ঢাকায় হত্যাযজ্ঞ : ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ

আসাদুল্লাহ বাদল

13 Feb, 2020 01:51pm


ঢাকায় হত্যাযজ্ঞ : ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ
মওদুদ আহমদ

পঁচিশে মার্চ রাত সাড়ে দশটায় কিছু বিদেশী সংবাদদাতাকে আনার জন্য আমি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গিয়েছিলাম। দশটা পঁয়ত্রিশ মিনিটে আমাদের জানানো হয়, হানাদার বাহিনী হোটেল ঘিরে ফেলেছে। আমরা দেখলাম একটা ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা : কেউ হোটেল থেকে বের হলে দেখামাত্র গুলি করা হবে।

আমাদের মধ্যে কয়েকজন বের হতে চেয়েছিল। কিন্তু দেখল সেনাবাহিনীর ট্যাংক নিয়ে অবস্থান নিয়ে ফেলেছে। আমরা রেডিয়ো চালু করলাম। কিন্তু কারফিউ কোন ঘোষণা পাইনি। আমার যতদুর মনে পরে রাত এগারটা ৩০ মিনিটে আমরা গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাই। শব্দ হোটেলের খুব কাছ থেকে আসছিল। দেখি ফিটফাট পোশাকে নিতান্ত সাধারণ একটি জুটি বাইরে হেঁটে যাচ্ছে। দেখতে না দেখতে তাদের গুলি করা হলো। 

তারপর আমরা সবাই ১০ তলায় এবং পরে ১১ তলায় চলে গেলাম। আমরা ভুট্টোকে জাগাতে গিয়েছিলাম। কেউ একজন বললো তিনি ঘুমাচ্ছেন। তাকে বিরক্ত করা যাবে না। ৪০ থেকে ৫০ জন সংবাদদাতার সামনে তিনি কোন বিবৃতি দিতে পারবেন না। রাত আড়াইটায় ২৪ থেকে ২৫ জন সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিক বোঝাই দুইটি জিপের আগমন ঘটে। তারা ‘দ্য পিপলস’ নামের সংবাদপত্র কার্যালয়ের দিকে অগ্রসর হল। দেখি দাউদাউ আগুনের শিখা জ¦লছে। দ্য পিপলের নিকটবর্তী র্ফামগেট এলাকা আক্রমনের শিকার হয়। 

রাত আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে দ্য পিপলের কার্যালয়েও হামলা চালানো হয়। রাস্তাটি ছিল সরু এবং কেউ একজন দুইটা পুরানো গাড়ি দিয়ে রাস্তাটি বন্ধ করে রেখেছিল। বুলেটের আঘাতে রাস্তার উল্টাদিকের পানের দোকানটি ঝাঁজরা হয়ে যায়। মানুষ চিৎকার দিয়ে শ্লোগান দিচ্ছিল। আমরা দেখলাম গাড়িটির ভেতরে অথবা আশেপাশে কেউ নেই কিন্তু সৈন্যরা একটা ছোট মাইক হাতে জিজ্ঞাসা করে যাচ্ছিল। এখানে কি কেউ আছে? তারা রিকয়েললেস বন্দুকসহ একটা জিপে চড়ল। 

সংবাদপত্র কার্যালয়ের বিশাল স্টিলের গেট খুলে তারা ভিতরে ঢুকল। কয়েক রাউন্ড এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করল। আমরা দেখলাম ২০ থেকে ৩০ জন মানুষকে হত্যা করা হল। তারপর তারা বের হয়ে এল। তাদের পেছনে কাগজের স্তূপ দেখতে পেলাম। তারা ফ্লাডলাইট জে¦লে কাগজের স্তূপে একঘট পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিল। তারপর জিপটি আবার বেরিয়ে গেল। 

রেডিয়ো পাকিস্তানের উল্টোদিকে সাত আটজন ছাত্র জয় বাংলা বলে স্লোগান দিচ্ছিল। তাদের সবাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়। চারিদিকে বহ্নিশিখা। পরদিন সকালে শুরু হয় অঝোরে গুলিবর্ষণ। ঢাকা শহরে আগুন জ¦লতে থাকে দাউদাউ করে।

নোট : ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে সাংবাদিক খগেন দে, সুধীন্দ্রনাথ চৌধুরী ও অমিতা মালিক মাদার তেরেসার সাক্ষাতকারটি নেন। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি ‘ভারতীয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিষদ’ ২৬ জনের জবানবন্দি বই আকারে প্রকাশ করেন কলকাতা থেকে। এতে ভূমিকা লেখেন ৭০ বছর বয়সী ফরাসি দার্শনিক আঁদ্রে মালরো। তরজমা : মেহেদী হাসান।

যোগফল পাঠকদের ‘একাত্তর’ ধারণ করার ক্ষুদ্র চেষ্টায় নিবেদিত। [২৪]


বিভাগ : শিকড়