এক কৃষ্ণাঙ্গ নারীর জয়

যোগফল রিপোর্ট

09 Nov, 2020 07:40am


এক কৃষ্ণাঙ্গ নারীর জয়
ছবি : সংগৃহীত

তার সৎ সন্তানেরা তাকে ভালোবেসে ডাকে ‘মমালা’ বলে। আর মার্কিন রাজনীতিতে তিনি পরিচিত ক্ষুরধার বুদ্ধির এক অসাধারণ নারী হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম নারী, প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ এবং প্রথম এশীয় বংশোদ্ভূত ভাইস প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন কমালা হ্যারিস। জয় নিশ্চিতের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কমালা হ্যারিস একটি ভিডিয়ো পোস্ট করেন। এতে দেখা যায়, তিনি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জো বাইডেনকে ফোন করে উচ্ছসিত গলায় বলছেন, ‘আমরা সফল হয়েছি জো, আমরা সফল হয়েছি। আপনি যুক্তরাষ্ট্রের পরের প্রেসিডেন্ট হতে চলেছেন!’

গত ২৫ মে মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসে দিনের আলোয় মার্কিন পুলিশের হাতে নিহত হন কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েড। এরপরই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে  ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও সমগ্র বিশ্বেই হঠাৎ করেই কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার নিয়ে সচেষ্ট হয়ে ওঠে মানুষ।

এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই কমালাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী করেন ডেমোক্রেট দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জো বাইডেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষিক্ত হচ্ছেন কমালা হ্যারিস।

সৌভাগ্য, সৌন্দর্য ও শক্তির  দেবী লক্ষ্মীর প্রতীক কমল বা পদ্মফুল। এর সঙ্গে মিল রেখেই তার নাম কমালা রাখেন তার মা শ্যামলা  গোপালান। কমালা ছিলেন বুদ্ধিমান, যুক্তিতে তুখোড়। তার ক্ষুরধার বুদ্ধিই তাকে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে করেছে সফল। একইসঙ্গে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণাতেও ডেমোক্রেট দলের পক্ষে দারুণ গতি নিয়ে এসেছিলেন তিনি।

কমালা হ্যারিস ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর। ডেমোক্রেট দলের মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথমে ছিলেন জো বাইডেনের প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে তাকে হারিয়ে দলীয় মনোনয়ন পান জো বাইডেন। মনোনয়ন লড়াই যখন শুরু হয় তখন জো বাইডেন, বার্নি স্যান্ডার্স ও এলিজাবেথ ওয়ারেনের মতো কমালাকেও বেশ সম্ভাবনাময়ী মনে করা হচ্ছিল। তবে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ পিছিয়ে পড়তে শুরু করেন তিনি। শেষে ডিসেম্বর মাস নাগাদ মনোনয়ন দৌড় থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করেন হ্যারিস। জো বাইডেনকে ডেমোক্রেট দল থেকে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দেওয়ার পর তার রানিং মেট হিসেবে কমালাকেই বেছে নেওয়া হয়। এরপর একসঙ্গে তিনটি রেকর্ড গড়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন তিনি। কমালা হ্যারিসই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ, নারী ও এশীয় বংশোদ্ভূত ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি জন্ম দিয়েছেন এক নতুন ইতিহাসের। তাকে নিয়ে কমিউনিকেশন ডিরেক্টর গিল ডুরান বলেন, বাইডেনের প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে তার রানিং মেট হওয়ার মধ্য দিয়ে কমালার ভাগ্য বদলে গেছে। অনেকেই মনে করেন, হোয়াইট হাউসে এতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যাওয়ার যোগ্যতা ও শৃঙ্খলা হ্যারিসের নেই। যদিও তিনি তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য পরিচিত ছিলেন। সবাই নিশ্চিতভাবেই হ্যারিসের খাঁটি মেধার কথা জানতেন।

কমালা হ্যারিসের পিতা ও মাতা দুইজনই ছিলেন অভিবাসী। তার পিতা ছিলেন জামাইক্যান এবং মা ছিলেন ভারতীয়। ডনাল্ড হ্যারিস ছিলেন মার্ক্সবাদী। কর্মজীবনে ছিলেন, স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। কমালা হ্যারিস জানিয়েছেন, তার পিতা-মাতার প্রেম হয় মূলত আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে। তার পিতা ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছিলেন। এরপর প্রেম আর বিয়ে। কমালার জন্ম হয় ক্যালিফোর্নিয়ার অকল্যান্ডে। ১৯৬৪ সালের ২০ অক্টোবর জন্ম নেন তিনি। ওই সময় কমালার পিতা ডনাল্ড হ্যারিস আর মা শ্যামলা নাগরিক অধিকার আন্দোলনে এতোটাই নিবেদিত ছিলেন যে, এলাকার প্রায় সব প্রতিবাদ কর্মসূচিতেই তাদের দেখা মিলতো। মাঝে মাঝে স্ট্রলারে করে মেয়েকেও নিয়ে যেতেন তারা।

তার বয়স যখন ৫ বছর তখন তার পিতা-মাতা’র ডিভোর্স হয়। তাকে ‘হিন্দু সিঙ্গেল মাদার’ হিসেবে বড় করেন তার মা শ্যামলা গোপালান হ্যারিস। কমালার মা ছিলেন একজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক অধিকার কর্মী। তিনি তার ভারতীয় সংস্কৃতি নিয়ে বড় হন। তার মায়ের সঙ্গে তিনি ভারত ঘুরতে আসেন। হ্যারিস জানিয়েছেন যে, তার মা অকল্যান্ডের কৃষ্ণাঙ্গদের সংস্কৃতিই বেশি ধারণ করতেন।

এ নিয়ে কমালা তার আত্মজীবনীমূলক বইতে লিখেন, আমার মা ভালো করেই জানতেন যে, তিনি দুইজন কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েকে বড় করছেন। তার মেয়েরা যে দেশে বড় হবে সেখানে তাদের কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবেই পরিচিত হতে হবে। তাই তিনি চাইতেন, তার মেয়েরা যেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গর্বিত কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে বেড়ে ওঠে। তবে তার মা কমালা ও তার ছোট বোনকে নিয়ে চার্চ এবং মন্দির দুই পবিত্র উপাসনালয়েই যেতেন।

নিজের জীবনে কমালা হ্যারিস বিভিন্ন পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। এরমধ্যে রয়েছে শ্বেতাঙ্গ প্রধান কমিউনিটিগুলোও। তার মা গোপালান হ্যারিস কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ছিলেন একসময়। সে সময় কমালা হ্যারিস ও তার ছোট বোন মায়াও কানাডায় ছিলেন। তারা সেখানে মন্ট্রিলে ৫ বছরেরও বেশি সময় স্কুলে পড়েছেন। হ্যারিস সবসময়ই নিজের পরিচয় নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন এবং নিজেকে একজন আমেরিকান বলেই পরিচয় দিতেন।

২০১৪ সালে কমালা হ্যারিস বিয়ে করেন আইনজীবী ডগলাস এমহফকে। এসময় এমহফের দুই সন্তান ছিল। গত বছর কমালা একটি আর্টিকেলে লিখেন ইলি ম্যাগাজিনে। এতে তিনি ওই দুই সন্তানের সৎমা হিসেবে তার অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, যখন আমি ও এমহফ বিয়ে করলাম তখন তার দুই সন্তান কোল ও এলার সঙ্গে বসে আমি ঠিক করলাম যে তারা আমাকে সৎমা বলে ডাকবে না। এর পরিবর্তে আমার নামের সঙ্গে মিলিয়ে তারা আমাকে ‘মমালা’ বলে ডাকবে।

শিক্ষা জীবনে কমালা হ্যারিস যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে পড়েছেন। হেস্টিং কলেজ থেকে ডিগ্রি নিয়েছেন আইনের উপর। ১৯৯০ সালে তিনি অকল্যান্ডের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০৪ সালে হন স্যান ফ্রান্সিসকোর ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি। ২০১০ সালে হন ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল। সেটিও ছিল কৃষ্ণাঙ্গ কারো জন্য প্রথমবারের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার ঘটনা। তবে ডেমোক্রেট দলের মধ্যে তিনি নজরে আসেন ২০১২ সালে। সেবার বারাক ওবামাকে দ্বিতীয় বারের মতো মনোনয়ন দেওয়ার সময় ন্যাশনাল কনভেনশনে অসাধারণ বক্তব্য রেখেছিলেন হ্যারিস। সেটিই ডেমোক্রেটদের নজর কাড়ে। যদিও ২০০৮ সালেই বারাক ওবামাকে সমর্থন দেয়া সরকারি কর্মকর্তাদের তালিকায় প্রথম ছিলেন হ্যারিস।

২০১৪ সালে বিয়ের দুই বছরের মাথায় সিনেট নির্বাচনে জয় পান তিনি। কমালা হ্যারিসই ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উচ্চকক্ষে পা রাখা প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং আফ্রিকান বংশোদ্ভূতদের মধ্যে দ্বিতীয় সিনেটর। তিনি ছিলেন উদারপন্থি। সোচ্চার ছিলেন অভিবাসন ও বিচার প্রক্রিয়ার সংস্কার নিয়ে। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি এবং গর্ভপাত আইন নিয়েও সক্রিয়তা ছিল তার। তিনি দ্রুতই আলোচিত হয়ে ওঠেন তার বুদ্ধিদীপ্ত জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে। ২০১৭ সালে মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশনস ও পরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ব্রেট কাভানহর শুনানিতে তার জিজ্ঞাসাবাদ ডেমোক্রেটদের মধ্যে তুমুল প্রশংসিত হয়।

রাজনৈতিক আদর্শের দিক থেকে কমালা হ্যারিস উদারপন্থি। তিনি অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসন, গর্ভপাতের মতো ইসুতে সবসময়ই ছিলেন প্রগতিশীলদের সঙ্গে। সক্রিয় ছিলেন, সমকামীদের অধিকার, শিক্ষাখাতে ব্যয়বৃদ্ধি ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। জো বাইডেনের মতো হ্যারিসও ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে আসার বিরোধী ছিলেন। তবে ইসরাইল প্রশ্নে তিনি বরাবরই ছিলেন ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সুসমপর্কের পক্ষের মানুষ। তিনি এ বিষয়ে ২০১৭ সালে একবার বলেছিলেন, ইসরাইলের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য তার ক্ষমতার মধ্যে যা যা রয়েছে তার সবটাই তিনি করবেন।


বিভাগ : ভিনদেশ


এই বিভাগের আরও