এইচএসসি পরীক্ষা ছাড়া ফল ঘোষণা হবে, কী ভাবছে সংশ্লিষ্ঠরা

মোক্তাদুল পালোয়ান

09 Oct, 2020 08:39am


এইচএসসি পরীক্ষা ছাড়া ফল ঘোষণা হবে, কী ভাবছে সংশ্লিষ্ঠরা
ছবি : সংগৃহীত

মোক্তাদুল পালোয়ান: এই বছর (২০২০ সাল) এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে না বলে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডাক্তার দীপু মনি।

তিনি বলেন, এই পরীক্ষা সরাসরি না নিযয়ে ভিন্ন পদ্ধতিতে মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ।

জেএসসি এবং এসএসসি'র ফলের ভিত্তিতে তাদের এইচএসসি'র ফল নির্ধারণ করা হবে বলেও সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান।

জেএসসি ও এসএসসির ফলের ওপর ভিত্তি করে উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রস্তুত করাকে অনেক পরীক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও চিকিৎসক একমত ও দ্বিমত পোষণ করেন। 

অনেকেই মনে করছেন জেএসসি ও এসএসসি'র ফলের মাধ্যমে করলে উচ্চ মাধ্যমিকে ভালো ফল করার প্রস্ততি থাকার পরেও আগের জিপিএর কারণে ভালো ফল থেকে বঞ্চিত হবে।

গাজীপুরের বিভিন্ন কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক মধ্যে এই সম্পর্কে একটা ধারণা করে। সেখানে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীদের অভিমত হচ্ছে পরীক্ষা নিলে তাদের মেধার ঠিক মূল্যায়ন হতো বলে অভিমত প্রকাশ করে।

অভিমতগুলোর মধ্যে বাচাই করে কয়েকটি তুলে ধরা হলো:

নাদিয়া ইসলাম মীম, মানবিক বিভাগের গাজীপুর মহিলা কলেজর শিক্ষার্থী। সে  জানায়, বর্তমানে করোনা ভাইরাসের দিক দিয়ে বিবেচনা করে পরিক্ষা না দিয়ার সিদ্ধান্তটা ভালো হয়েছে। কিন্তু আমরা যারা ভালো প্রস্তুতি নিয়েছি আবার আগের জেএসসি ও এসএসসি তে রেজাল্ট খারাপ হয়েছে এর জন্য অনেক দুঃখও হচ্ছে। 

জুবায়ের প্রধান, বিজ্ঞান বিভাগে জৈনাবাজার আব্দুল্লাহ আল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষার্থী। সে বলে আমার প্রস্তুতি অনেক ভালো আছে, আমার জেএসসি ও এসএসসি থেকে অনেক ভালো রেজাল্ট পাবো বলে আশা করি। আমি আজ সকালেও প্রাইভেট পড়ে আসলাম। পরীক্ষা নিলে অনেক ভালো হতো।

সাদিয়া ইসলাম ব্যবসা শিক্ষা বিভাগে গাজীপুর মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী। সে বলে আমাদের দুই বছরের পরিশ্রমের মূল্যায়ন হয় নাই। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি বা বর্তমানে বাংলাদেশের যেই অবস্থা বিশেষ করে আমাদের মেয়েদের নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করলে এবং সেশনজটের ব্যাপারটা চিন্তা করলে ডিশিসনটা ঠিক মানে পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মেধা মূল্যায়নের জন্য ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষা যেন হয়।

রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা পরিক্ষা দিতে আগ্রহী। সরকার যেনো তাদের পরীক্ষা নিয়ে তাদের পরিশ্রমের সঠিক মূল্যায়ন করে, তার জন্য দাবি জানায়। কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে শিক্ষার্থীরা। তারা আরও বলে দেশের সব কিছু স্বাস্থ্য বিধি মেনে হচ্ছে তাহলে আমাদের পরীক্ষা কেনো স্বাস্থ্য বিধি মেনে হতে পারবে না?

রাব্বি ব্যবসা শিক্ষা বিভাগে কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী। সে বলে সাত মাস ধরে আমরা বাড়িতে অবস্থান করতেছি, পরীক্ষার প্রস্তুতি নেই বললেই চলে। সরকার যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভালো করেছে। পরীক্ষা হলে তো আমরা অনেকে পাসই করতে পারতাম না। 

মীম ধলাদিয়া ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী। সে জানায়, পরীক্ষা নিলেই ভালো হতো।

মাহমুদুল হাসান মানবিক বিভাগে গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী। সে জানায়, করোনার জন্য পড়াশোনা আগের মত করতে পারি নাই। তাই পরীক্ষা দিলেও রেজাল্ট ভালো হতো না। সরকার ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

ফাহিমা জেরিন ব্যবসা শিক্ষা শাখা গাজীপুর মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী। সে জানায়, বর্তমানের করোনার এই অবস্থার জন্য আমাদের প্রস্তুতি আগের মত নেই। তাই আর চাইলেও এখন আগের প্রস্তুতি নিতে পারবো না। তাই সরকারের এই সিদ্ধান্তটা ভালো নিয়েছে।

দেলোয়ার হোসেন রিফাত ভাংনাহাটী দারুল উলুম মাদরাসার শিক্ষার্থী। সে জানায়, পরীক্ষা নিলেই ভালো হতো বেশি। এখন চাকরির ক্ষেত্রে বৈষ্যম্যের মধ্যে পড়তে হবে। তবে করোনার কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্তটা যৌক্তিক। এখন আমরা যেনো বৈষ্যম্যের স্বীকারর না হই সেটা সরকার কে লক্ষ্য রাখতে হবে।

এক মাদরাসা শিক্ষার্থী বলে এই ভাবে রেজাল্ট করায় মন্তব্য করে বলে, আমার দাখিল ভালো ছিলো না। আমি এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো করে সেইটা পূরণ করে ফেলার চেষ্টা করছিলাম। তা আর হলো না।ক রোনা বাস্তবতা হলেও সরকারের যথেষ্ট সৃজনশীলতার অভাব রয়েছে।

রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. রোকন উদ্দিন বলেন, তিনি মনে করেন এইচএসসি রেজাল্ট এই ভাবে প্রকাশ করায় ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি আরও বলেন, সরকার চাইলে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা নিতে পারতো। তাতে স্বাস্থ্য বিধি অবশ্যই মানা সম্ভব। এমসিকিউ বা মূল্যায়ন নাম্বার কমিয়ে পরীক্ষা নেওয়া যেতো।

ভাওয়াল মির্জাপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মো. আলী নেওয়াজ ভুইঁয়া বলেন, বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এম এইচ আরিফ কলেজের শিক্ষক আবু সাইদ বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া মোটেও উচিৎ হয়নি। বিকল্প কিছু চিন্তা করতে পারতো। এই রেজাল্টের মাধ্যমে ভালো ছাত্ররা হতাশায় ভোগাবে।

একজন সরকারি চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, সব কিছু যদি স্বাস্থ্য বিধি  মতো চলে, তা হলে এইচএসসি পরীক্ষা নিতে বাধা কোথায়? শিক্ষার্থীরা মা বাবা, বন্ধু বান্ধবের সাথে হরদমে ঘুরে বেড়াছে। খোলে দেওয়া হয়েছে সব পর্যটন কেন্দ্র। তা হলে পরীক্ষা নিতে বাধা কোথায়? শিক্ষার মান রর্ক্ষার্থে পরীক্ষা ছাড়া মূল্যায়ন করাটা কতটুকু সমীচিন?

এমন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা এই ভাবে মূল্যায়ন হলে অনেকর স্বপ্ন ভেঙে যাবে, আবার অনেকে না চাইতেও ভালো কিছু পেয়ে যাবে। এর মাধ্যমে মেধার অবমূল্যায়ন হবে। 

সিরাজুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সে  জানায়, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ঠিক আছে, তবে যারা এবারে ভালো পড়াশোনা করে জিপিএ ৫ এর স্বপ্ন দেখেছিল তারা বঞ্চিত হবে।  আগে যাদের দুটোতেই জিপিএ ৫ আছে তাদের তো সুবিধাই হচ্ছে।

তা ছাড়া ভবিষ্যতে এই ফলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।

সাহারা জাহান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সে জানায়, এই যে জেএসসি ও এইচএসসি উপর ভিত্তি করে রেজাল্ট হবে। এইটা একটা বাজে সিদ্ধান্ত, কারণ অনেকেই আছে যারা ভালো স্টুডেন্ট কিন্তু কোনো কারণে জেএসসি বা এসএসসি এর রেজাল্ট খারাপ হয়েছে। এখন এটার উপর ভিত্তি করে তার এইচএসসি এর রেজাল্টটাও কিন্তু ভালো আসবে না। আবার অনেক স্টুডেন্ট আছে যারা এত বেশি ভালো স্টুডেন্ট না কিন্তু বোর্ড পরীক্ষায় তাদের রেজাল্ট ভালো হয়েছে। তাই এখন এইচএসসিতেও ভালো হবে।

মাহমুদুল হাছান ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী। তার অভিমত, এইচএসসি পরীক্ষার মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা না নিয়ে একদম জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফল গড় করে একটা ফল  দিয়ে দেওয়া বেপারটা জানি কেমন হয়ে যায় এই আর কি! কেননা, এই ফল ওই শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে একটা প্রভাব ফেলবে৷ আমার পড়ানোর অভিজ্ঞতার আলোকেই বলি, যারা ভালো তারা সবসময়ই ভালো করবেই। তারপর এমন কিছু ছাত্র-ছাত্রী আছে, যারা আগে গ্রামে পড়াশোনা করত একটুর জন্য এসএসসি তে এ প্লাস পায় নাই, তারা  পরে শহরে এসে ভালো করে পড়ালেখা করছে ও তারা ভালো ফল প্রত্যাশী৷ তাদের কি হবে? আবার কিছু স্টুডেন্ট আছে যারা এসএসসিতে  'গোলডেন এ প্লাস 'পেয়েছে এখন এইচএসসি পরীক্ষায় তারা 'এ' পাওয়ার যোগ্য ও না৷  মহামারির কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তারপর  শিক্ষামন্ত্রীকে  ধন্যবাদ যে, এই সংকটময় সময়ে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে শিক্ষার্থীদেরকে স্বস্তি দিয়েছে৷ তবে ভর্তি পরীক্ষায় জিপিএ এর উপর যে নম্বরটা গণনা করা হয় সেটা যদি এই বছর গণনা না করে ভর্তি পরীক্ষার উপর নির্ভর করে  ছাত্রছাত্রীদের মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয়। তবে প্রকৃত মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মূল্যায়ন হবে। ভর্তি পরীক্ষায়  একটু যাচাই বাচাই করে ভর্তির  সুযোগ দিলেই যোগ্য পরীক্ষার্থীরা মূল্যায়িত হবে।

জাহাঙ্গীর আলম ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সে জানায়, যারা পাস করতেই পারতো না তারা এখন পরীক্ষা না দিয়েই পাস করে ফেলবে এক কথায় 'মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি'।

আফরোজা শারমিন হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজের সে বলে সরকারের এই সিদ্ধান্তটা খুব খারাপ করেছে। যারা পরীক্ষা দিয়ে নিজেদের অবস্থা তৈরি করতে চাচ্ছে তাদের কী হবে? যাদের জেএসসি ও এসএসসি তে খারাপ হয়েছে এখন এইচএসসিতে ভালো করবে তাদের কী হবে? সরকার যাচাই-বাছাই করে এইা সিদ্ধান্তটা পুনরায় বিবেচনা করতে পারে।

শাহিন আলম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সে জানায়, এই ভাবে রেজাল্টের মাধ্যমে শিক্ষার অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। যেমন আমার জেএসসি খুব খারাপ ছিলো। পরে ভালো করে পড়ার পর এ প্লাস আসছে। এই যে পরিবর্তন এই সুযোগটা শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না। আমি সরকারের কাছে আবেদন রাখবো সিদ্ধান্তটাকে পরিবর্তন করার জন্য।



এই বিভাগের আরও