উপন্যাসে ‌'মুজিব ও তাজউদ্দীন' চরিত্র

যোগফল ডেস্ক

02 Feb, 2020 12:43pm


উপন্যাসে ‌'মুজিব ও তাজউদ্দীন' চরিত্র
শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ

মুজিব বললেন, তাজউদ্দীন, ইয়াহিয়া খান নির্বাচন দিবে, এই রকমই কথা। কিন্তু নির্বাচন যদি না দেয়? দুই নম্বর প্রশ্ন হলো, নির্বাচন দিলে আমরা অবশ্যই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাব, কিন্তু সেটা কি পশ্চিমারা মেনে নেবে? পশ্চিমা পুঁজিপতিরা, আর্মি?

৩২ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাইব্রেরি রুমে একটা কাঠের কাঠামো, বেতের গদিওয়ালা চেয়ারে শেখ মুজিবের সামনাসামনি বসেতাজউদ্দীন বললেন, সেই দুশ্চিন্তা তো আছেই। সকাল দশটার করমচা রোদ পুব-দক্ষিণের জানালা দিয়ে এসে বইয়ের র‌্যাকে পড়েছে, বার্নাড শয়ের একটা হার্ড বাইন্ডিং বইয়ের অতিমসৃণ মলাটে আলো পড়ে তার প্রতিবিম্ব এসে পড়ছে মুজিবের নাকে, গোঁফে।

‘তাজউদ্দীন, আমি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাই। মানিক ভাই বেঁচে থাকলে তিনি দূতিয়ালি করতে পারতেন। মানিক ভাই তো আর নাই। এখন ঢাকায় ইন্ডিয়ান কারো সঙ্গে আমার যোগাযোগ করা অসম্ভব। সারাক্ষণ আমরা গোয়েন্দা নজরদারিতে। আমি এক কাজ করতে চাই। লন্ডন যেতে চাই। লন্ডনে আমি ইন্ডিয়ান কন্টাক্ট বের করে ফেলব।’
‘জি আচ্ছা।’

তাজউদ্দীন উঠলেন। তাঁর শরীরে রোমাঞ্চ হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকে সালাম দিয়ে তিনি ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িটি থেকে বের হলেন। একদল হাঁস বাইরে বেরুনোর জন্য গেটের কাছে অপেক্ষা করছিল। গেট খুলতেই হাঁসের দল তাজউদ্দীনের পা ছুঁয়ে একসাথে কুচকাওয়াজ করতে করতে বেরিয়ে পড়ল।

আকাশে রোদ ছিল। এখন রোদ মরে আসছে। শরৎ কালের আকাশের মন বোঝা ভার। এই হাসছে, এই কাঁদছে।

আবার কি বৃষ্টি আসবে নাকি? তাজউদ্দীন একটা রিকশা খুঁজতে লাগলেন।

রিকশা পাওয়া গেল। তিনি রিকশার পাদানিতে পা রাখলেন। উঠে বসলেন। রিকশা চলছে। তিনি ভাবতে লাগলেন, মুজিব ভাই প্লান বি রেডি করছেন। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে তিনি আঙুল বাঁকা করবেন।

রোদের মধ্যে বৃষ্টি পড়তে লাগল। রিকশাওয়ালা হুড তুলে দিয়েছে। রোদের মধ্যে বৃষ্টির রুপালি ধারা মনে হচ্ছে সিনেমার পর্দায় সম্পাদকের আঁকা কতগুলো খাড়া খাড়া দাগ, যা তারা একটা শটের সঙ্গে আরেকটা শট জোড়া দেবার সময় এঁকে থাকেন। দর্শকেরা পর্দায় কতগুলো আলোর রেখা হঠাৎ করে দেখতে পান। এই বৃষ্টিকে মনে হচ্ছে সেই রকম, আলোর দাগ।

মুজিব ভাই ইন্ডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে চাইছেন। হঠাৎ আলোর ঝলকানি লেগে যেন ঝলমল করে উঠল তাজউদ্দীনের চিত্ত।

হায়দার আকবর খান রনো আর রাশেদ খান মেনন যাচ্ছেন ধানমন্ডির সরোবরের পাশ দিয়ে। ৩২ নম্বর রোডেই রনোরও বাড়ি। বিকালবেলা। শরতের বিকালটি হলদে রোদে তেজপাতার মতো চনমন করছে। পশ্চিম দিকে হেলে পড়া সূর্য লেকের পানিতে তিরতির করে কাঁপছে, আর স্বর্ণাভ করে তুলেছে গাছগাছালির চূড়াগুলোকে।

গল্প করতে করতে দুজনে হেঁটে যাচ্ছেন মীরপুর রোডের দিকে। বাম দিকে শেখ সাহেবের বাড়ি। সারাক্ষণ লোকজনের ভিড় লেগেই থাকে। গাড়িঘোড়াও থাকে বাড়ির সামনের রাস্তায়। আজকে কেন যেন সব ফাঁকা ফাঁকা। কী ব্যাপার? শেখ সাহেব কি বাড়িতে নাই?

রনো আর মেনন গল্প করছেন আর হাঁটছেন।

রনো বললেন, মওলানা সাহেবের মতিগতি তো ঠিক বুঝতে পারছি না। উনি সন্তোষে করবেন ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়, পাঁচবিবিতে হককুল এবাদ মিশন। এগুলো কী?

মেনন বললেন, মওলানা সাহেবের বয়স হয়েছে ৮৮-৮৯। তিনি কমিউনিস্টদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেন। কমিউনিস্টরাও তাঁকে সামনে রেখে এগোয়। এইটাই তো বেশি।

রনো বললেন, অবশ্য কৃষক শ্রমিক সাধারণ মানুষদের জন্য মওলানা সাহেবের দরদটা একেবারেই খাঁটি।
মেনন বললেন, তাতে কোনোই সন্দেহ নাই। তাঁরা এগুচ্ছেন।

রনো বললেন, মওলানা সাহেব কৃষক সম্মেলন করবেন। মার্শাললর মধ্যে কৃষক সমাবেশ করাটা আইন অমান্য করা হবে।
মেনন বললেন, মওলানার কৃষক সমাবেশ তো ওরসের মতো। বড় বড় নৌকায় খিচুরি রান্না হবে। হাজার হাজার মানুষ আসবে।

এই সময় দেখা গেল শেখ সাহেবকে। তিনি পায়জামা আর গেঞ্জি পরে রাস্তার ওপরে দাঁিড়য়ে দু তিনজন তরুণের সঙ্গে কথা বলছেন।

রনো আর মেনন এগিয়ে গেলেন। সালাম দিলেন।

মুজিব সালামের জবাব দিয়ে কর্মীদের সঙ্গে মেনন আর রনোর পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন, ‘এরা আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ওয়ার্কার। খুব কাজের। আর এই দুইজন হলেন ইয়ং লিডার্স ফিউচার লিডার্স।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কর্মীদের তিনি বিদায় দিলেন। দুই বামপন্থী তরুণনেতাকে বললেন, ‘আয় ভিতরে আয়, চা খেয়ে যা।’

তিনি তাঁদের দুজনের হাত ধরে টান দিয়ে ভিতরে নিয়ে গেলেন। ‘আয় কথা আছে। জরুরি কথা!’

তারা দুজন গেটের ভেতরে ঢুকে জিগ্যাসু দৃষ্টিতে মুজিবের দিকে তাকালেন।

শেখ মুজিব বললেন, ‘কীরে? বাংলাদেশ স্বাধীন করবি?’

রনো আর মেনন হঠাৎ করে রাস্তার ধারে এই কথা শুনবেন বলে প্রস্তুত ছিলেন না।

রনো বললেন, ‘আপনি করলে সঙ্গে থাকব।’

মেনন জিগ্যেস করলেন, ‘ইলেকশন কি হবে?’

মুজিব বললেন, ‘এবার আর জেলে যাবার জন্য নয়, জীবন দেবার জন্য রেডি আছি।’

রনোর মনে পড়ল, বছর চারেক আগে, এই লনে তিনি আর শেখ সাহেব দাঁড়িয়ে ছিলেন। শেখসাহেব তাঁর বাড়ির বেলকনির দিকে আঙুল তুলে বলেছিলেন, ‘ওই যে দেখছিস বেলকনি, ওইখানে স্বাধীন বাংলার প্রাথমিক ক্যাবিনেট মিটিং বসবে।’

রনো হেসে জবাব দিয়েছিলেন, ‘মুজিব ভাই, এই রাস্তায় কিন্তু আরো বাড়ি আছে।’

মুজিব ভাই বললেন, ‘জানি জানি। আগে আমি দেশ স্বাধীন করে নিই, তারপর তোদের চান্স!’

ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি বলাবলি করে, শেখ মুজিবের সেই কথা সত্য হয়েছিল। স্বাধীন বাংলার প্রথম ক্যাবিনেটের প্রাথমিক মিটিংগুলো এই বাড়িতেই বসত। সে আরো পরের ঘটনা! শেখ সাহেবকে জেলেও যেতে হবে, জীবনও দিতে হবে, সেও এখনো ভবিষ্যতের গর্ভে। রনো আর মেনন যে কথা দিয়েছিল, আপনি দেশ স্বাধীন করলে আমরা সঙ্গে থাকব, সে-কথাও তাঁরা রেখেছিলেন। পিকিংপন্থী কমিউনিস্টরা নানা গ্রুপে বিভক্ত ছিল, কেউ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, কেউ বা ছিল বিপক্ষে, কেউবা ওই সময়ে শ্রেণীসংগ্রামের চূড়ান্ত রূপ সশস্ত্র বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর ছিল, তবে রনো মেননরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

‘এখানে থেমো না’ আনিসুল হকের উপন্যাস। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১এর মার্চ এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট। ওপরের লেখাটুকু ওই উপন্যাসের অংশ। বইটি চলতি বইমেলা প্রকাশ হচ্ছে।

আনিসুল হক : মাসিক কিশোর আলোর সম্পাদক।


বিভাগ : শিকড়