শ্রীপুরে সন্তানের পিটনিতে দিশেহারা পিতা

মো. মোজাহিদ

02 Nov, 2020 06:58pm


শ্রীপুরে সন্তানের পিটনিতে দিশেহারা পিতা
তোতা মিয়া

প্রথম স্ত্রী চার সন্তান রেখে মারা গেছে প্রায় এক যুগ পার হলো। মারা যাওয়ার পরপরই বিয়ে করেন শরাফত আলী ওরফে তোতা মিয়া (৬৮)। প্রায় দুইবছর আগে তোতা মিয়া স্ট্রোক করে। তখন নামমাত্র টাকা দিয়ে পিতার কাছ থেকে কিছু জমি কৌশলে লিখে নেয় শাজাহান (৪৪)।

ওই জমি লিখে নেওয়ার পর থেকেই কালবৈশাখী ঝড় নেমে আসে তোতা মিয়ার জীবনে। পাল্টে যায় বড় সন্তানের আচরণ। পিতার উপর শুরু করে অমানবিক নির্যাতন। 

তোতা মিয়া নির্যাতন সইতে না পেরে এলাকার মুরব্বিদের শরণাপন্ন হয়। তবুও কোনও সুরাহা না পেয়ে বরমীর ওয়ার্ড মেম্বার জাকির হোসেনকে সার্বিক বিষয় জানায়। পরে গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে তোতা মিয়ার ভরনপোষণের জন্য দুই সন্তানকে প্রতি মাসে এক হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। শাজাহান ও তার ছোট ভাই শারফুল গ্রাম্য সালিশি সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি।

এরপর বিচার না পেয়ে ইউনিয়ন পরিষদে লিখিত অভিযোগ দেয় তোতা মিয়া। সেখানে পরপর তিনবার তার সন্তানদের তলব করলে তারা উপস্থিত না হওয়ায় ব্যর্থ হয় ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃপক্ষ। 

তোতা মিয়া দিশেহারা হয়ে শ্রীপুর মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত না করে শাজাহানের সাথে মোবাইলে কথা বলে চলে যায়। 

মেম্বারের সহযোগিতায় পরে এসপি [পুলিশ সুপার] বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিলে তিনি ডিবির একজনকে দায়িত্ব দেয়। পরে ডিবির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একটি লিখিত অঙ্গীকারনামায় প্রতি মাসে ৮০০ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেয়। মাত্র দুইমাস টাকা দেয় তোতা মিয়ার সন্তান শাজাহান ও শারফুল।

শাজাহান শুধু তার পিতাকে মেরেই ক্ষান্ত হননি! তার সৎ মা সুমিকেও টেঁনে হিঁচড়ে শ্লীলতাহানি করেছেন একাধিকবার। 

গত বুধবার [২১ অক্টোবর ২০২০] সকালে তোতা মিয়ার ঘরের সামনে গর্ত খোঁড়ার সময় মৌখিকভাবে নিষেধ করলে প্রথমে তোতা মিয়াকে কোদাল দিয়ে মারধর করে শাজাহান। এক পর্যায়ে তোতা মিয়া অজ্ঞান হয়ে যায়। পরে সকল অভিযোগের কাগজপত্র নিয়ে এসপি অফিসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলে, বাড়ির কাছ থেকেই শাজাহান ও তার স্ত্রী-সন্তান মিলে সকল কাগজপত্র মারধর করে ছিনিয়ে নেয়। তাৎক্ষণিক সকল অভিযোগের কাগজ ছিড়ে ফেলে দেয় শাজাহান। 

তখন তার পিতাকে বলে, "এখন তুমি তুমার কোন বাপের কাছে যাইবা"? দারোগা পুলিশ আমার একটা .... ছিড়তে পারবে না! 

তখন শাজাহান তার পিতা তোতা মিয়াকে মেরে হাতের আঙুল ভেঙে দেয়। রক্তাক্ত করে দেয় পিতার শরীর। তখন মারতে নিষেধ করলে শাজাহান কটাক্ষ করে বলে, "তরে মারলে আমার একটা .... যাইবো না! তোর অভিশাপে আমার কিছুই হইবো না"!

শনিবার [৩১ অক্টোবর ২০২০] বিকেলে কান্নাজড়িত কন্ঠে ওই কথাগুলো সাংবাদিকদের জানায় হতভাগ্য পিতা শরাফত আলী ওরফে তোতা মিয়া।

তোতা মিয়া গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের কাশিজুলি গ্রামের মৃত শমর আলী দপ্তরির সন্তান। 

প্রথম স্ত্রী শাফিয়া খাতুন মারা যাওয়ার পর তোতা মিয়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রী'র সন্তানরা হলেন, নূরজাহান (৪৬), শাজাহান (৪৪), লিলি (৩৬) ও শারফুল (৩৫)। চার সন্তানের মাঝে শাজাহানকে বেশি আদর করতেন তোতা মিয়া। অন্যের বাড়িতে দিনমজুরি কাজ করে সন্তানকে লেখাপড়া করিয়েছেন তিনি। প্রতিদান হিসেবে এখন বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে চায় তোতা মিয়াকে। বাড়ি ছেড়ে না যাওয়ায় কিছুদিন পরপর পিতার উপর চালায় অমানবিক নির্যাতন। শাজাহান স্থানীয় আওয়ামীলীগের রাজনীতি করে বলে জানা যায়।


শাজাহান তার পিতাকে দেখাশোনা না করে উল্টো মারধর করে। এতে ভয়ে কেউ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না। কারণ, সে রাজনীতি করে। মেম্বার, চেয়ারম্যান, ও পুলিশকে সে ভয় পায়না। তাকে সবাই ভয় পায়। ভয়ে ভয়ে সাংবাদিকদের এমনটাই জানিয়েছেন শাজাহানের বড় চাচা। তিনি আরও জানান, তোতা মিয়ার ঘরে বিদ্যুৎ ও পানি দেয়নি শাজাহান। কিছুদিন পরপর মারধোর করে। 

উপজেলার লাকচত্বর গ্রামের মকবুলের [অধম মাঝি] সন্তান সুমিকে (৩২) তোতা মিয়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সুমি জন্ম থেকেই কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন। সুমিকে বিয়ে করার পর আবারও একটি ছেলে সন্তান হয় তোতা মিয়ার।

জমি লিখে নেওয়ার পর থেকেই বড় ছেলে শাজাহান কর্কশ ব্যবহার ও মারধোর করছে তার পিতাকে। এ পর্যন্ত তিনবার মেরে রক্তাক্ত করেছে। বিভিন্ন দফতরে দেওয়া সকল অভিযোগের কাগজ ছিড়ে ফেলেছে শাজাহান।

পিতাকে মারধোর প্রসঙ্গে শাজাহান জানিয়েছেন, আমার পিতা ষড়যন্ত্রমূলক এসব অভিযোগ করছে। এসব মিথ্যা অভিযোগ। 

এ-সব ব্যাপারে ওয়ার্ড মেম্বার জাকির হোসেন জানিয়েছেন, আমি এর আগে কয়েকবার সালিশ করেছি। শাজাহান আমার সালিশি সিদ্ধান্ত মানেনি। পরে ডিবিকে অভিযোগ দিলে প্রতি মাসে ৮০০ টাকা দেওয়ার অঙ্গীকার করে শাজাহান ও তার ছোটভাই শারফুল। দুই-তিনমাস দিয়ে তারা সেটা বন্ধ করে দেয়। তার পিতাকে মারধরের বিষয়টি আমি তদন্ত করে সত্যতা পেয়েছি। আইনি জটিলতা থাকায় আমি শাজাহানকে কোনও শাস্তি দিতে পারিনি! 

এ ব্যাপারে 'শ্রীপুর উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ' কমিটির সদস্য সাঈদ চৌধুরী জানিয়েছেন, 'আমাদের বাবা-মা কে অবশ্যই সন্মান করতেই হবে। কেউ যদি এইরকম ভায়োলেন্সের সাথে যুক্ত হয় তাহলে আমি চাই যে প্রশাসন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক। শুধু তাই নয়, স্থানীয় সরকার এর যারা দায়িত্বে আছেন তাদের আওতায় রেখে বাবা-মা কে যেন নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয় এটাই আমার দাবি থাকবে'।


বিভাগ : হ-য-ব-র-ল