বাড়ইপাড়া বিটে ভবন নির্মাণ ও প্লট থেকে ঘুস নেয় বিট অফিসার হোসাইন

যোগফল প্রতিবেদক

19 Oct, 2020 06:57am


বাড়ইপাড়া বিটে ভবন নির্মাণ ও প্লট থেকে ঘুস নেয় বিট অফিসার হোসাইন
ছবি : সংগৃহীত

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ভাওয়াল রেঞ্জের অধীনে বাড়ইপাড়া বিট। দেড় বছরের বেশি সময় যাবৎ বিট অফিসারের দায়িত্বে রয়েছেন হোসাইন আহমেদ। তিনি (বন প্রহরী) থেকে বিটের দায়িত্বে আসার পর থেকেই বিভিন্ন অনিয়মে বেপরোয়া হয়ে উঠেন। কখনও সরাসরি কখনও সাংবাদিক নামধারীদের মাধ্যমে ঘুস লেনদেনে তিনি এরমধ্যেই পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।

ভাওয়ালগড় ইউনিয়নে অবস্থিত [বাড়ইপাড়া বিট] নয়নপুর গ্রামের কচিকাঁচা একাডেমি সংলগ্নে আটমাস আগে শুরু হয় একটি বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই ভবন মালিকের নাম কালাম। ভবনটির সাথেই রয়েছে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট (এফডি) পিলার। এফডি পিলার-ই জানান দিচ্ছে সেখানে বনভূমি রয়েছে। বনভূমির নিকটে ডিমারকেশন [ সীমানা নির্ধারণ ] ব্যতীত বহুতল ভবন করার আইনত কোনও সুযোগ নেই।

শুক্রবার [৯ অক্টোবর ২০২০] বিকাল সাড়ে পাঁচটায় ওই ভবনে কাজ করতে দেখা যায়। ডিমারকেশন বিহীন প্রশ্নবিদ্ধভাবে আটমাস আগে কাজ শুরু করার সময় বাঁধা দেয়নি বিট অফিসার (বন প্রহরী) হোসাইন আহমেদ। এখন পর্যন্ত ওই ভবনের কাজ চলমান থাকলেও তিনি নীরব ভূমিকা পালন করছেন বলে জানিয়েছেন। 

নীরবতার কারণ জানতে চাইলে বিট অফিসার হোসাইন আহমেদ জানিয়েছেন, সাংবাদিক ফরিদুল ইসলাম ও একজন সেনা কর্মকর্তার আত্মীয় ভবনমালিক কালাম। এজন্য আমি ঘটনাস্থলে যাইনি। 

ঘটনাস্থলে না যাওয়ার পেছনের কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার জানিয়েছেন, সাংবাদিক ফরিদুল অন্য নামধারীদের ম্যানেজ করার কথা বলে ৭০ হাজার টাকা এনেছেন ভবন মালিক কালামের থেকে। 

সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কালামের সাথে কথা বললেই এই বক্তব্যের সত্যতা পরখ করা যায়। 

বুধবার [১৪ অক্টোবর ২০২০] দুপুর একটা পাঁচ মিনিটে একজন সংবাদকর্মীর সাথে ছয় মিনিট ৩৯ সেকেন্ড কথা হয় কালামের [বক্তব্য রেকর্ড আছে]। তখন ডিমারকেশন ছাড়াই কিভাবে ভবন নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন ? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, "আপনি ফরিদের সাথে কথা বলেন"। কোন ফরিদ ? পরে তিনি বলেন, "সাংবাদিক ফরিদ, গাজীপুর সদর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি"। 

তার সাথে কথা বলবো কেন? সে কি বনের ডিমারকেশন দেয়? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,“আমি ওখানে যাইনা। সবকিছু ফরিদই দেখে, তাকেই কন্ট্রাক্ট দিয়েছি। সব সমস্যা সেই দেখে। আপনি তার সাথেই কথা বলেন। খবর লিখার দরকার নাই। সেই সব ম্যানেজ করবে আপনি তার সাথেই যোগাযোগ করেন।” এই বলে ফোনের লাইন কেটে দেন।

এরপর বুধবার [১৪ অক্টোবর ২০২০] রাত আটটা ১৬ মিনিটে আর একজন সংবাদকর্মীর সাথে ভবন মালিক কালামের ১৩ মিনিট ১৩ সেকেন্ড কথা হয় [বক্তব্য রেকর্ড আছে]। ওই বক্তব্যেও তিনি জানিয়েছেন, এই বিল্ডিংয়ের দায়িত্বে ফরিদ আছে, ফরিদের সাথে কথা বলেন। কোনও কিছু লিখতে হবে না। ফরিদের সাথে কথা বললেই হবে। বিট অফিসার হোসাইন, সাংবাদিক ফরিদ ও সেনা কর্মকর্তা সোহরাব বিষয়টি অবগত আছেন। সকল সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব সাংবাদিক ফরিদকে দেওয়া হয়েছে। সাথেই যোগাযোগ করুন।

শুধু ওই ভবনই নয়, ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের নয়নপুর গ্রামের [রাজেন্দ্রপুর আরপি গেইটের দক্ষিণে] এক প্রবাসীর স্ত্রী [সোহাগের মা] বন বিভাগ কর্তৃক স্থাপন করা এফডি পিলার উঠিয়ে দেদারসে বাড়ি নির্মাণ করছেন। এখানেও সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছে সাংবাদিক ফরিদুল ইসলাম। সেখানে তথ্য সংগ্রহের গেলে সোহাগের মা জানিয়েছেন, ফরিদ ও বিট অফিসার এসে মাপজোক করে পিলার স্থাপন করে গেছেন। তারা বিষয়টি জানে।

ওই পিলার কোথায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, পিলার আরও নিচে ছিল। মাটি ভরাট করে ভরে গেছে। অপর এক বনের জমি জবরদখলকারী নজরুল ইসলাম নামের একজন ঘটনাস্থলে এসে বলেন, এখানে বেশি বনের জমি নেই। তাদের চলমান করা নতুন ঘরে দুই-তিন হাতের বেশি বনের জমি হবে না। তবে সোহাগের মা বনের স্থাপন করা পিলার না দেখাতে পেরে দিশেহারা হয়ে যায়। পরে সাংবাদিক ফরিদের মাধ্যমে এই খবরের প্রতিবেদককে ঘুস দিয়ে ম্যানেজের ‘অপচেষ্টা’ করে। 

শুধু বহুতল ভবন ও সাধারণ বসতি থেকেই নয়, সামজিক বনায়নের প্লট বরাদ্দেও রয়েছে ঘুস অভিযোগ। 

সম্প্রতি এই বিটের রানীপুর গ্রামে অনুসন্ধানে জানা যায়, দিনমজুর  জামাল উদ্দিনের (৪৫) থেকে প্লট দেওয়ার কথা বলে ১৫ হাজার টাকা ঘুস দাবি করে বারইপাড়া বিটের বন প্রহরী ফয়েজ। পরে ১৫ হাজার টাকা দিতে অস্বীকার করে দিনমজুর জামাল। টাকা না দিলে প্লট পাবে না এমন কথা শুনে সে অনেক কষ্ট করে ১১ হাজার টাকা তুলে দেয় ফয়েজের হাতে। তখন দ্রুত দলিল দেওয়ার কথা বলেই টাকাটা নিয়েছিল ফয়েজ। এখনও পর্যন্ত প্লটের দলিল পায়নি জামাল।

একই এলাকার গিয়াসউদ্দিনের স্ত্রী মিনু বেগম শনিবার [১০ অক্টোবর ২০২০] বিকেল সাড়ে তিনটায় জানিয়েছেন, আমি ২০ হাজার করে দুইটা প্লটে মোট ৪০ হাজার টাকা দিয়েছি বিট অফিসারকে। ওই ৪০ হাজার টাকা ফরেস্টারকে দেওয়ার পরই আমাকে প্লটের দলিল বুঝিয়ে দেয়। শুধু আমার থেকেই নয়, সবার থেকেই টাকা নিয়ে প্লটের দলিল বুঝিয়ে দেয় বনের ব্যক্তিরা।

একই এলাকার আব্দুল বারেকের স্ত্রী জাহারা খাতুন জানিয়েছেন, আমি একটি প্লটের জন্য বিট অফিসার হোসাইনকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছি। দলিল পেলে আরও পাঁচ হাজার টাকা দেওয়ার কথা। 

এছাড়াও একটা ছাপড়া ঘর করতে ৫ হাজার, আর একটা ঘরে ৮ হাজার এবং একটা টিনের ঘর করতে ১৫ হাজার টাকা দিয়েছি। টাকা না দিলে একটা বাথরুমও করতে পারিনা! পুরাতন টিন পরিবর্তন করলেও বিট অফিসারকে টাকা দিতে হয়। টাকা ছাড়া কেউ ঘরের টিনও পরিবর্তন করতে পারে না।

একই এলাকায় বাস করেন হারুনের স্ত্রী সেলিনা খাতুন। তারা বনের জমিতে টিনের ঘর তৈরি করে বাস করছিলেন। পরে সন্তানরা বড় হওয়ায় টিনের ঘরে তাদের থাকতে দিয়ে সেলিনা আক্তার গত দুই বছর যাবৎ নিজেই থাকেন গোয়ালঘরে। 

সরেজমিন পরিদর্শনে গোয়ালঘরে থাকার দৃশ্য দেখে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সেলিনা আক্তার জানিয়েছেন, আমরা গরীব মানুষ। বৃষ্টি পড়লেই গোয়ালঘরে পানি পড়ে। সন্তানরা বড় হয়েছে, একসাথে তো আর থাকা যায়না। তাই আমি গরুর ঘরেই থাকি। বৃষ্টি হলেই পুরাতন টিনের ছিদ্র দিয়ে শরীরে পানি পড়ে। এই পুরাতন টিন পরিবর্তন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ফরেস্টার ঘর করতে হলে এক লাখ টাকা দাবি করে। ওই টাকা পরিশোধ করতে পারছিনা বলেই আমাকে গোয়ালঘরে থাকতে হচ্ছে। 

এ ব্যাপারে ভাওয়াল বাঁচাও আন্দোলনের সূচনাকারী মহাসচিব ডক্টর এ কে এম রিপন আনসারী জানিয়েছেন, বনদখলের সাথে যেই জড়িত থাকুক, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায় সংগঠন।

এসব অনিয়ম প্রসঙ্গে প্রথমে হোসাইন কথা বলতে রাজি হননি। পরে বলেন, শুধু এগুলো দেখেন কেন? ভালোটাও দেখেন। অনেক জবরদখল উদ্ধার করেছি, যা অন্য কেউ করেননি। 

কালামের ভবন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা ফরিদ ও এক কর্নেলের আত্মীয়। তাই ওদের ছাড় দিয়েছি। সামাজিক বনায়নের প্লট থেকে মোটা অঙ্কের ঘুস নেওয়া প্রসঙ্গে শনিবার [১৭ অক্টোবর ২০২০] সন্ধ্যা ছয়টা ২৬ মিনিটে জানতে চাইলে তিনি কোনও উত্তর দেননি। 

এ ব্যাপারে ভাওয়াল রেঞ্জ কর্মকর্তা মাসুদ রানা জানিয়েছেন, সামাজিক বনায়নের প্লট ঠিকভাবে দেওয়া হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য এরইমধ্যেই ডিএফও স্যার তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। ডিমারকেশন বিহীন কোনও স্থাপনা করার কোনও সুযোগ নেই। সাংবাদিক অথবা কর্নেলের আত্মীয় হলেও নয়, আইন সবার জন্যই সমান। এ ব্যাপারে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।     

এ ব্যাপারে রিপন আনসারী বলেন, তদন্ত কমিটি হয়ে থাকলে নিশ্চয়ই কোন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হওয়ার কথা।


বিভাগ : তালাশ


এই বিভাগের আরও