শ্রীপুর পৌর এলাকার ময়লায় হুমকিতে লাখও মানুষ, প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ

মো. মোজাহিদ

18 Nov, 2020 06:17pm


শ্রীপুর পৌর এলাকার ময়লায় হুমকিতে লাখও মানুষ, প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ
ছবি : সংগৃহীত

গাজীপুর জেলার শ্রীপুর পৌর গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ঘেষে ময়লার ভাগাড়! এ যেনো পুরোনো কথা। হুমকিতে রয়েছে একটি মাদরাসা। দুর্গন্ধের কারণে একটি স্কুল এরমধ্যে বন্ধের উপক্রম হয়েছে। শুধু তাই নয়, এক সময়ের লবলং খাল এখন নালায় পরিণত হয়েছে।

এই ময়লাগুলো কোথা থেকে আসছে প্রতিনিয়ত? কার নির্দেশে ময়লা ফেলা হচ্ছে? কেন-ই বা মহাসড়ক সংলগ্ন ময়লাগুলো ফেলছে? আর কতদিন এরকম চলবে? এই প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট উত্তর অবশ্য রয়েছে।

যোগফলের সংক্ষিপ্ত অনুসন্ধানে এসব প্রশ্নের উত্তর বের করার চেষ্টা করা হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, পৌরসভার নির্ধারিত ময়লা ফেলার জায়গা না থাকায় শ্রমিক নিয়োগ করে কল-কারখানা, বাসাবাড়ি, বাজার ও হাসপাতালের জমানো ময়লা মহাসড়ক ঘেষে ফেলা হচ্ছে। 

এতে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন গাজীপুর জেলার শ্রীপুর পৌর (গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী) বেতঝুড়ী এলাকার সকল বাসিন্দারা। দুর্গন্ধের কারণে পথচারীদেরও অভিযোগের নেই। প্রতিনিয়ত নাকমুখ চেপে ধরে অফিসে যাতায়াত করতে হচ্ছে প্রায় ২০টি কারখানার লাখও মানুষের। 

এরমধ্যে গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী এলাকার একটি স্কুল পুরোপুরি বন্ধের উপক্রম হয়েছে। স্কুল সংলগ্ন ময়লাগুলো ফেলা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ওই স্কুলের নাম আব্দুল হাই মডেল একাডেমি। স্কুলটির পরিচালক শফিকুল ইসলাম যোগফলকে জানিয়েছেন, এখন তো করোনার কারণে স্কুল এমনিতেই বন্ধ। ২০১০ সাল থেকে এই স্কুলের শিক্ষা  কার্যক্রম শুরু হয়েছে। স্কুল খোলা থাকাকালীন সময়ে গত তিন বছর যাবত ময়লার দুর্গন্ধের কারণে শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো ক্লাস করতে পারতো না। ময়লার দুর্গন্ধের কারণে কিছুকিছু শিক্ষার্থীরা ক্লাসের সময় বমি করে দিতো। তারা ক্লাস বর্জন করতো। ক্লাস থেকে চলে যেতে বাধ্য হতো। ৪০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ১৯০ জন আছে, অর্ধেকের বেশিই চলে গেছে, তাই পাঠদান কার্যক্রম বন্ধের উপক্রম হয়েছে। 

হুমকির মুখে পড়া মহাসড়ক কেন্দ্রিক একটি মাদরাসার নাম 'তা'লিমুস সুন্নাহ্ আল-ইসলামিয়া মাদরাসা'। এই মাদরাসা পরিচালক মুফতি এনামুল হাসান যোগফলকে জানিয়েছেন, এই মাদরাসায় মোট ২২৫ শিক্ষার্থী রয়েছে। নিয়মিত উপস্থিতি রয়েছে ১৯০ জন শিক্ষার্থী। দুর্গন্ধের কারণে অনুপস্থিত থাকে অনেকেই। এছাড়াও প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি  হতে এসে পরিবেশ দুষণ ও মারাত্মক দুর্গন্ধের কারণে চলে গেছে।

মাদরাসার পাশেই এই ময়লার ভাগাড়ের কারণে রাতে মশা ও দিনের বেলায় মাছির উপদ্রব খুবই বেশি। শুধু তাই নয়, কারখানার বিষাক্ত পানি ও ময়লার কারণে লবলং খাল এখন ধ্বংসের মুখে। আশেপাশের আবাদি জমিতেও বর্তমানে কৃষিজ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা পরিবেশ অধিদপ্তর, শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা, শ্রীপুর পৌর মেয়র ও জেলা প্রশাসক বরাবর এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনও সুরাহা পাইনি। এসব আবেদনের কপি যোগফল মর্গে রয়েছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল শ্রীপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম যোগফলকে জানিয়েছেন, পরিবেশ দূষণে একটি মাদরাসার পাঠদান কার্যক্রম ও একটি স্কুল বন্ধের উপক্রম হয়েছে। আমরা বিভিন্ন সময় আন্দোলন ও মানববন্ধন করে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ জানিয়েছি। এখন পর্যন্ত কোনও প্রতিকার পাইনি।

শুধু পরিবেশ দুষণ হচ্ছে ব্যাপারটা তেমন নয়, এক সময়ের লবলং সাগর খালে পরিণত হয়েছে। পানি বিষাক্ত হয়েছে। বর্তমানে খালটিও একটি দূষিত নালায় পরিণত হয়েছে। ময়লা ফেলার কারণে খালের গতিপথও পরিবর্তন হয়ে গেছে।

শ্রীপুর পৌরসভার বাসা-বাড়ি, হাসপাতাল ও বিভিন্ন কল-কারখানার এসব বর্জ্য লবলং খালের উপর ফেলার কারণে খালটি অচিরেই তার অস্তিত্ব হারাবে। সেইসাথে আশেপাশের কারখানার প্রায় লাখও শ্রমিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে। এরমধ্যেই দুই পাশের শতাধিক একর জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে গেছে। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য লবলং খালের উপরে ও মহাসড়কের পাশে ময়লা ফেলা বন্ধ করতে হবে। ময়লা ফেলার জন্য পৌরসভার নির্ধারিত জায়গা প্রস্তুত করে সেখানে ফেলতে হবে।

ময়লা ফেলার জন্য নিয়োগ করা শ্রমিক সুমন মিয়া, হাশেম ও আজিজুল হক জানিয়েছেন, শ্রীপুর পৌর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জিলাল উদ্দিন দুলালের নির্দেশে আমরা এখানে ময়লা ফেলছি প্রায় তিন বছর যাবত। আমরা কর্মচারি। আমাদের ঠিকাদারের নির্দেশে বেতনভুক্ত হয়ে পৌর এলাকার মাধখলা, নতুনবাজার, পুরানবাজার, গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ীর পশ্চিম ও পূর্ব এলাকা থেকে ময়লাগুলো এখানে ফেলছি। 

পৌর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জিলাল উদ্দিন দুলালের নিয়োগ করা ঠিকাদার রফিকুল ইসলাম যোগফলকে জানিয়েছেন, আমি কমিশনারের নির্দেশে এখানে আমার নিয়োগ করা শ্রমিক দিয়ে ময়লা ফেলছি। পৌর মেয়রের নির্দেশ মোতাবেক তিনি আমাকে ময়লা ফেলার চুক্তি দিয়েছেন। ৫ নম্বর ওয়ার্ডে আরও দুইজন ঠিকাদার রয়েছে। তাদের নাম রতন ও হেলাল। তারাও এখানেই ময়লা ফেলছে। পৌরসভার নির্ধারিত ময়লা ফেলার জন্য জায়গার ব্যাপারে কাজ চলছে। 

এ ব্যাপারে পৌর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জিলাল উদ্দিন দুলাল যোগফলকে জানিয়েছেন, আমরা উপজেলার পটকা গ্রামে পৌরসভার ময়লা ফেলার জন্য তিন বিঘা জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই জমির দলিল নম্বর ১১ হাজার ৩০০। আমরা ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ওই পৌরসভার ময়লা ফেলার নির্ধারিত জায়গা ব্যবহার করতে পারবো।

বুধবার [১৮ নভেম্বর ২০২০] দুপুরে এ ব্যাপারে শ্রীপুর পৌরসভার মেয়র আনিসুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলে বন্ধ পাওয়া যায়। পরে বিকালে একাধিকবার ফোন করলে, তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এরপর মেসেজ পাঠালেও তিনি কোনও উত্তর দেননি।


বিভাগ : তালাশ


এই বিভাগের আরও