শ্রীপুরে টাকার লোভে বাল্যবিয়ে করায় কাজি ‘নজরুল-শহিদুল’

মো. মোজাহিদ

22 Nov, 2020 06:58pm


শ্রীপুরে টাকার লোভে বাল্যবিয়ে করায় কাজি ‘নজরুল-শহিদুল’
শহিদুল

শহিদুল ইসলাম (৪০) সহকারী কাজি হিসাবে পরিচয় দেন। ‘সহকারি কাজি’ নামে কোন কাজির অস্তিত্ব নেই। গাজীপুর জেলার শ্রীপুর পৌর এলাকার মাওনা চৌরাস্তার কাজি মো. নজরুল ইসলামের ভলিয়ুমে মোটা অঙ্কের টাকা পেলেই বাল্যবিয়ে করান তিনি। 

শনিবার [২১ নভেম্বর ২০২০] রাত বারোটায় শ্রীপুর পৌর এলাকার কেওয়া পশ্চিম খন্ড [চন্নাপাড়া ৮ নম্বর ওয়ার্ড] গ্রামের মৃত আব্দুল আউয়ালের সন্তান  মোস্তফা কামালের বাড়িতে একটি বিয়ে করান শহিদুল।

ওই বিয়ের বর শ্রীপুর পৌর এলাকার চন্নাপাড়া গ্রামের উজ্জ্বল মিয়ার সন্তান ফাহিম (১৮)। কনে মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর থানার বাহাদুরপুর গ্রামের মনসুর আলীর সন্তান (১৩)। 

তাদের বিয়ে করানো শহিদুল ইসলাম শ্রীপুর পৌর এলাকার কেওয়া পশ্চিম খন্ড (বেপারীপাড়া) গ্রামের মান্নান ব্যাপারী সন্তান। 

যেভাবে বাল্যবিয়েটি ধরা পড়ে: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যক্তি প্রতিবেদককে ওই বাল্যবিয়ের তথ্যটি ফোন করে জানায়। পরে প্রতিবেদকসহ মোট তিনজন ওই বাড়িতে শহিদুল এবং উভয় পক্ষের ব্যক্তিদের দেখতে পায়। তাদের কাছে বিয়ের কাজ শেষ হয়েছে কি না জানতে চাইলে, তারা বলেন বিয়ে পড়ানোর কাজ শেষ হয়েছে। 

তখন শহিদুলর কাছে মোট দুইটা (বিয়ে রেজিস্ট্রি) ভলিয়ুম ও একটি টালি খাতা পাওয়া যায়। এগুলো রেখেই চলে যান তিনি। ঘটনাস্থলে কনের মোট দুইটি জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি আসল ও একটি নকল। 

তখন কনের কাছে বিয়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কিছুক্ষণ আগেই বিয়ের কাজ শেষ করেন ওই কাজি (শহিদুল ইসলাম)। তখন তার বয়স জানতে চাইলে ওই কিশোরী জানান, আমার জন্ম ২০০৭ সালে। আমি শ্রীপুর পৌর এলাকার শতদল একাডেমির অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

ওই সময় বর ও কনে পক্ষের অভিভাবকদের তাৎক্ষণিকভাবে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই ব্যাপারে স্থানীয় একজন সাংবাদিক ঘটনাটি চাপা দিতে প্রতিবেদককে নানা কৌশলে চেষ্টা চালান।

ঘটনার বর্ণনায় আইনজীবী কাজি মাজেদুল আলম যোগফলকে জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা অপরিহার্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই এলাকার এক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, শহিদুল দীর্ঘদিন যাবৎ অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে শিশু বিবাহ করিয়ে আসছে, এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখুন, এমন আরও বহু প্রমাণ পাবেন। অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে অষ্টম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীকে বিয়ে পড়িয়েছে সে, তার শাস্তি হওয়া উচিত। 

এ ব্যাপারে শহিদুল ইসলাম যোগফলকে জানিয়েছেন, আমি বিয়ে পড়াতে গিয়েছিলাম কিন্তু মেয়ের বয়স অনেক কম হওয়ায় বিয়েটি পড়াইনি। এরপর আমি চলে আসছি। আপনার হাতের লেখা অস্বীকার করতে পারবেন? মেয়ে ও প্রতক্ষদর্শীরা বলছে আপনি বিয়ে পড়াইছেন, এই বক্তব্য আপনি অস্বীকার করতে পারবেন? এসব প্রশ্নের কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। যোগফল মর্গে শহিদুলের হাতের লেখা টালি খাতার বর্ননা রয়েছে। কিন্তু কনে শিশু হওয়ায় তার নাম পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

এ ব্যাপারে কাজি মো. নজরুল ইসলাম যোগফলকে জানিয়েছেন, শহিদুল ইসলামসহ আমার মোট তিনজন সহকারী রয়েছে। বাল্যবিয়ে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি কিছুক্ষণ আগে শুনছি বিষয়টা। আরও ভালোভাবে জেনে আপনাকে জানাবো। তার নিবন্ধন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার মনে নেই। পরে জানাবো।

এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ম্যারেজ রেজিস্ট্রার যোগফলকে জানিয়েছেন, নিয়োগ পাওয়া কাজি ছাড়া কেউ বিয়ে রেজিস্ট্রি করতে পারে না। যদি কেউ ভলিয়ুম অন্য কারও হাতে তুলে দেয়, তা হলে সব দায় তার।

এ ব্যাপারে 'শ্রীপুর উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ' কমিটির সদস্য সাঈদ চৌধুরী যোগফলকে জানিয়েছেন, 'রাষ্ট্র যেখানে বারবার বলছে যে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হবে, যারা আসলে এই সমস্ত কাজ করছে তার তো রাষ্ট্রের নির্দেশটা জানে। জেনেশুনেই যেহেতু কাজটা করেছে তার মানে রাষ্ট্রের নির্দেশ অমান্য করেছে, এটা আসলে গর্হিত অপরাধ। আমরা যেটা করতে পারি, বাল্যবিবাহ আমাদের প্রটেক্ট (প্রতিরোধ) করতে হবে। অভিভাবকদের শতভাগ সচেতনতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। যারা বাল্যবিয়ের সময় উপস্থিত ছিলেন, এবং যে বিবাহের কাজ সম্পন্ন করছে তারা সবাই সমানভাবে দোষী। সে কেন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত মানলো না? ইউএনও মহোদয়ের (উপজেলা প্রশাসন) কাছে আমার দাবি থাকবে যে, এই বিষয়টা অন্তত তার কাছ থেকে [সহকারী কাজি শহিদুল ইসলাম] ক্লিয়ার হওয়া যে, কেন সে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত মানছে না? এবং তার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি জানাচ্ছি। 

বাল্যবিয়ের ঘটনা জানানোর জন্য  শনিবার রাতে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা তাসলিমা মোস্তারীর সরকারি নম্বরে ফোন করলে তিনি রিসিভ করেননি। রোববার [২২ নভেম্বর ২০২০] বিকালে তিনি এ ব্যাপারে জানিয়েছেন, 'আপনি তথ্য দিন, অবশ্যই অ্যাকশনে যাবো'।

স্মরণীয়: এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওই এলাকার জুয়েল নামের এক শিক্ষককে নানানরকম ভাবে হুমকি দিচ্ছে শহিদুল। প্রতিবেদককে ফোন করে ভুক্তভোগী জুয়েল মাস্টার এই তথ্য জানিয়েছেন।


বিভাগ : তালাশ


এই বিভাগের আরও