মাদককের ট্রানজিট নিয়ন্ত্রণকারী টঙ্গীর সেই ছাত্রলীগ নেতা রেজাউলের ঠাই কারাগারে

মো. আনোয়ার হোসেন

28 Apr, 2021 08:24pm


মাদককের ট্রানজিট নিয়ন্ত্রণকারী টঙ্গীর সেই ছাত্রলীগ নেতা রেজাউলের ঠাই কারাগারে
ছবি : সংগৃহীত

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেল, সড়ক ও নৌপথে মাদক কারবারের অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্ট (টঙ্গী) নিয়ন্ত্রণকারী মাদক কারবারি ছাত্রলীগ নেতাকে অবশেষে গ্রেফতার করেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। 

বুধবার [২৮ এপ্রিল ২০২১] ভোর রাতে মাদকের ব্যস্ত রুট হিসেবে পরিচিত টঙ্গী রেলওয়ে জংশন সংলগ্ন নোয়াগাঁওয়ের বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এই মাদক কারবারির নাম রেজাউল করিম (৩২)। তিনি ছাত্রলীগের টঙ্গী সরকারি কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসম্পাদক। পাশাপাশি তিনি বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সংগঠনটির গাজীপুর মহানগরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। 

সম্প্রতি আলোচিত এই ছাত্রলীগ নেতার কাছে এক লাখ পিম ইয়াবা ট্যাবলেট মজুত থাকা সংক্রান্ত ফোনালাপের একটি রেকর্ড ফাঁস হলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। 

টঙ্গীর চিহ্নিত এক মাদক কারবারি সাঈদা বেগমের সাথে তার আলোচিত ফোনালাপের রেকর্ডটি গত ২৭ এপ্রিল একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা হুবহু ফাঁস করে দেয়। এরপর ওই ছাত্রলীগ নেতার চাঁদাবাজিসহ আরও বহু অপকর্ম বেরিয়ে আসতে থাকে এবং একাধিক জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ফলাও করে এসব সংবাদ প্রচার হতে থাকে। এতে নড়েচড়ে বসে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। 

অবশেষে মঙ্গলবার দিবাগত রাতে সাদা পোশাকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এই ছাত্রলীগ নেতা কাম মাদক কারবারি রেজাউলকে বাসা থেকে তুলে নেয়। প্রথমে তাকে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ, জিএমপি টঙ্গী পূর্ব থানায় নেওয়া হয়। এসময় থানার মূল ফটক সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। জিএমপি পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা দীর্ঘক্ষণ তাকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে রাত আড়াইটায় কালো জিপে করে তাকে থানা থেকে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়। 

এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে জিএমপি দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ ইলতুৎ মিশ জানান, মাদকের সাথে সম্পৃক্ততা ও চাঁদাবাজির মামলায় রেজাউল করিমকে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গ্রেফতার করা হয়েছে।

টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ জানায়, গত ১৯ এপ্রিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে টঙ্গী পূর্ব থানায় একটি মামলা (নম্বর ৩৭) হয়। ওই মামলায় রিমান্ডে থাকা আসামি চিহ্নিত মাদক কারবারি জাকির হোসেন ওরফে ফরিদপুন্নীর সন্তান পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের জানায়, তার বাসায় আরও ইয়াবা ট্যাবলেট রক্ষিত আছে। তার স্বীকারোক্তি মতে উক্ত মাদকদ্রব্য উদ্ধারের জন্য মঙ্গলবার রাতে জিএমপি টঙ্গী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে টঙ্গী রেলওয়ে জংশন সংলগ্ন অন্যতম প্রধান মাদক স্পট কেরানীরটেক বস্তিতে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানকালে জাকিরের বসত ঘরের আলমিরা থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা মূল্যের ৫০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। 

এসময় জাকির পুলিশকে জানায়, এসব ইয়াবা ট্যাবলেট ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল করিম তাকে সরবরাহ করতো এবং দীর্ঘ দিন যাবত রেজাউলের সরবরাহ করা ইয়াবা ট্যাবলেট সে ক্রয়-বিক্রয় করে আসছে। 

ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রয়ের লভ্যাংশ তারা রেজাউলের সাথে আনুপাতিক হারে ভাগ করে নিয়ে থাকে। উক্ত ৫০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধারের ঘটনায় মঙ্গলবার রাতেই টঙ্গী পূর্ব থানায় ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল ও তার সহযোগীদের নামে মামলা (নম্বর ৫০) রুজু করে পুলিশ। এর পর মঙ্গলবার রাতেই পলাতক আসামি ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল করিমকে (৩২) মাদকের ব্যস্ত রুট হিসেবে পরিচিত টঙ্গী রেলওয়ে জংশনের উত্তর পাশে নোয়াগাঁও সৈয়দ মুন্সী রোডে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়। 

পরে রেজাউলের দেওয়া তথ্যে আরো মাদক দ্রব্য উদ্ধার অভিযানকালে গ্রেফতার হওয়া মাদক কারবারি জাকির হোসেনের ভাই নবীন হোসেনকে (৪০) আরও ২৯৪ পুরিয়া গাঁজাসহ গ্রেফতার করা হয়। এঘটনায়ও মঙ্গলবার রাতেই টঙ্গী পূর্ব থানায় পৃথক মামলা (নম্বর ৫১) দায়ের করা হয়। 

এদিকে জিএমপি টঙ্গী পশ্চিম থানা সূত্রে জানা যায়, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের স্থানীয় এরশাদ নগর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত একটি গার্মেন্ট কারখানার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হয়ে ওই ঝুট ব্যবসায়ীর কাছে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করেছিল রেজাউল। 

ওই ব্যবসায়ী চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলে তার হুমকিতে ওই ব্যবসায়ী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। ওই ব্যবসায়ীর স্ত্রী স্বামীর জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে জিএমপি টঙ্গী পশ্চিম থানায় গত ১৬ মার্চ একটি অভিযোগ করেন। অবশেষে ওই অভিযোগ মঙ্গলবার [২৭ এপ্রিল] টঙ্গী পশ্চিম থানায় এফআইআর ভুক্ত হয়। যার মামলা নম্বর ২২, ধারা: ১৪৩/৩৪১/৩২৩/৩৮৫/১১৪/৩৪ পেনাল কোড।

ছাত্রলীগ নেতা রেজাউলের সহযোগী মাদক কারবারি গ্রেফতার হওয়া জাকির ও নবীন মাদকের ব্যস্ত রোড হিসেবে পরিচিত টঙ্গী রেলওয়ে জংশন সংলগ্ন আমতলী কেরানীরটেক এলাকার মৃত হামিদ হাওলাদারের সন্তান। তাদের মা জয়তুন্নেছা স্থানীয়দের কাছে ফরিদপুন্নী নামে পরিচিত এবং জাকির ও নবীনকে স্থানীয়রা ফরিদপুন্নীর সন্তান বলে ডাকে।


বিভাগ : অপরাধ


এই বিভাগের আরও