‘খাল দখল ও দূষণের সঙ্গে জড়িতরা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী’

যোগফল রিপোর্ট

18 Mar, 2021 06:42pm


‘খাল দখল ও দূষণের সঙ্গে জড়িতরা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী’
ছবি : সংগৃহীত

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার খাল দখল ও দূষণের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা সকলেই প্রভাবশালী এবং রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী। এ কারণে শুধু ঢাকা শহরের খালগুলোকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে না দুই সিটি। 

এ জন্য রাষ্ট্র ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনমনীয় দৃঢ়তা থাকলে খালগুলোকে আগের রূপে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে দাবি করেছে নগর পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)।

বৃহস্পতিবার [১৮ মার্চ ২০২১] ঢাকার বাংলামোটরে প্ল্যানার্স টাওয়ারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আদিল মোহাম্মদ খান।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ঢাকা শহরের খালগুলোর মালিকানা ওয়াসার নিকট থেকে দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এটা একটা তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সিটি করপোরেশনের তরফ থেকে এরমধ্যে ঢাকা শহরের বেশির ভাগ খাল ও বকসকালভার্ট থেকে বর্জ্য অপসারণের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনসমূহ বেশকিছু খালকে দখলমুক্ত করতে বলিষ্ঠ উদ্যোগ নিয়েছে।

খালগুলোকে আগের রূপে ফিরিয়ে আনতে সিটি করপোরেশনকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দখল ও দূষণমুক্ত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা শহরকে জটমুক্ত করতে হলে শুধ খালের আন্তঃসংযোগ বৃদ্ধি কিংবা খালের কার্যকারিতা বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। শহরের চারপাশে আমাদের যে সব জলাশয়, জলাভূমি, প্লাবনভূমি, বন্যা প্রবাহ এলাকা আছে, সেসব এলাকাসমূহ সংরক্ষণ না করতে পারলে শহরের বৃষ্টির পানি পরিপূর্ণভাবে নিষ্কাশন করা সম্ভব হবে না। ফলে আমাদের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা এবং অন্য পরিকল্পনায় ঢাকার চারপাশের জলাভূমি ও বনভূমি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আমাদের ঢাকা মহানগর এলাকায় যে পুকুরগুলো আছে সেগুলোকে জলাধার হিসেবে চিহ্নিত করে সংরক্ষণ করা একান্ত দরকার। প্রয়োজন হলে এসব জলাশয় অধিগ্রহণের মাধ্যমে কিংবা উন্নয়ন তত্ত্ব প্রতিস্থাপন (টিডিআর) এর মাধ্যমে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। যাতে বৃষ্টির সময় সেগুলো স্থানিক জলাধার হিসেবে বৃষ্টির পানি ধারণ করার মাধ্যমে আমাদের খালগুলোর উপর পানি ধারণ করার চাপ কমাতে পারে। আমরা অনেক সময় দেখি সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রকল্প প্রণয়নের সময় প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার ভরাট করে অনেক ব্যয়বহুল কৃত্রিম ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে। প্রকৃত অর্থে প্রাকৃতিক জলাশয়ে জীবন্ত সত্তা বিবেচনা করলে তাকে ধ্বংস করে দিয়ে কৃত্রিম ব্যবস্থাপনা কখনও টেকসই হবে না।

সংবাদ সম্মেলনে বিআইপি’র সাধারণ সম্পাদক বলেন, মশক নিধন কার্যক্রম অধিক পরিমাণে কীটনাশকনির্ভর হয়ে পড়ায় মশার যন্ত্রণা থেকে নগরবাসীর মুক্তি মিলছে না। অথচ বর্তমানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশা নিধনের বরাদ্দ ব্যয়ের ৯০ ভাগই করে থাকে কীটনাশক কিনতে।

গত পাঁচ বছরে দুই সিটি করপোরেশনে মশক নিধন কার্যক্রমের ব্যয়ের চিত্রও তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি জানায়, মশক নিধন খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩২১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২৪০ কোটি ৬১ লাখ টাকাই মশা নিধনে ঔষধ কিনতে ব্যয় করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন গত পাঁচ অর্থবছরে মশক নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ করা ১৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকার মধ্যে ১২১ কোটি টাকা এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ১৩৫ কোটি ১৩ লাখ টাকার মধ্যে ১১৯ কোটি টাকা রাসায়নিক ঔষধ কেনার জন্য ব্যয় করছে। চলতি অর্থবছরও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মশক নিয়ন্ত্রণে ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। এর মধ্যে কীটনাশক কিনতেই ব্যয় করবে ৪০ কোটি টাকা। দক্ষিণ সিটিতে এ খাতে বরাদ্দ ৩৫ কোটি টাকার মধ্যে ৩০ কোটি টাকারই ঔষধ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ক্রমাগত কীটনাশক প্রয়োগের ফলে মশা কীটনাশক সহনশীল হয়ে যাচ্ছে। তাই বর্তমানে উচ্চমাত্রার কীটনাশক প্রয়োগেও মশক নিধন কার্যক্রমে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। মশা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে সমন্বিত মশক নিধন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ করা দরকার। এই পদ্ধতির প্রথম ধাপ হলো পরিকল্পিত উপায়ে নগর গড়ে তোলার মাধ্যমে শহরকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা। এই পদ্ধতির দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে, জৈবিক উপায়ে মশক নিধন করা। এক্ষেত্রে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে চিহ্নিত করতে হবে কোথায় মশা জন্মে; এসব জায়গায় যেন মশা জন্মাতে না পারে সে বিষয়ে লক্ষ্য রেখে পদক্ষেপ নিতে হবে। তৃতীয় ধাপে, থাকবে কীটনাশক প্রয়োগের মাধ্যমে মশামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। চতুর্থ ধাপে, জনগণকে সচেতন করে মশার প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট করতে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এই সমন্বিত পদ্ধতিতে কীটনাশক প্রয়োগ তৃতীয় ধাপ হলে বর্তমানে তা প্রথমে প্রয়োগ করতে দেখা যায়।

লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও জানান, সরকারের বেশির ভাগ উন্নয়ন প্রকল্পই যথাসময়ে, নির্ধারিত টাকায় সমাপ্ত করা যাচ্ছে না। বরং অধিকাংশ প্রকল্পের ক্ষেত্রে সময় ও ব্যয় বেড়েছে। কাজের মান খারাপ হচ্ছে, জনদুর্ভোগ বাড়ছে। এর ফলে দশকজুড়ে উন্নয়ন প্রকল্প একই চক্রে ঘুরপাক খাওয়ায় সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে এই গোলক ধাঁধাকে সরকার সম্প্রতি স্বীকার করে নিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০১৬ সালের জুন থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নকালে সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে মোট ৯৬টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির শেষ সভায় এই প্রকল্পগুলো নিয়ে মূল্যায়ন প্রতিবেদন উপস্থাপন করে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। তাতে দেখা যায়, এই ৯৬টি প্রকল্পের মধ্যে ৪৮টির সময় এক বা একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে। ২৮টি প্রকল্পের সময়সীমা নিয়ে প্রতিবেদনে কিছু বলা হয়নি। মাত্র ১৬টি প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়েছে। চারটি প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়েছে। কয়েকটি ব্যতিক্রম বাদে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যয়ও বেড়েছে। আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি,  ভাঙতে হবে জেনেও ঢাকার আশেপাশে দুই সেতুর নির্মাণ কাজ চলছে। ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার নৌপথ চালু করতে কম উচ্চতার ১৬টি সেতু ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা করছে সরকার। কিন্তু বৃত্তাকার নৌপথ এলাকার মধ্যেই এখন কম উচ্চতার আরো দুটি সেতু নির্মাণ করছে সরকারেরই দুই সংস্থা। একটি টঙ্গীতে তুরাগ নদের ওপরে কামারপাড়া সেতু। এটি নির্মাণ করছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। দ্বিতীয়টি রেলসেতু। টঙ্গীতেই তুরাগের উপর এই সেতু নির্মাণ করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সেতু দুইটি নির্মাণে প্রায় ১১০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। যে উচ্চতায় সেতু নির্মিত হচ্ছে তাতে এর নিচ দিয়ে বর্ষায় নৌযান চলাচল করতে পারবে না। ফলে বৃত্তাকার নৌপথ চালু করতে হলে দুইটি সেতুই ভাঙতে হবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স দাবি করছে, অচিরেই এই দুই সেতুর নির্মাণকাজ স্থগিত করে জনগণের টাকার অপচয় বন্ধ করে পরিকল্পিত উপায়ে সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সেতুগুলো যথাযথভাবে নির্মাণ করা হোক।

সংগঠনটির সভাপতি অধ্যাপক ডক্টর আকতার মাহমুদ বলেন, খাল দখল করে ভবন নির্মাণ করেও দাবি করা হয় তা অনুমোদিত নকশায় বিল্ডিং কোড মেনে করা হয়েছে। একটি সুন্দর নগরের স্বার্থেই অতিদ্রুত ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান-ড্যাপ’র অনুমোদন দেয়া জরুরি বলেও মনে করেন তিনি। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার নামে কোনো প্রকল্প হাতে নেওয়া বা অযৌক্তিকভাবে যেন ব্যয় না বাড়ে, সেদিকেও লক্ষ্য রাখার পরামর্শ দেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ।



এই বিভাগের আরও