লেখক মুশতাকের মৃত্যুর ব্যাপার আদালতে লিখিতভাবে জানাতে হবে

যোগফল প্রতিবেদক

01 Mar, 2021 05:36pm


লেখক মুশতাকের মৃত্যুর ব্যাপার আদালতে লিখিতভাবে জানাতে হবে
ছবি : সংগৃহীত

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে মামলায় বন্দী থাকাবস্থায় লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যু হয়েছে, সেই মামলার আর এক আসামি কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরের জামিন প্রশ্নে শুনানি ও আদেশ ৩ মার্চ ২০২১ (বুধবার)। এদিকে মুশতাক আহমেদ যে মারা গেছেন সে বিষয়ে তার আইনজীবীকে লিখিতভাবে (হলফনামা আকারে) আদালতকে জানাতে বলা হয়েছে।

বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ সোমবার [১ মার্চ] এ দিন ধার্য করে আদেশ দেন। আদালতে জামিন আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পী।

শুনানির শুরুতে জামিন আবেদনকারীপক্ষের আইনজীবী আদালতে বলেন, দুইজনের জন্য জামিন আবেদন করা হয়েছিল। এদের মধ্যে একজন লেখক মুশতাক আহমেদ বন্দী অবস্থায় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি হাই সিকিউরিটি কারাগারে মারা গেছেন। তাই শুধু এক নম্বর আবেদনকারী আহমেদ কবির কিশোরের আবেদন উপস্থাপন করছি।

আদালত মুশতাক আহমেদের জামিন আবেদন প্রসঙ্গে বলেন, তার জামিন আবেদন উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজ করা ঠিক হবে না। তাই আপনাকে (আইনজীবী) অ্যাফিডেবিট দিয়ে (হলফনামা আকারে) বলতে হবে, মুশতাক আহমেদ মারা গেছে।

এ সময় আইনজীবী বলেন, মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর কারণ নিয়ে আমি কিছু বলতে চাই।

এ পর্যায়ে আদালত বলেন, মৃত্যুর কারণ যাই হউক, স্বাভাবিক মৃত্যু হউক বা দুর্ঘটনাজনিত হউক সেটা তো আলাদা বিষয়। যেহেতু তিনি নাই, সে কারণে তার আবেদনটি উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজের কোনো সুযোগ নাই।

তখন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, এ কথাটা অবশ্যই অ্যাফিডেবিট করে বলতে হবে। তখন সেটি অ্যাবেট (বাতিল) হয়ে যাবে।

এসময় আদালত বলেন, যেহেতু বাতিল হয়ে যাচ্ছে, তাই এর রেকর্ড থাকা দরকার। এজন্যই অ্যাফিডেবিট করে বলতে হবে। তাই পরশু (বুধবার) আদেশের জন্য রাখছি। ওইদিন আপনি (জ্যোতির্ময় বড়ুয়া) একটি অ্যাফিডেবিট নিয়ে আসবেন।

এরপর কিশোরের জামিন আবেদন উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, গত ৫ মে কাকরাইলের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসময় তার বাসা থেকে মোবাইল, কম্পিউটার, হার্ডডিস্ক জব্দ করা হয়। তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১, ২৫, ৩১ এবং ৩৫ ধারার অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু এফআইআর এর কোথাও উল্লেখ নেই যে কিশোর কিভাবে আইন শৃংখলার অবনতি ঘটিয়েছেন। তিনি একজন কার্টুনিস্ট। কার্টুনিস্ট কি করেন সারা পৃথিবীতে? সরকারে যারা থাকেন তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা, তাদের বিভিন্ন রকমের কার্টুন আঁকা এটা তো আজকের দুনিয়ায় নতুন কোনো কিছু না। এই কার্টুনের জন্যই যে কিশোর কেবল পরিচিত, তা না। তিনি একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে, প্রান্তিক জনগণের অধিকার কর্মী হিসেবে, বিশেষ করে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের মুখপাত্র হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় পুরস্কৃত হয়েছেন। কারাগারে থাকা অবস্থায়ও একজন সেরা কার্টুনিস্ট হিসেবে আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছেন।

আইনজীবী বলেন, কিশোরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি এমন কিছু বিষয় সম্প্রচার করেছেন, যেটা রাষ্ট্রবিরোধী। মহামারি করোনাভাইরাস নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো। আইনজীবী বলেন, আমার ঘরে গিয়ে আমার কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক থেকে তথ্যগুলো পাবেন, তারপর সেটা নিয়ে আমার বিরুদ্ধে মামলা করবেন, আইনটি সেরকম না। তৃতীয় পক্ষের কাছে যখন এসব অ্যাভিডেন্স চলে গেছে, যখন তথ্যগুলো সব তাদের কাছে আছে তখন সেটি দিয়ে মামলা করতে হবে।

এসময় আদালত বলেন, এজাহারে বলা হচ্ছে কতগুলো অ্যাপস থেকে আসামিরা চ্যাট করেছেন। ফেসবুকেও দিয়েছেন। হয়তো ফেসবুকে দেখার পর তা চিহ্নিত করা হয়েছে। আদালত বলেন, আমাদের দেশে তো এটা নতুন আইন। তাই এটা সম্পর্কে সবারই ধারণা কম। প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব, প্রশিক্ষিত তদন্তকারী কর্মকর্তার অভাব।

শুনানিতে আইনজীবী বলেন, গতবছর ৫ মে মামলা হলো। ৪০ ধারা অনুযায়ী ৭৫ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করতে না পারলে সাইবার ট্রাইব্যুনালের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৩০ দিন সময় নিতে পারবে। অর্থাৎ মোট ১০৫ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু আইনে বেধে দেওয়া সময়েরও অনেক পর গত ১৫ জানুয়ারি প্রয়াত মুশতাক আহমেদ, আহমেদ কবির কিশোর ও দিদারুল আলম এই তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। তবে সাইবার ট্রাইব্যুনাল এই অভিযোগপত্র গ্রহণ করেনি। অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। তিনি বলেন, এ মামলার আসামি দিদারুল আলমকে আপনারা জামিন দিয়েছেন।

আইনজীবী বলেন, অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন ধার্য ছিল গত ২৩ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন মুশতাক আহমেদ ও আহমেদ কবির কিশোরকে মূখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়েছিল। ওইদিন আহমেদ কবির কিশোর আমাদের জানিয়েছেন যে, তাকে কাস্টডিতে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। এ কারণে তার ডান কান প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছে। বাম পায়ে ক্ষত সৃষ্টি হয়ে তা ঘাঁ এর পর্যায়ে চলে গেছে। এটা মৌখিকভাবে আদালতকে জানানোর পরও জামিন পাইনি। অথচ এরইমধ্যে একজন আসামি মারাই গেলেন অসুস্থতার কারণে। অথচ দেখুন, এই অসুস্থতার মধ্যেও কিশোরকে রিমান্ডে নিতে আবেদন করেছিল। অভিযোগপত্র দেওয়ার পরও কিভাবে এটা করে জানিনা। যদিও আদালত সে আবেদন নামঞ্জুর করেছে। আর একটা কথা, রিমান্ডের আবেদন করলে আসামিকে হাজির করতে হয়। কিন্তু আসামিকে হাজির না করেই তারা রিমান্ডের আবেদনের শুনানি করেছেন।

পরে আদালত আগামী ৩ মার্চ শুনানি এবং আদেশের জন্য দিন ধার্য করেন।



এই বিভাগের আরও