লালন-লেনিন-ছবিরহাট বা নাহিদ হাসানের কবিতা রাষ্ট যন্ত্রে নির্বিচারে কাটা পড়ে

আরিফুজ্জামান তুহিন

10 Feb, 2020 12:55pm


লালন-লেনিন-ছবিরহাট বা নাহিদ হাসানের কবিতা রাষ্ট যন্ত্রে নির্বিচারে কাটা পড়ে

রাষ্ট্র মানেই নিপীড়নের যন্ত্র। সামন্তবাদী রাজার রাষ্ট্র, পুঁজিবাদী ব্যবসায়ীর রাষ্ট্র কিংবা সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণির একনায়কত্বের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র এই নিপীড়ন অব্যাহত রাখে। তাহলে এক নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে সেধে আমরা কেন সমাজতন্ত্রের কারাগারে যাব? আর যাওয়ার জন্য কত মানুষের জীবন উৎসর্গ, কত ত্যাগ! এই জরুরি প্রশ্নের বিস্তর জবাব আছে। আমি খুব ছোট করে জবাবটা দেব।

পুঁজিবাদী ব্যক্তিগত মালিকানার ব্যবসায়ীদের রাষ্ট্রে বুর্জোয়া শ্রেণি ছাড়া বাকি শ্রেণি নিপীড়নের শিকার হন। আর সমাজতন্ত্রে বুর্জোয়া শ্রেণি এই দমন নিপীড়নের শিকার হন। তবে এগুলো হলো আইডিয়ালিস্টিক স্টেটমেন্ট সমাজতন্ত্র সম্পর্কে। বাস্তবে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিপ্লব রক্ষার নামে স্বয়ং শ্রমিক কৃষকও নিপীড়ন, গায়েব, গুমের শিকার হন। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এগুলো হরহামেশা করছে। আপনি ঘুমিয়ে আছেন কিন্তু আপনার ... ফোনটি জেগে জেগে আপনার লোকেশন, আপনার ভিডিওচিত্র যে তাদের কেন্দ্রীয় সার্ভারে পাঠাচ্ছে না তা আপনি জানেন না।

এডওয়ার্ড স্নোডেন বলেছেন, গাছ থেকে পাতা পড়বে সেটা যুক্তরাষ্ট্র জানবে না তা হয় না। এর অর্থ হলো দুনিয়াতে আপনি যাই করছেন তার ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও তার মিত্র শক্তিরা।

পুঁজিবাদী রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে ফরাসি বিপ্লবের ভিত্তির ওপর। সে কারণে এই রাষ্ট্র ইচ্ছে করলেও অন্তত প্রকাশ্যে এসব বেআইনি কাজ করতে পারে না। প্রকাশ্যে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে ভাগ করতে পারে না। যেসব রাষ্ট্র প্রকাশ্যে জনগণকে গুম খুন করে এবং বৈধতা দিতে নানান ধরনের আইন থাকে তাকে কোনোভাবে বুর্জোয়া রাষ্ট্রও বলা যায় না। মূলত এসব রাষ্ট্রগুলোর শাসকশ্রেণি একটা টোটালেটেরিয়ান সিস্টেম শক্তপক্তভাবে কায়েম করার জন্য বিশেষ বাহিনীর ওপর নির্ভর করে। এবং সেটি করে মূলত একটি চেতনার নামে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চেতনাটি হয় ‘জাতীয়তাবাদ’। তো আপনি আপনার দেশকে ভালোবাসেন, সেই ভালোবাসাকেই সরকারগুলো আপনার স্বাধীনতার বিপক্ষে, আপনার মত প্রকাশের বিপক্ষে ব্যবহার করে ‘জাতীয়তাবাদ’ নামে।

তো সমাজতন্ত্রের গুরুত্ব মূলত এখানে, এটি রাষ্ট্র চূর্ণবিচূর্ণ হওয়ার একটা অন্তর্র্বতীকালীন ব্যবস্থা। অর্থাৎ রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে দুনিয়াজুড়ে নাই করে দেওয়ার আগ পর্যন্ত সমাজতন্ত্র একটাঅন্তবর্তীকালিন কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। সে কারণে আমরা সমাজতন্ত্র চাই। কারণ দুনিয়াতে থেকে রাষ্ট্র বিদায় নিক এটা আমরা চাই। মানুষের অভাবনীয় বিকাশে রাষ্ট্র প্রধান বাধা।

যারা রাজনীতি করতে চান, তাদের প্রথম পাঠ বা অবশ্য পাঠ হলো রাষ্ট্র। আপনি হেফাজত ইসলাম করতে পারেন, সর্বহারা পার্টি কিংবা সিপিবি করতে পারেন (অর্থাৎ চলমান বুর্জোয়া রাষ্ট্রের উচ্ছেদ চান যারা) তাদের নিবিড়ভাবে রাষ্ট্র বুঝতে হবে। রাষ্ট্র বিষয়টি বুঝতে পারলে তবে তা দখল করার কর্মসূচি হাজির করতে পারবেন।

যদি খুব নিবিড়ভাবে লক্ষ্যে করেন তাহলে দেখবেন ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল, এর আগে সাড়ে তিন দশকে একটি আমলা লুটেরা রাষ্ট্র যেভাবে তার অ্যাপারেটাস পরিচালনা করছিলেন তার সঙ্গে ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার ফারাক আছে। যে জরুরি অবস্থা তখন জারি হয়েছিল তা কিন্তু আমার মতে এখনো অব্যাহত আছে। অর্থাৎ রিজিম আপাত পরিবর্তন হয়েছে মনে হলেও বাস্তবে সে তার আগের আমলের কাঠামো থেকে সরে এসে ক্রমশ কর্তৃত্ববাদে পরিণত হয়েছে।

এই পরিবর্তন খুব আস্তে, অল্প অল্প করে হয়েছে। যখন হয়েছে তখন আপনি এটি ধরতে পারেননি। কারণ রাষ্ট্র বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ হয় ছিল না, থাকলেও জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কগুলোর যে ছোট ছোট পরিবর্তন ঘটছিল সেগুলো নিয়ে আপনি চিন্তিত ছিলেন না।

ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ একটি শহর। মানুষ কোথাও যখন বাস করে তখন শুধু সে কাজ করা, খাদ্য নেওয়া ও যৌন সম্পর্কে মিলিত হয় না। তার চিত্তের ক্ষুধা থাকে। সেই ক্ষুধার অন্যতম হলো তার মত প্রকাশ। হতে পারে সেই মত ভুল, আধা সত্য, যড়যন্ত্র তত্ত্বের ওপর দাঁড়ানো চিন্তা তারপরও সে চিত্তের ক্ষুধা মেটাতে চায়। সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পূর্ব ইউরোপের সমাজতন্ত্রের ধ্বংসের পেছনে প্রধান কারণের একটি ছিল অন্তত সমাজের উপরিভাগে যেটা দেখা গেছে, তা হলো মানুষ কথা বলতে পারছে না।

ঢাকায় মধ্যবিত্তের চিত্ত বিকাশের জন্য কোন আয়োজন নেই। আছে ধানমন্ডি-সেখানে উচ্চবিত্তরা যায়। কিন্তু উচ্চবিত্তরা শিল্প সাহিত্য সৃষ্টি করে না। ধনিরা শিল্প সাহিত্য কিনে তাদের ঘরের শোভা বর্ধন করেন। ছবির হাট সেই স্পেস পূরণ করতে সক্ষম হয়েছিল। এর সঙ্গে অবশ্যই ক্ষুদ্র আকারে হলেও রাষ্ট্র বিরোধী কিছু মানুষ সেখানে যেতো, কবিতার কথা বলত, গল্প লিখতে না পারার কথা বলত, বিপ্লব হচ্ছে না, কমিউনিস্ট পার্টিগুলো সব ভেড়াতে পরিণত হয়েছে তার সমালোচনা করত। এসব করতে করতে তারা মাঝে মধ্যেই রাজপথে দাঁড়িয়ে যেতো। তারা শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনে দিনরাত খাটতো। মঞ্চের আওয়ামীকরণের বিরোধিতা করত। তারা রানা প্লাজায় নিহত মানুষের জন্য চাঁদা তুলে পাশে দাঁড়াতো। তাদের জন্য লংমার্চ করে ঢাকা থেকে হেঁটে সাভারে গিয়ে রানা প্লাজা সহ নির্যাতিত শ্রমিকদের পক্ষে কথা বলত। বিজিএমইএ ঘেরাও করে সংগঠনের সভাপতির মুখে থুতু দিত। তারা অনেক কিছু করত। তারা রাষ্ট্রের হত্যার বিরোধিতা করার জন্য হাতে বন্দুক তুলে নেওয়ার মত উসকানি দিত।

এর বিপরীতে ছবির হাটে গাঁজা খাওয়া মানুষ যেতো। হয়তো ভিড় ভাট্টার মধ্যে দেহ বিক্রি করে সারা দিনের ভাত জোগাড় করার মত মেহনতি নারীও সেখানে ছিলেন। অথবা কিছুই না, একটু মন খুলে কথা বলার জন্যও অনেকে সেখানে যেতেন।

তো, এই মানুষগুলো আলবত হাসিনা খালেদার মানুষ না। তারা মুক্ত হতে চেয়েছিল। সরকার আসলে এমন মানুষকেই ভয় পায়। আমি আড়াআড়ি বা সোজাসুজি বুঝি-এমন মানুষদের ভয় পায় জনগণের ওপর চেপে বসা সরকারগুলো। ছবির হাট ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে সরকার। তখন আপনি বোঝেননি রাষ্ট্র সেই সব স্থাপনার চিহ্ন রাখতে চায় না, যেসব স্থাপনা থেকে তাকে দখল করার প্রক্রিয়া থাকে।

এর সঙ্গে মিলিয়ে পড়ুন বাউল ফকিরদের ওপর রাষ্ট্রের ধারাবাহিক নিপীড়ন। কোথাও চুল কেটে দিচ্ছেতো, কোথাও তওবা পড়ানো হচ্ছে। মামলার ঘটনাতো আছেই। কারণ ফকিরের চিন্তার সঙ্গে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের ফারাক আছে বা বলতে পারেন একটা বাহাস আছে। সে কারণে লেনিনের মতের মতোই রাষ্ট্রের কাছে সমান আতঙ্কের নাম লালন ফকির।

এর বিপরীতে কিছু মানুষ অনেক ভালো আছেন। তারা বিপুল আকারে লেখালেখি করেন। তাদের মত রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করে না, ঝুঁকিতে ফেলে না। তারা মূলত ফেইক দেশপ্রেম জাগ্রত করে একটি নাদান নিরেটে পপুলিস্ট মত তৈরি করে। এটি মূলত জাতীয়তাবাদ ও কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। তারা সমাজে অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী, কবি ও সাহিত্যিক বাবা নানান নামেও পরিচিত। দৈনিক পত্রিকা, টিভি ক্যামেরা, ফ্ল্যাশ লাইট কতকিছু সেই সব সভা কবি ও লেখকদের জন্য। আর কিছু কিছু কবিতা পাঠকের হাতে যাওয়ার আগেই খুন হয়ে যায়।

নাহিদ হাসান একজন বহুমাত্রিক লেখক, কবি ও চিন্তুক। ‘বড় আপা, ক্রসফায়ার ও অন্যান্য’ নামে একটি কাব্য বাতিঘর এই বইমেলাতে এনেছে। নাহিদের এই কাব্যের কবিতা আমি পড়িনি। কিন্তু নাম দেখেই আন্দাজ করা যায় ভেতরে কবিতার আঙ্গিক, বিষয় কি থাকতে পারে। তো বাতিঘর নাহিদকে একটা খোড়া যুক্তি হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছে, বড় আপা, ক্রসফায়ার ও অন্যান্য’ কাব্যটি তারা বইমেলাতে তাদের স্টলে রাখতে পারবে না। আসলে বড়বড় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এমন কাব্য বের করা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্র জরুরি অবস্থা জারি রেখেছে। এ রকম পরিস্থিতিতে বাতিঘরের মত এত বড় বিনিয়োগের একটি প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের অনুকূলেই থাকবে। তবে মেলার ২১১ নম্বর স্টলে ‘গ্রন্থিক’ নামের একটি প্রকাশনা বইটি মেলায় বিক্রি করতে রাজি হয়েছে। এগুলো বিকল্প ব্যবস্থা কিন্তু টেকসই নয়। যারা রাষ্ট্রকে মোকাবিলা করতে চান তাদের আরও বড় পরিসরে ভাবতে হবে।


বিভাগ : বইপত্র