‘মসজিদ-মাদরাসা ভাঙার অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য ও ভিত্তিহীন’

যোগফল ডেস্ক

21 Feb, 2021 11:17am


‘মসজিদ-মাদরাসা ভাঙার অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য ও ভিত্তিহীন’
ছবি : সংগৃহীত

‘আমার বিরুদ্ধে মসজিদ-মাদরাসা ভাঙার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলো  সম্পূর্ণ অসত্য ও ভিত্তিহীন। এসব অভিযোগের কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। কোনো মসজিদ ভাঙার সিদ্ধান্ত নেইনি। বরং সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে মসজিদ নির্মাণ করে দিয়েছি। আরও একটি নির্মাণের প্রক্রিয়া চলমান। নারয়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান উসকানি দিয়ে আমার বিরুদ্ধে অহেতুক এসব অভিযোগ তুলেছেন, আন্দোলন করাচ্ছেন।’

শনিবার কথাগুলো বলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডাক্তার সেলিনা হায়াৎ আইভী।

তা হলে অভিযোগগুলো আসছে কেন?, তিনি বলেন, ‘যারা এই অভিযোগ করছেন, অভিযোগগুলো আসলেই তাদের কি না, সেটা আমারও জানার বিষয়। প্রথম অভিযোগের বিষয়টি উঠেছে ১০ বছরেরও বেশি সময় আগে নির্মিত শহরের কবরস্থান রোডের একটি মসজিদ ও মাদরাসা নিয়ে। রোডস অ্যান্ড হাইয়ের জায়গায় সেগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। যখন পৌরসভা ছিল, তখন আমরা জনগণের সহযোগিতায় কবরস্থানের মসজিদটা নির্মাণ করে দেই ২০১০ সালে। পরে ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী তা উদ্বোধন করেন। এ নিয়ে মাদরাসাটির মালিক ও কমিটির সভাপতি নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী শোভন গার্মেন্টসের মালিক সিদ্দিকসহ কমিটির সঙ্গে বৈঠক করলে তারা জানায়, মাদরাসার জন্যে তারা অন্যত্র জায়গা কিনেছেন। যেহেতু মাদরাসাটি বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত, তাই তারা নতুন স্থানে মাদরাসা সরিয়ে নেবে। তারা এখন পর্যন্ত এ নিয়ে একটা কথাও বলেনি। আমরাই কবরস্থান রোডের পাঁচতলা এই মসজিদটা নির্মাণ করে দিয়েছিলাম।’

‘দ্বিতীয়ত, অভিযোগ করা হচ্ছে, শহরের চাষাঢ়ার বাগে-জান্নাত মসজিদ নাকি ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেখানেও একটি মসজিদ ও একটি মাদরাসা আছে। মসজিদটি পৌরসভার ১৭ শতাংশ জায়গার ওপর নির্মিত। ১৯৮৫ বা ৮৬ সালে একজন সাবেক কাউন্সিলর মসজিদের জন্য ছয় শতাংশ জায়গা বরাদ্দ চেয়েছিলেন। পরে মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠানোর পরে আর কোনো জবাব আসেনি। ২০০৩ সালে আমি পৌরসভার দায়িত্ব নিলে তখন আবার মসজিদটির জন্যে জায়গার দাবি আসে। তখন বলেছি, ১০ শতাংশ জায়গা নিয়ে আমরা মসজিদটি করে দেবো। কিন্তু, বিভিন্ন কারণে তখন আর করা হয়নি। পরে সিটি করপোরেশন হওয়ার পরে ২০১৩ বা ২০১৪ সালে আবার মসজিদ কমিটির সঙ্গে বৈঠক করলে তারা মসজিদটি করে দিতে বলে। পরে এ নিয়ে মাদরাসা কমিটির সেক্রেটারি প্রাইম গার্মেন্টসের মালিক আবু জাফর বাবুলসহ কমিটির অন্যদের সঙ্গে বৈঠক হলে তারাও জানায় যে, বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত মাদরাসাটি তারা অন্যত্র সরিয়ে নেবে। পরে সিদ্ধান্ত হয় ১৭ শতাংশ জায়গাজুড়েই মসজিদ নির্মাণ করে দেওয়া হবে। মসজিদের আশপাশে বাগান করে দেওয়া হবে। কাজেই সেই মসজিদ ভাঙার কোনো সিদ্ধান্তই নেই। অন্যদিকে, হঠাৎ করেই শহরের ডিআইটি মসজিদের নামাজের খুতবায় হেফাজতের আমির আমার বিরুদ্ধে হুমকিমূললক বক্তব্য দিয়ে বলেছেন, আমি নাকি ডিআইটি মসজিদ ভেঙে ফ্লাইওভার নির্মাণ করব। কিন্তু, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্তই হয়নি।’

‘আর একটি অভিযোগ তোলা হয়েছে মন্দিরের জায়গা নিয়ে। নারায়ণগঞ্জের লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর আখড়ার পাশেই মন্দিরের সাত একরের বেশি জায়গা ছিল। পাকিস্তান আমল থেকে সেখানকার জায়গা কেনা-বেচা হচ্ছে। ১৯৭৯ সালে আমার নানা ও চাচারা সেখান থেকে চার একর জায়গার পুকুর কিনেছেন। মন্দিরের দখলে এখন আছে এক একরের মতো, আরও দুই একর মন্দির কর্তৃপক্ষ বিক্রি করেছে। ৮০ সালের আগেই এগুলো সব বিক্রি হয়েছে। আমার নানার কেনা জায়গার মালিক তার সন্তানেরা। আমার মা-ও মালিক। এখানে আমার অপরাধ কোথায়? নানার কেনা জমি নিয়ে মামলাও হয়েছিল। সেই মামলায় নানার বাড়ির সদস্যরা জিতেছিল। ১৯৮০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তারা সেখানে মাছ চাষ করেছে। পরে পারিবারিক ঝামেলার কারণে চাষ বন্ধ রয়েছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সেটা নিয়ে আবার মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা চলাকালীন হিন্দুদের দিয়ে আমার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করানো হয়েছে। কিন্তু, জায়গা তো আমার নামে না। এখানে আমার দোষ কী?’

‘আমি পুকুরের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহার বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা করেছি। কারণ, তিনি কানাডার এক সাংবাদিককে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে যা ইচ্ছে তাই বলেছেন। বলেছেন আমি নাকি পুকুরের মালিক, আমাকে ছেড়ে দিতে বলেছেন। কিন্তু, আমি তো মালিকই না। আমি কীভাবে ছেড়ে দেবো?’, বলেন তিনি।

কে বা কারা আপনার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলছেন বা আন্দোলন করাচ্ছেন?, মেয়র আইভী বলেন, ‘এর পেছনে রয়েছেন শামীম ওসমান। তিনিই উসকানি দিয়ে আমার বিরুদ্ধে এই কাজগুলো করাচ্ছেন। আমার বিরুদ্ধে অহেতুক অভিযোগ তোলা হচ্ছে। যেখানে আমি মসজিদ নির্মাণে সহায়তা করেছি, এখনও করছি, সেখানে ভাঙব কেন? মসজিদ ভাঙার অভিযোগ তুলে যে আন্দোলন হচ্ছে, সেটা কিন্তু মসজিদ কমিটিও জানে না।’

শামীম ওসমান যে এগুলোর পেছনে উসকানি দিচ্ছেন, এর প্রমাণ কী?, তিনি বলেন, ‘শামীম ওসমান নিজেই তো বলছেন যে, হিন্দুরা খেপেছে, হেফাজত খেপেছে, আইভীকে কেউ ভোট দেবেন না। বিভিন্ন জায়গায় তিনি নৌকায় ভোট না দিতে বলেছেন।’

অ্যাডভোকেট খোকন সাহা বলেন, ‘পুকুরের জায়গাটি ছয়টি দলিলের মাধ্যমে বিক্রি হয়েছে। একটা আইভীর নানার নামে, একটা তার মায়ের নামে, দুইটা তার দুই ভাইয়ের নামে, একটা তার চাচার নামে, একটা চাচির নামে। আইভীরা বলছেন তারা নানার ওয়ারিশ সূত্রে এ জায়গা পেয়েছেন। কিন্তু, সেটা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। যারা জায়গাটা রেজিস্ট্রি করে দিয়েছে, তারাই আইভির মা, দুই ভাইর নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছে। সেটা ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া না। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোক এটার নিন্দা জানিয়েছেন। সবাই একই কথা বলছেন যে, আইভীর পরিবার এই সম্পত্তি আত্মসাৎ করার চেষ্টা করেছে।’

খোকন সাহার অভিযোগ বিষয়ে মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, ‘মন্দিরের এই জায়গার সঙ্গে আমার কোনো রকমের সংশ্লিষ্টতা নেই। আগেও এটা পরিষ্কার করে বলেছি, এখনো আবার বলছি।’

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ নারায়ণগঞ্জ মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক উত্তম কুমার সাহা বলেন, ‘এটা ওয়াকফ সম্পত্তি। নিয়ম অনুযায়ী এ জমি হস্তান্তরযোগ্য নয়। পুকুরটি মন্দিরের। মেয়রের পরিবার কর্তৃক তা দখল করে রাখা হয়েছে। প্রতিদিন একটু একটু করে পুকুর ভরাট করা হচ্ছে। মেয়র বলেন যে, তার সংশ্লিষ্টতা নেই। কিন্তু, দায়িত্বপূর্ণ পদে থেকেও এটা বলে তিনি দায় এড়াতে পারবেন না।’

চাষাঢ়ার মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর বাবুল বলেন, ‘মসজিদ ভাঙার কোনো ধরনের বিষয় নেই। বরং মেয়রের উদ্যোগে মসজিদটি বড় ও দৃষ্টিনন্দন করে নির্মাণ করা হবে।’

নারায়ণগঞ্জের হেফাজতের আমির আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘আমি টেলিফোনে এ বিষয়ে কোনো কথা বলব না।’

এ বিষয়ে জানতে সংসদ সদস্য শামীম ওসমানকে দুই বার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এসএমএস পাঠালেও উত্তর দেননি। সূত্র: ডেইলি স্টার।


বিভাগ : উপজীব্য


এই বিভাগের আরও