ঋণ খেলাপিদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা

যোগফল রিপোর্ট

26 Mar, 2021 08:37pm


ঋণ খেলাপিদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা
ছবি প্রতীকী

কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঋণ খেলাপির অভিযোগের বিষয়ে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ থাকলে তার পাসপোর্ট জব্দ, প্রত্যাহার বা স্থগিত করে বিদেশ ভ্রমণ আটকাতে পারবে সরকার। ঋণ খেলাপিদের বিদেশ ভ্রমণ আটকানোর এমন বিধান সংযুক্ত করে বাংলাদেশ পাসপোর্ট আইনের খসড়া তৈরি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা 'পাসপোর্ট আইন, ২০২১' এর খসড়া আইনের ৯(৩) ধারায় বলা হয়েছে, “যদি কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং, ব্যাংক ঋণ খেলাপির অভিযোগ, মানবপাচার কিংবা মুদ্রাপাচার, মাদকদ্রব্য বা অস্ত্রপাচার, উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বা অন্য কোন আইনগতভাবে নিষিদ্ধ ব্যবসায় জড়িত রয়েছেন বলে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ থাকে, তা হলে সরকার তার বিদেশ ভ্রমণে বাধা দিতে পারবে।”

এদিকে খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ফাইন্যান্স কোম্পানি অ্যাক্ট, অর্থঋণ আদালত আইন ও দেউলিয়া আইন সংশোধনের জন্যও খসড়া আইন তৈরি করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সেখানে 'ইচ্ছাকৃত' ঋণখেলাপিদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞাসহ বাড়ি-গাড়ি ও সম্পত্তি নিবন্ধন করতে না দেওয়া, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের সদস্য পদ পাওয়ার অযোগ্য ঘোষণা ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার অযোগ্য ঘোষণার কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া খেলাপি ঋণ বিক্রির জন্য একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন প্রতিষ্ঠার নতুন একটি আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এই করপোরেশন ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কিনে নিয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করবে। কিন্তু কোম্পানি হবে, নাকি করপোরেশন এই প্রশ্নে দুইবছর ধরে আইনটি চূড়ান্ত করতে পারছে না আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। দীর্ঘদিন ধরে অকেজো থাকা দেউলিয়া আইন সংশোধন করতেও খসড়া উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকার, কোম্পানি আইনজীবী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদ্যমান বিভিন্ন আইনে খেলাপি ঋণ আদায়ে যথেষ্ট কঠোর হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রভাবশালী ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে তার প্রয়োগ হচ্ছে না। বিদ্যমান অর্থঋণ আদালত ও ব্যাংক কোম্পানি আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করলেই খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব।

তবে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এসব আইন করে কোন লাভ হবে না বলে জানান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহি পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান এইচ মনসুর। “প্রভাবশালীরা ঋণ খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হন না। তারা ঋণ খেলাপি হয়েও নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকদের সঙ্গে বিদেশ ভ্রমণ করেন। সরকার রাজনৈতিকভাবে খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত না নিয়ে যতো আইন-ই করুক, তা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে”, বলেন তিনি।

গত ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে প্রায় ৭৪ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যার বিপরীতে প্রায় আটকে রয়েছে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ। হাইকোর্টে রিট করে এ ধরণের প্রায় ২২ হাজার মামলায় স্থগিতাদেশ পেয়েছে ঋণ খেলাপিরা।

অর্থঋণ আদালত ও উচ্চ আদালতে আটকে থাকা ঋণ খেলাপি সংক্রান্ত প্রায় এক লাখ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য রেট্রোপেসটিভ ইফেক্ট পদ্ধতি চালু করা ও হাইকোর্টে পৃথক বেঞ্চ গঠনের জন্য অর্থমন্ত্রী থাকাকালে আবুল মাল আবদুল মুহিত বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

কোম্পানী আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার তানজীব-উল আলম বলেন, এসব আদালতে হওয়া মামলার একটি বড় অংশ হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত থাকায় সেগুলো আটকে রয়েছে। এছাড়াও বিচারক সংকট, আদালত সংকট থাকায় নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রতিটি জেলায় পৃথক অর্থঋণ আদালত থাকার কথা থাকলেও তা নেই। শুধু ঢাকায় চারটি আদালত রয়েছে। অন্য জেলাগুলোতে যুগ্ম জেলা জজ পদমর্যাদার বিচারকের আদালতে এসব মামলার বিচার হয়। ওইসব আদালতে অন্যান্য মামলার পাশাপাশি এসব মামলার বিচার চলায় নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হচ্ছে।

২০০৩ সালে যখন অর্থঋণ আদালত আইন করা হয়, তখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২০ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা, যা ওই সময় বিতরণ করা মোট ঋণের ২২.১৩ শতাংশ। এ আইন কার্যকর হওয়ার পর প্রথম দুইবছর খেলাপি ঋণ কমতে থাকে। ২০০৫ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৫১১ কোটি টাকা, যা ওই সময়কার মোট ঋণের ১৩.৫৫ শতাংশ। অবশ্য ২০০৩ সাল থেকেই মন্দমানের খেলাপি ঋণ অবলোপনের সুবিধা চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

২০০৫ সাল থেকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকে। বিভিন্ন সময় বিশেষ বিবেচনায় খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন সুবিধা দেওয়ার পরও ২০১৯ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। করোনা পরিস্থিতিতে দেওয়া বিশেষ ছাড় ও ২ শতাংশ সুদে পুনঃতফসিল সুবিধার কারণে গত ডিসেম্বরে খেলাপির পরিমাণ কমে নেমেছে ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকায়।