গণপিটুনির মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড, নৃশংশতার বিস্তার ঘটছেই

যোগফল ডেস্ক

07 Nov, 2020 12:28pm


গণপিটুনির মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড, নৃশংশতার বিস্তার ঘটছেই
ছবি : সংগৃহীত

কখনও চোর, কখনও ডাকাত, কখনও বা ছেলে ধরা, নানা সন্দেহের বশে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে গণপিটুনি মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড চলছেই।

শেষে এর যুক্ত হয়েছে কোরআন অবমাননার গুজবে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে মারা।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত গণপিটুনিতে অন্তত ৩০জন নিহত হয়েছেন।

বাংলাদেশে এই গণপিটুনির ঘটনা কেন বাড়ছে? মানুষ কেন এতোটা নৃশংস হয়ে উঠছে? এ ধরণের প্রশ্ন অনেকের মনেই জেগেছে।

ঢাকায় রেনু হত্যাকাণ্ড

এখন হতে মাত্র এক বছর চারমাস আগের কথা।

বাংলাদেশ জুড়ে যখন 'ছেলেধরা ও কাটা-মাথা' গুজবে সয়লাব তখন ঢাকার বাড্ডা এলাকায় ছেলে ধরা সন্দেহে তাসলিমা আক্তার রেনুকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

রেনুকে হত্যার পর জানা গেল তিনি সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য তথ্য আনতে সে এলাকায় গিয়েছিলেন।

এই ঘটনায় মামলা দায়ের এবং পুলিশের তদন্ত শেষ হলেও এখনও বিচার হয়নি। নিহত মিস রেনুর ভাগ্নে এবং মামলার বাদি সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটুর মুখে এখন শুধুই হতাশা ।

তিনি বলেন, " বিচার যদি বিচারের মতো হয়, তখন ওই বিচারের মধ্যে বার্তা থাকে।"

"এতোদিন হয়ে গেল কিন্তু বিচার হলো না। আগে থেকে যদি ঘটনার বিচার হতো তাহলে আমার খালার ক্ষেত্রে এই ঘটনা ঘটতো না। আমার খালার হত্যাকাণ্ডের বিচার যদি হতো, তাহলে এখন এসব ঘটনা ঘটতো না," বলেন টিটু।

লালমনিরহাটে কোরআন অবমাননার গুজবে শহিদুন্নবী জুয়েল নামে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে, প্রকাশ্যে লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

আমিনবাজারে ছয় শিক্ষার্থী পিটিয়ে হত্যা

এখন থেকে নয় বছর আগে ঢাকার কাছে আমিনবাজারে ৬ শিক্ষার্থীকে ডাকাত সন্দেহে রাতে পিটিয়ে মারে একদল এলাকাবাসী।

হত্যাকাণ্ডের পরে জানা গেল তারা ডাকাত নয়, শবে বরাতের রাতে বন্ধুরা মিলে সেখানে ঘুরতে গিয়েছিল।

নিহতদের মধ্য একজনের পিতা সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আমিনুর রহিম বলছিলেন, নয় বছরেও বিচার শেষ হয়নি।

"বাংলাদেশে তো একটা বিচার শুরু হলে সেটা বিভিন্ন রকম স্টেজ পার হয়ে আসতে হয়। আমি মনে করি, একটা যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে বিচারকার্য সম্পন্ন হওয়া উচিত।"

গণপিটুনির নামে অসংখ্য হত্যাকাণ্ড হয়েছে বাংলাদেশে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকার পল্টনের রাস্তায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

গণপিটুনির নামে হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশে থেমে নেই। এর মধ্যে শেষে যুক্ত হয়েছে কোরআন অবমাননার গুজব ছড়িয়ে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার পর লাশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

মামলা হয় কিন্তু বিচার শেষ হয় না

গণপিটুনির নামে যখনই কোন হত্যাকাণ্ড হয় তখনই একটি মামলা হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন ঘটনার বিচার শেষ হয়নি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিতি সানজানা বলেন, " একজন মানুষের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। আজ পর্যন্ত কোন ঘটনার বিচার শেষ হতে দেখিনি, কাউকে সাজা ভোগ করতে হয়নি। ফলে এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়।"

গণপিটুনির সাথে আর্থ-সামাজিক অবস্থার সম্পর্ক

গণপিটুনির সময় মানুষের মাঝে নৃশংসতার মনোভাব অনেককে চমকে দিয়েছে।

গণপিটুনির খবরগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বেশিরভাগ ঘটনা ঘটেছে গ্রামাঞ্চলে নতুবা শহরাঞ্চলের মধ্যে নিম্নবিত্ত এলাকায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গণপিটুনির মতো অপরাধের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, আর্থ-সামাজিক বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানের শিক্ষক খন্দকার ফারজানা রহমান গণপিটুনির ঘটনাগুলোর দিকে নজর রাখেন।

তিনি বলেন, " একটা মানুষের ব্যাকগ্রাউন্ড, তার নিডস , ওরিয়েন্টশন, এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে সমাজে ইনইক্যুয়ালিটি বেশি থাকে, সেখানে সমাজের একটি অংশের মধ্যে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া কাজ করে। আপনি দেখবেন, রেনু হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেব যাকে ভিডিয়োতে দেখা গেছে এবং পুলিশও যাকে আটক করেছে সে একজন সবজি বিক্রেতা।"

গণপিটুনির মতো ঘটনাগুলো বেশি দেখা যায় বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে পশ্চাৎপদ সমাজে।

মনোবিজ্ঞানীরা এই প্রবণতাকে 'মব সাইকোলজি' হিসেবে বর্ণনা করেন।

তারা বলছেন, এর সাথে শিক্ষার বিষয়টি সরাসরি জড়িত। যারা গণপিটুনির মতো অপরাধের সাথে জড়িত হচ্ছে তারা উচিত এবং অনুচিতের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাহফুজা খানমের মতে, গণপিটুনিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সত্য-মিথ্যা যাচাই করার মতো ক্ষমতাও নেই।

"শিক্ষার ফলে মানুষের পারসোনালিটি স্ট্রং হয়। ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা তৈরি হয়। এডুকেশন না থাকলে তারা অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয় বেশি," বলেন অধ্যাপক খানম।

মব সাইকোলজি কেন তৈরি হয়?

গণপিটুনির সময় মানুষ কেন এতোটা বেপরোয়া ও নৃশংস হয়ে উঠে তার কিছু কারণ আছে।

ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম বলেন সামাজিক মনস্তত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন।

তিনি বলেন, কোন ব্যক্তি এককভাবে অপরাধ করা আর সংঘবদ্ধভাবে অপরাধ করার মধ্যে পার্থক্য আছে।

অধ্যাপক ইসলাম বলেন, "মব সাইকোলজিতে যেটা হয় সেটা হচ্ছে, সবাই মনে করে এতো ব্যক্তি যেহেতু জড়িত, সেজন্য পুরো দায়িত্ব তার ঘাড়ে আসবে না। কোন একজন ব্যক্তি যখন এককভাবে কোন অপরাধ করতে যায়, তখন সে জানে যে এজন্য তাকেই দায়িত্ব নিতে হবে। কিন্তু মব সাইকোলজির ক্ষেত্রে সেটা হয় না।"

গণপিটুনির মাধ্যমে সন্দেহভাজনদের পিটিয়ে হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না।

এ বিষয়টিকে অনেক হয়তো উপেক্ষা করেন। সমাজের একটি অংশের মধ্যে এমন প্রবণতাও দেখা যায় যে গণপিটুনির জন্য দেশে আইনের শাসনের অভাবকেই দায়ী করা হয়।

বিশ্লেষকদের অনেকই বলছেন, এ ধরণের মানসিকতা অপরাধীদের পরোক্ষ সমর্থন দেবার মতো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানের শিক্ষক ফারজানা রহমান বলছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে যেভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়, তেমনি গণপিটুনির নামেও বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে।

" আপনি যদি নিজেই নিজের হাতে আইন তুলে নেন তাহলে সেখান ল-লেসনেস তৈরি হবে। এটা কোন সভ্য সমাজে কাম্য হতে পারে না, " বলেন ফারজানা রহমান।

এদিকে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে গণপিটুনির ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে গুজব একটি বড় ভূমিকা রেখেছে।

প্রতিটি ঘটনায় মূল অপরাধীদের চিহ্নিত করা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা দাবি করছেন।

যেহেতু এসব ঘটনার সাথে বহু মানুষের অংশগ্রহণ থাকে, সেখান থেকে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করতে সময় লাগে বলে তারা উল্লেখ করেন।


বিভাগ : হ-য-ব-র-ল