন কারণ ছাড়াই বাবুল হোসেনের মনোনয়নপত্র বাতিল করে নুরুল ইসলামকে একক প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা ও তালিকা প্রকাশ করেন। 

ফলে বাবুল হোসেন আপত্তি জানিয়ে রিটার্নিং অফিসার ও নির্বাচন কমিশন প্রধানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগে গাজীপুরের দেওয়ানি আদালতে একটি মামলা (নম্বর ১০৫/২০২০) দায়ের করেন। 

আদালত দীর্ঘ শুনানীর পর সার্বিক পর্যালোচনায় ন্যায় বিচারের স্বার্থে লিখিত আপত্তি দাখিল না করা পর্যন্ত নালিশী বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য বিবাদিদের নিদের্শ দিয়েছেন। 

এ ছাড়া গাজীপুর সদরের জানাকুর গ্রামের আব্দুর রহমানের পুত্র মো. নুরুল ইসলাম নরওয়ের পাসপোর্টধারী। তার বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে বিগত দিনে পরিচালক মনোনীত হয়ে সাধারণ গ্রাহকদের দালালি ও সুবিধা না পেয়ে লাইন স্থাপনে বাঁধাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। পরিচালক হওয়ার পর থেকে সার্বক্ষণিকভাবে অফিসে বিচরণ করেন এবং সাধারণ গ্রাহকের যে কোন কাজ করতে হলে তার শরণাপন্ন হতে হয়। অফিসের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজসে তিনি দালালি করে বিপুল পরিমাণ টাকা-পয়সার মালিক হয়েছেন।

গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী শাহানেওয়াজ যোগফলকে বলেন, নুরুল ইসলাম এখন পল্লী বিদ্যুতের কেউ না। আরও কয়েক মাস আগেই তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। একাধিক জিডি ও বাবুলের দায়ের করা মামলায় নুরুল ইসলাম বিবাদি হয়েছেন স্বেচ্ছায়। নুরুল জিডিতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সভাপতি না থেকেও সভাপতি পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করেছেন।

নুরুল ইসলাম স্বেচ্ছায় বিবাদি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাবুল হোসেন সহকারী জজ আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে গাজীপুর জেলা জজ আদালতে রিভিশন মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নম্বর ১৫/২০২০। এই মামলার ধার্য তারিখ আগামী ১৫ অক্টোবর। এই মামলায়ও নুরুলের পল্লী বিদ্যুতে সম্পৃক্ত না থাকার কাগজপত্র দাখিল করা হয়েছে।

প্রকৌশলী শাহানেওয়াজ যোগফলকে বলেন, এক লাখ ৬০ হাজার টাকার সংখ্যাটি ‘কমন’। চাঁদাবাজির মামলায় যেমন এক লাখ ৬০ হাজার টাকার কথা উল্লেখ করেছেন, একই টাকার কথা উল্লেখ করে নুরুল ইসলাম শাহানেওয়াজের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ করেছিলেন।


নুরুল জামিনে:

নুরুল ইসলাম বর্তমানে একটি ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। শ্রীপুর থানার মামলা নম্বর ৮৯(৯)২০ মূলে তিনি গ্রেপ্তার হন। তার বিরেুদ্ধে আর এক স্ত্রী পারভীন আক্তার বাদি হয়ে গাজীপুর জেলার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিআর মামলা নম্বর ৪৮৮/২০২০ দায়ের করেছেন। এতে বাদি অভিযোগ করেছেন আসামি নুরুল বাদির নিকট যৌতুক দাবি করেছেন। গত ২ সেপ্টেম্বর বাদি আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। 

মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৩ আগস্ট আসামি নুরুল বাদিকে ৬ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে বিয়ে করেন। আসামির নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। জয়দেবপুর থানার এসআই খালেকুজ্জামান ওয়ারেন্ট তামিলের দায়িত্বে রয়েছেন বলে বাদির আইনজীবী সামশাদ জাহান মুক্তা জানিয়েছেন। কিন্তু এই মামলায় এখনও ওয়ারেন্ট তামিল করা হয়নি। 

শ্রীপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনিরুজ্জামান খান বৃহস্পতিবার যোগফলকে জানিয়েছেন, আসামি জামিন পেয়েছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। কারণ বাদিকে পাওয়া যাচ্ছিল না। এদিকে আইও ধর্ষণের আলামত পাননি বলে বাদির বিরুদ্ধে ১৭ ধারায় মিথ্যা মামলা দায়েরের সুপারিশ পাঠিয়েছেন আদালতে। আবার বাদি আদালতে নারাজির আবেদন জানিয়েছেন বলেও জানান মনিরুজ্জামান খান।

এদিকে রাজেন্দ্রপুর বাজারে চেম্বার এমন একজন আইনজীবীর সঙ্গে বাদির যোগাযোগ ছিল। কিন্তু ঘটনার পরপর বাদি নিখোঁজ থাকায় আদালতে তখন হাজির হননি। চূড়ান্ত রিপোর্টের কারণে আসামি জামিন পেয়েছেন বলে জানা গেছে।


বিভাগ : হ-য-ব-র-ল