বিমার টকা তুলতে ঘুস দাবি করেন সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের কর্মকর্তারা

যোগফল রিপোর্ট

27 Jan, 2021 06:50pm


বিমার টকা তুলতে ঘুস দাবি করেন সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের কর্মকর্তারা
ছবি প্রতীকী

বিমার মেয়াদ শেষে টাকা তুলতে গেলে ঘুস দাবি করেন সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের কর্মকর্তারা। গ্রাহক হয়রানির এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনাসহ আরও ছয়টি অনিয়ম উঠে এসেছে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র তদন্তে। এসব অনিয়ম দূর করতে পাঁচটি সুপারিশও করেছে তদন্ত দল। গত ১৭ জানুয়ারি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। 

তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, রংপুর অঞ্চলে গ্রাহকদের বিমা দাবি পরিশোধে প্রতিটি চেক ইসুর জন্য এক হাজার টাকা ঘুস নিতেন সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের রংপুর জোনাল অফিসের কর্মকর্তারা। ভুক্তভোগী গ্রাহকদের সাথে কথা বলে এর সত্যতা পেয়েছে আইডিআরএ’র তদন্ত দল। জোনাল অফিসটির ইনচার্জ মালেক শাহী ও অবলিখন কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম এই ঘুস দাবি করতেন।

সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাত অনিয়ম:

প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, তদন্তে উঠে আসা সানলাইফের অনিয়মগুলো হলো: দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামোয় বিমা আইন ২০১০ এর বিধান মতে কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনা না করা। বিমা আইন ২০১০ এর ৬২ ধারা এবং লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণী বিধিমালা, ২০২০ লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়।

লাইফ ফান্ড বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিমা আইন ২০১০ এর ৪১ ধারা এবং লাইফ বিমাকারীর সম্পদ বিনিয়োগ প্রবিধানমালা, ২০১৯ মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। শাখা অফিসগুলো বন্ধ করার বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’কে না জানানো এবং অনুমোদন গ্রহণ করার বিধান লঙ্ঘন।

বিমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে বিমা আইন ২০১০ এর ৭২ ধারার বিধান সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং গ্রাহকদের ক্ষতিগ্রস্ত করা। বিমা গ্রাহকদের চেক প্রদান করে সে চেক পাস না করে নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্ট ১৮৮১ লঙ্ঘন। বিমা গ্রাহকদের পাওনা টাকা পরিশোধে কোম্পানির জোনাল অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্বারা নির্বাহি রশিদ ও চেক পাশ করার নামে উৎকোচ বা ঘুস গ্রহণ।

অনিয়ম দূর করতে তদন্ত কমিটির পাঁচ সুপারিশ:

সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির অনিয়মগুলো দূর করতে পাঁচটি সুপারিশ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত কমিটি। 

সেগুলো হলো: উত্থাপিত দাবির মধ্যে দুইটি মৃত্যুদাবির টাকা ও এর আগে ইসু করা ২২০টি চেকের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট পলিসি গ্রাহকদের ২০ জানুয়ারি, ২০২১ তারিখের মধ্যে এবং উত্থাপিত অবশিষ্ট ৫৫৮টি পলিসি গ্রাহকের সমস্ত দাবির টাকা বিমা আইন ২০১০ এর ৭২ ধারার বিধান অনুসারে সুদসহ আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ তারিখের মধ্যে পরিশোধ করার নির্দেশনা প্রদান।

কোম্পানির শাখা অফিসগুলো বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে বন্ধ করার বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করার জন্য সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে নির্দেশনা প্রদান।

মাঠ পর্যায়ে কোম্পানির জোনাল অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্বারা নির্বাহি রশিদ ও চেক পাশ করার নামে উৎকোচ নেওয়ার মৌখিক অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সকে নির্দেশনা প্রদান।

ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের বিষয়ে বিমা আইন ২০১০ এর ৬২ ধারা ও লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা নির্ধারণী বিধিমালা ২০২০, লাইফ ফান্ড বিনিয়োগের বিষয়ে বিমা আইন, ২০১০ এর ৪১ ধারা ও লাইফ বিমাকারীর সম্পদ বিনিয়োগ প্রবিধানমালা, ২০১৯ এবং বিমা দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিমা আইন ২০১০ এর ৭২ ধারার বিধান যথাযথভাবে পালন না করায় সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সকে সতর্ক করার পাশাপাশি কারণ দর্শানোর জন্য নির্দেশ প্রদান।

ভবিষ্যতে যেন বিমা দাবি সংক্রান্ত কোন অভিযোগ উত্থাপিত না হয় সে দিকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি এ বিষয়ে পুনরাবৃত্তি ঘটলে বিমা আইন, ২০১০ এর বিধান মতে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে মর্মে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সকে সতর্ক করা।

যে কারণে সানলাইফের তদন্তে আইডিআরএ:

মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ৭ বছরেও বিমা গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ না করায় সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ অভিযোগ করেন কোম্পানিটির রংপুর বিভাগের ব্লক কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা। ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৪ জুলাই আইডিআরএ’কে বিষয়টি তদন্ত করে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন পাঠাতে বলে দুর্নীতি দমন কমিশন।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গ্রাহক স্বার্থ রক্ষায় বিমা আইন ৪৮ ধারা অনুসারে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয় আইডিআরএ। তদন্ত পরিচালনার জন্য গত ১২ অক্টোবর দুই সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে কর্তৃপক্ষ। কমিটির সদস্যরা হলেন কর্তৃপক্ষের পরিচালক (লাইফ) মো. শাহ আলম ও জুনিয়র অফিসার মুহাম্মদ শামছুল আলম। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে সুস্পষ্ট মতসহ পরের ১৫ দিনের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়।

অভিযোগের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের জবানবন্দি গ্রহণসহ সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রধান কার্যালয় ও রংপুর জোনাল শাখা পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পর্যালোচনা করে তদন্ত কমিটি। প্রাথমিকভাবে তদন্তে বিমা কোম্পানিটির সাতটি অনিয়ম উঠে আসে।

সানলাইফের বিরুদ্ধে অভিযোগে যা রয়েছে:

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির গণমুখী বিমা প্রকল্পের ৭৮০টি বিমা পলিসির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে। নিয়ম অনুসারে মেয়াদ উত্তীর্ণের ৯০ দিনের মধ্যে বিমার টাকা পরিশোধ করার কথা। অথচ কোম্পানিটি দীর্ঘ ৭ বছরেও অনেক বিমা পলিসির টাকা পরিশোধ করেনি। এসব গ্রাহকের পাওনার পরিমাণ ৯৩ লাখ ২৮ হাজার ৮০৩ টাকা।

তবে গ্রাহকদের চাপের মুখে এবং কোম্পানিটির স্থানীয় কর্মকর্তাদের অনুরোধে দীর্ঘ দিন পর রংপুর ইসলামী ব্যাংক শাখায় ৫৬৩ বিমা গ্রাহকের নামে ৯৩ লাখ ২৮ হাজার ৮০৩ টাকার চেক ইসু করেন সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বিমা গ্রাহকরা বিভিন্ন ব্যাংকে হিসাব খুলে বারবার যোগাযোগ করেও ব্যাংকটি থেকে কোন অর্থ তুলতে পারেনি। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এসব গ্রাহক।

এ অবস্থায় ভুক্তভোগী এসব বিমা গ্রাহক সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের স্থানীয় কর্মকর্তাদের ওপর চড়াও হতে থাকেন। মানসিকভাবে এবং শারীরিকভাবে নির্যাতন ও অপমানের শিকার হন কোম্পানিটির রংপুর বিভাগের মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে এসব কর্মকর্তার অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। এতো কিছুর পরও অদ্যাবধি বিমার টাকা পরিশোধ করেনি সানলাইফ ইন্সুরেন্স।

সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: অভিযোগ ও তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চেয়ারম্যান প্রফেসর রুবিনা হামিদের সঙ্গে ইন্স্যুরেন্সনিউজবিডি’র পক্ষ থেকে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়, তবে তিনি কল রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কোম্পানিটির মূখ্য নির্বাহি কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়, তবে তিনিও কল রিসিভ করেননি। কথা বলার বিষয় উল্লেখ করে এসএমএস পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।