‘পট্টি মেরে’ বন মামলার আসামি বদলে ফেলেন বিট কর্মকর্তা আয়ুব আলী

যোগফল প্রতিবেদক

21 Nov, 2020 11:51am


‘পট্টি মেরে’ বন মামলার আসামি বদলে ফেলেন বিট কর্মকর্তা আয়ুব আলী
আয়ুব আলী

নিরীহদের বিরুদ্ধে বন মামলা দায়েরের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। চিহ্নিত বন দালালদের প্ররোচনায় আসামির নাম অন্তর্ভুক্তির ঘটনাও নতুন কিছু নয়। তবে এসব অনিয়ম ছাপিয়ে সম্প্রতি একটি বন  মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ভয়ানক জালিয়াতি সংগঠিত হয়েছে। একটি বন অপরাধের ঘটনায় মামলা দায়েরের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেও ওই মামলায় ভিন্ন ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। সরকারি অপরাধ বিবরণী রেজিস্টারে আসামিদের নাম ও জব্দ তালিকা পরিবর্তন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়। বিট কর্মকর্তার কাছে থাকা সরকারি নোট বুকে (টিএম) জোড়াতালি দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বন বিভাগের অধীন গাজীপুর জেলার রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিটে এই ভয়ানক জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। 


গত ৫ মার্চ সকাল আটটায় গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিটের বনাঞ্চলে টহল দায়িত্বে যান রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিট কর্মকর্তা মো. আয়ুব আলী শেখ, বন প্রহরী ইমান আলী, মো. শাহ জালাল মিয়া ও মো. মেহেদুল ইসলাম। এ সময় তারা ৪৯ নম্বর কাপিলাতলী মৌজার গেজেটভুক্ত ৭ নম্বর সিএস দাগে ১০-১২ জন ব্যক্তিকে বনে ইটের সলিং রাস্তা নির্মাণ করতে দেখেন। পরে টহল দলের সদস্যদের দেখে আসামিরা পালিয়ে যায়।

এই ঘটনার পর রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিট কর্মকর্তা মো. আয়ুব আলী শেখ বাদি হয়ে ‘সরকারি গেজেট বিজ্ঞপ্তিত বনভূমিতে বে-আইনিভাবে প্রবেশ করে আকাশমণি গাছ ও গজারী ছাটি কপিচ কর্তন করে ইটের সড়ক নির্মাণ অপরাধে’ একটি বন মামলার (মামলা নম্বর ০৯/রাজ পূর্ব /২০১৯-২০২০) এজাহার তৈরি করেন। মামলার আসামিরা হলেন: আশরাফুল আলম, জাকির ও হেলাল নামের তিন ব্যক্তি। মামলায় সাক্ষি করা হয় টহল দলের ওই তিন বন প্রহরীকে। 

বিট কর্মকর্তা মো. আয়ুব আলী শেখের নিজ হাতে লেখা ওই মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, আসামিরা এক ফুট ৪ ইঞ্চি বেড়ের তিনটি আকাশমণি গাছ ও এক বোঝা গাজারী ছাটি কপিচ কর্তন করেছে। আসামিরা ১২ ফুট চওড়া ও ১০০ ফুট দৈর্ঘ্যরে ইটের রাস্তা তৈরি করেছে। ঘটনাস্থল থেকে ৫০০ পিস ইট, তিনটি আকাশমণি গাছের বল্লী, এক বোঝা গজারী ছাটি কপিচ, একটি গাইতী, দা ও করাত জব্দ করে জব্দ তালিকা তৈরি করা হয়েছে। জব্দ করা মাল নোট বইয়ের ৫৮/২৬৪৯ এ লিখে সাক্ষিদের স্বাক্ষর নিয়ে অফিস হেফাজতে নেওয়া হয়।


অনুসন্ধান বলছে, সরকারি নোট বুকে ঘটনা লিপিবদ্ধ করে বন মামলার এজাহার প্রস্তুত করেন মো. আয়ুব আলী শেখ। পরে তিনি বিট অফিসের অপরাধ বিবরণী রেজিস্টারে মামলা নম্বর, তারিখ, রেঞ্জের নাম, অপরাধের ধরন ও বন আইনের ধারা, আসামির নাম ও ঠিকানা, অপরাধ উৎঘাটনকারীর নাম ও ঠিকানা, জব্দ করা মাল ও বনজদ্রব্যের বিবরণসহ প্রয়োজনীয় তথ্য লিপিবদ্ধ করেন। পরে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়ে ১২০ নম্বর পত্রযোগে ১৫ মার্চ মামলার এজাহারসহ প্রয়োজনীয় নথি পাঠানো হয় রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে। বিটের অপরাধ বিবরণী রেজিস্টারের পাশাপাশি রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ের অপরাধ বিবরণী রেজিস্টারেও মামলাটির যাবতীয় তথ্য লেখা হয়। অথচ পরে ওই মামলাটির এজাহার বাতিল করে এবং আসামিদের নাম পরিবর্তন করে একই মামলা নম্বরে ভিন্ন আর একটি বন মামলা দায়ের হয়েছে গাজীপুর বন আদালতে। মামলা নম্বর একই রয়েছে। কেবল আসামিদের নামের বদল হয়েছে। জোড়াতালি দিয়ে অপরাধের ধরন বদলানো হয়েছে।

গাজীপুর বন আদালতে জালিয়াতি করে দায়ের করা মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ মার্চ সকাল দশটায় ওই একই টহল দল ৪৯ নম্বর কাপিলাতলী মৌজার ৯ নম্বর সিএস দাগে ১০-১২ ব্যক্তিকে করই ও গজারী ছাটি কপিচ কেটে পাকা দালান নির্মাণ করতে দেখে। গাজীপুর বন আদালতে দায়ের করা ওই মামলার আসামিরা হলেন, মো. কামাল মিস্ত্রী, আকলিমা, কামরুনাহার, কিবরিয়া, কামাল উদ্দিন ও রোকন। 

অনুসন্ধান আরও বলছে, জালিয়াতি করে গাজীপুর বন আদালতে দায়ের করা মামলা এবং বাতিল করা মামলার নম্বর একই। পত্র তারিখ একই। নোট বইয়ের পৃষ্ঠা নম্বরও একই। বিটের অপরাধ বিবরণী রেজিস্টারে বাতিল করা মামলার আসামিদের নাম পরিবর্তন করতে সাদা কাগজের তালি দিয়ে তার ওপর নতুন মামলার আসামিদের নাম লেখা হয়েছে। একই কায়দায় রেজিস্টারে জব্দ তালিকার কলামে সাদা কাগজের তালি দিয়ে জব্দ তালিকা পরিবর্তন করা হয়েছে। অথচ রেজিস্টারের লিপিবদ্ধ হওয়া অন্য তথ্যগুলো বাতিল করা মামলার। ওই তথ্যগুলোর সঙ্গে গাজীপুর বন আদালতে দায়ের করা মামলার এজাহারের কোন মিল নেই।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ ইউছুপ জানান, তিনি এ ধরনের জালিয়াতির খবর জানেন না। প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গাজীপুর বন আদালতে দায়ের বন মামলার (মামলা নম্বর ৯/রাজ পূর্ব, ২০১৯-২০২০) একজন সাক্ষি জানান, গত ৫ মার্চ ২০২০, সকাল আটটায় টহলের সময় তিনিসহ তার টহল সঙ্গীরা ৪৯ নম্বর কাপিলাতলী মৌজায় বনে ইটের সলিং রাস্তা নির্মাণ করতে দেখেন। ঘটনাস্থল থেকে মাল জব্দ করে সরকারি নোট বইয়ে জব্দ মালের বিবরণ লেখেন বিট কর্মকর্তা। পরে তিনিসহ অন্য তিন বন প্রহরী নোট বইয়ে সাক্ষি হিসেবে স্বাক্ষর করেন। তবে পরে তিনি জানতে পারেন, ‘ওই মামলাটি দায়ের না করে বনে বাড়ী নির্মাণ ও গাছ কর্তনের অপরাধে ভিন্ন আর একটি মামলা দায়ের হয়েছে। অথচ নতুন মামলাটির বিষয়ে তিনি জানেন না। বন মামলার এজাহারে সাক্ষিদের স্বাক্ষর দেওয়ার সুযোগ না থাকায় এজাহারে কি লেখা হয়েছে তা সাক্ষিদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। এ ছাড়া রেজিস্টার ও নোট বুক বিট কর্মকর্তা কাউকে দেখতে দেন না। তিনি সেগুলো আলমারিতে তালা দিয়ে রাখেন।’

এ ব্যাপারে রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিট কর্মকর্তা মো. আয়ুব আলী শেখের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনার সাথে দেখা করবো। দেখা করে পরে বিস্তারিত বলবো।  সাক্ষাতে বিস্তারিত বলবো।

রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা ফরেস্টার মো. হারুন-অর-রশিদ খানের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি কোনও বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, যে কোন কথা বললেই পত্রিকায় লিখে দিবেন। এই কারণে কোন কথা বলব না।

বন মামলায় ওয়ারেন্ট তামিল করা ছাড়া পুলিশ ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কোন কাজ থাকে না। ফলে তাদের কেউ কথা বলতে রাজি না হলেও একজন পুলিশ কর্মকর্তা যোগফলকে জানিয়েছেন, মামলার রেকর্ড বদলে ফেলা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।


বিভাগ : তালাশ


এই বিভাগের আরও