মমতা গলে রোদে, অনশনের পর শ্রীপুরে ধর্ষণের মামলা

আসাদুল্লাহ বাদল

09 Nov, 2020 10:30am


মমতা গলে রোদে, অনশনের পর শ্রীপুরে ধর্ষণের মামলা
ছবি : সংগৃহীত

গাজীপুর জেলায় মমতাময়ী ব্যক্তিদের অভাব নেই। আইনের শাসনও উত্তম। এমন প্রচার নিয়ে ব্যস্ত থাকেন অনেক অ্যাক্টিভিস্ট। বাহারি ছবির বিজ্ঞাপন দেখে পিত্ত জ্বলে যায়। কে, কখন, কাকে খুশি করতে চায়, এটি ঠাহর করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। কখনও কখনও এমন প্রচার দেখা যায়, এতে আন্দাজ করতে দেরি হয়, কে আমলা আর কে জনপ্রতিনিধি? আমলার কাজ জনপ্রতিনিধি করছেন, না আমলা জনপ্রতিনিধির কাজ করছেন, এটিও ঠাহর করতে সময় নিতে হয়।

কখনও মনে হয় আমালাদের পপুলারিটি এমন চমৎকার আকার ধারণ করেছে, ফলে আর কারও দরকার নেই। এই অবস্থায় যখন হঠাৎ দেখি একজন মাকে রোদে পুড়ে ধর্ষণের শিকার সন্তানের বিচার দাবি প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে হয়। তখন পপুলারিটিটা আসলে কার এর নতুন হিসাব মিলাই।

ঘটনাস্থলে ছুটে বেড়ানো অনেক আমলা ও জনপ্রতিনিধির খবরও আমরা পাই। কিন্তু কেন একমাস পরে মামলা করতে না পারার কারণে একজন মা রাস্তায় বসেছে এই ‘জবাবদিহি’ পাই না। এমনকি চাইও না। কারণ এসব চাইলেই ‘তারা’ অখুশি হতে পারেন। বরং সত্য অসত্য বাছবিচার না করে যারা ফটোসেশন করে তারা গুডবুকে থাকে।

মাস দেড়েক আগে শ্রীপুর পৌরসভার মেয়র আনিছুর রহমানের ভাই হাফিজুর রহমান ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে আধা ঘণ্টার মধ্যে মুছে ফেলেছেন। তখনই আমরা আন্দাজ করতে পেরেছি সত্য কিভাবে চুয়ে পড়ে। আগেও এমন ঘটনার ইতিবৃত্ত রয়েছে।

ভিকটিমের মা ঘটনার পরেই এজাহার দায়ের করেছেন দাবি করেছেন। কেন তখন মামলা হয়নি, এই প্রশ্নের কোন জবাব নেই। কেবল মামলা হয়েছে এতেই খুশি। মমতাময়ীদের কোন আবেদনও এতে চোখে পড়ে না। 

কেউ খালি হাতে ফিরে না এমন খবর শুনে শুনে অভ্যস্ত হলেও গত মাসে শ্রীপুর থানায় বলাৎকারের অভিযোগ দিয়েও মামলা করাতে পারেননি এক ভুক্তভোগী। পরে ওই ঘটনা আপোস করার কসরৎ চালানো হয়েছিল। আবার বলাৎকারের ঘটনার খবরকে কেন্দ্র করে একদল দালাল মাঠে নেমেছিল বিচারপ্রার্থীকে হেনস্থা করতে।

গাজীপুর জেলার শ্রীপুরে কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনায় বিচারের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ওই কিশোরীর মা। রোববার (৮ নভেম্বর ২০২০) বেলা এগারোটায় শ্রীপুর উপজেলা প্রশাসনের মূল গেইটে ফেস্টুন লিখে ওই মা তার কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণের বিচারের দাবিতে অনশন শুরু করেন। 

বিক্ষুদ্ধ মা ধর্ষণের মতো ঘটনায় মামলা দায়ের করতে না পারার কারণে রাস্তায় বসেছেন। তার দাবি প্রচারের জন্য নিজের সন্তানের নামও লিখেছেন। এই নিয়ে কয়েকজন অ্যাক্টিভিস্ট ফেসবুকে হুবহু ওই মায়ের ছবি প্রচার শুরু করে দেয়। পরে দুই তিনজন যুবক ওই মায়ের কাছে গিয়ে ফেসবুকে লাইভ প্রচার শুরু করেন। এতে দাবি নিয়ে বসা মা হয়তো মামলা করার সুযোগ পেয়েছেন কিন্তু এরইমধ্যে শিক্ষিত সিভিল সোসাইটির বারোটা অ্যাক্টিভিস্টরা বাজিয়ে দিয়েছেন। এতে থেমে থাকেনি সাংবাদিকরাও। কয়েকজন সাংবাদিকও একই কায়দায় প্রচারে নেমেছেন।

আবার জাতীয় দাবিদার কয়েকটি সংবাদপত্র ওই মায়ের ছবিসহ পরিচয় প্রকাশ করে খবর ছেপেছেন। পোর্টালে আপলোড করেছেন। যাকে এভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তার ভবিষ্যত কি? তার সামাজিক অবস্থান কি হবে? তাকে সমাজের চোখে হেয় করার কোন অধিকার অ্যাক্টিভিস্টদের আছে? সত্য ঘটনা বলে সব ঘটনার বিবরণ গণমাধ্যমে প্রচার করা যায়?

নারী শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ১৪ ধারার বিধান মতে গণমাধ্যমে এমন প্রচারের শাস্তি দুই বছর কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড।

গত ১১ অক্টোবর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের জয়নাতলী গ্রামে ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় রোববার বিকালে শ্রীপুর থানায় ধর্ষণের অভিযোগে ধর্ষণের শিকার কিশোরীর মা মামলা দায়ের করেন।

অভিযুক্তরা হলো: একই গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের সন্তান রফিকুল ইসলাম (৫০), মানিক মিয়ার সন্তান আশু এবং আশুর সন্তান জোবাইল।

মামলার বিবরণে জানা যায়, গত ১০ অক্টোবর ওই কিশোরীর মা ব্যক্তিগত কাজে ঢাকা যান। ওই দিন তিনি ঢাকা থেকে ফিরতে পারেননি। এ সুযোগে পরদিন ১১ অক্টোবর সকাল ছয়টায় পাশের বাড়ির অভিযুক্ত রফিকুল ইসলাম, আশু এবং জোবাইল তার কিশোরী মেয়েকে রফিকুল ইসলামের বসতবাড়ির পশ্চিম ভিটার দক্ষিণ পাশের ঘরে নিয়ে শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়ে নির্যাতন এবং ধর্ষণের চেষ্টা করে। পরে কিশোরী ডাক চিৎকার করলে এ বিষয়ে কাউকে কিছু না বলার জন্য হুমকি দিয়ে বের করে দেয়। ওই দিন সন্ধ্যা সাতটায় আবার একই কায়দায় কিশোরীকে জোর করে একই ঘরে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে। পরে কিশোরী ডাক চিৎকার করলে বাড়ির পাশের জঙ্গলে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করে। এ ব্যাপারে কারও কাছে কিছু বললে তাকে খুন করার হুমকি দেয়। পরে কিশোরী তার এক আত্মীয়কে বিস্তারিত ঘটনা বলে।

১৮ অক্টোবর কিশোরীর মা ঢাকা থেকে ফিরে ঘটনার বিস্তারিত শোনেন। থানায় একটি অভিযোগও দেন। এসআই বেলাল ওই অভিযোগ না রেখে ভিকটিমের মাকে গালিগালাজ করেন। ফলে তিনি থানায় মামলা করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

এসআই বেলাল ওই ঘটনা অস্বীকার করেছেন।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোন্দকার ইমাম হোসেন জানান, ভুক্তভোগী ওই কিশোরীর মায়ের দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে একটি মামলা রুজু হয়েছে।



এই বিভাগের আরও