মুনিয়ার আত্মহত্যা: সিন্ডিকেট রিপোর্টের সমালোচনা

যোগফল ডেস্ক

02 May, 2021 07:39am


মুনিয়ার আত্মহত্যা: সিন্ডিকেট রিপোর্টের সমালোচনা
ছবি : সংগৃহীত

গুলশানের একটি বাসা থেকে সম্প্রতি মোসাররাত জাহান মুনিয়া নামে এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর ঘটনাটিকে 'আত্মহত্যা' বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। নিহতের বোন নুসরাত জাহান 'আত্মহত্যায় প্ররোচনা'র অভিযোগে বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। 

আনভীর হাইকোর্টে আগাম জামিন আবেদন করেছিলেন। কিন্তু করোনাকালে জামিন শুনানি হয়নি। তার পরিবারের আট সদস্য এরমধ্যে দুবাই চলে গেছেন। আনভীর গ্রেপ্তার না হওয়ায় উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেছে। মামলার বাদি জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করেছেন।

এই ঘটনায় সার্বিকভাবে বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের কভারেজ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। 

বিবিসি বাংলা মিডিয়া কভারেজ নিয়ে প্রতিবেদন করেছে, "বসুন্ধরার এমডি, কথিত একটি 'আত্মহত্যার' মিডিয়া কভারেজ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড়"। 

ঘটনার পরে ডেইলি স্টার পত্রিকার রিপোর্ট নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়। পরে পত্রিকাটি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে এবং তাদের ইউটিউব চ্যানেলে সার্বিক মিডিয়া কভারেজ নিয়ে একটি পর্যালোচনা প্রচার করে, "গুলশানে তরুণীর লাশ উদ্ধার, মিডিয়ার নীতি নিয়ে প্রশ্ন"। মুনিয়ার লাশ উদ্ধারের ঘটনায় গত ২৯, ৩০ এবং ১ মে এই তিন দিন ধরে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে মুনিয়াকে নিয়ে নেতিবাচক কিছু তথ্য প্রকাশ হয়েছে।

শনিবার [১ মে ২০২১] দিনভর অ্যক্টিভিস্টরা এসব প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছেন। সাংবাদিকরা অনেকে দায় এড়াতে নিজের প্রকৃত অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। সোমবার [৩ মে ২০২১] অ্যাক্টিভিস্টরা ঢাকার শাহবাগে মুনিয়া হত্যার বিচার দাবিতে সমাবেশের ডাক দিয়েছেন।

মূলত একটি প্রতিবেদন শিরোনাম পরিবর্তন এবং কিছু সম্পাদনা করে একাধিক সংবাদমাধ্যমে একযোগে প্রকাশ হয়েছে; যেটাকে 'সিন্ডিকেটেড রিপোর্টিং' হিসেবে অভিহিত করা যায়। এখানে মোটামুটি পরিচিত কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো তুলে ধরা হচ্ছে, রুপায়ন গ্রুপের মালিকানাধীন দৈনিক দেশ রূপান্তর: বোনের লোভে লোভী মুনিয়া;

আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের মালিকানাধীন দৈনিক সময়ের আলো: পোশাকের মতো প্রেমিক বদলাতেন মুনিয়া; আহছানিয়া মিশনের মালিকানাধীন দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ: মুনিয়া সম্পর্কে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

শিরোনামগুলো থেকেই স্পষ্ট যে, এসব প্রতিবেদনে মুনিয়াকে 'বাজে মেয়ে' হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। আরও অনলাইন বহু পোর্টালে এই খবর প্রকাশ হয়েছে। 

প্রতিবেদনগুলো মূলত একটি প্রতিবেদন থেকে উৎসারিত। এক এক সংবাদমাধ্যম এক এক শিরোনামে প্রকাশ করলেও ভেতরে সবগুলো প্রতিবেদন পরস্পরের সাথে মিলে যায়। কোনো ক্ষেত্রে হুবহু মিলে, আবার কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা সম্পাদনার ফলে আংশিকভাবে মিলে। এগুলোর মধ্যে প্রথম গত ২৯ এপ্রিল বাংলা প্রতিদিন পোর্টালটিতে "একের পর এক প্রেমিক বদলে অভিজাত বনেছে মুনিয়া, বোন-ভগ্নিপতিকে বানিয়েছে ধনাঢ্য" শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশ হয়। এর পরদিন দেশ রূপান্তর এর প্রিন্ট ভার্সনে প্রকাশ হয় "বোনের লোভে লোভী মুনিয়া" শিরোনামের প্রতিবেদন। লক্ষ্যণীয় হলো, বাংলা প্রতিদিনের প্রতিবেদনটি 'গল্প' আকারে বর্ণিত হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে 'তথ্য' হিসেবে দাবি করা বিষয়গুলো কোনো সূত্র উল্লেখ ছাড়াই তুলে ধরা হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও কিছু তথ্যের সূত্র হিসেবে 'জানা যায়' 'অনেকেই মনে করেন' এসব অস্পষ্ট বরাত দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে দেশ রূপান্তর এর প্রতিবেদনটি 'অনুসন্ধানী প্রতিবেদন" আকারে উপস্থাপিত হয়েছে। যেমন, "বাড়িতে গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে", "এই প্রতিবেদককে বলেন", "মুনিয়ার একাধিক আত্মীয় বলেন", "মুনিয়ার সাবেক প্রেমিক দাবি করে দেশ রূপান্তরকে বলেন" ইত্যাদি শব্দগুচ্ছ থেকে বুঝা যায় যে, দেশ রূপান্তর সরেজমিনে অনুসন্ধান করে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। কিন্তু মূল ব্যাপার হচ্ছে, বাংলা প্রতিদিন এর "গল্প" এবং দেশ রূপান্তর এর "অনুসন্ধানী প্রতিবেদন" এর কিছু কিছু প্যারা অস্বাভাবিকভাবে হুবহু মিলে যায়!

সিন্ডিকেট রিপোর্টে ভুল তথ্য: একসাথে যে রিপোর্টটি বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে সেখানকার সব তথ্য বা বক্তব্য বুম বাংলাদেশ যাচাই করে দেখেনি। ফলে সেগুলোর সত্যমিথ্যার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তদিচ্ছি না। তবে ওই প্রতিবেদনে অন্তত একটি ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রতিবেদনটির এক জায়গায় লেখা হয়েছে, "নিলয়ের সঙ্গে প্রেম বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর ২ বছর বড় বোনের কাছে থেকে পড়াশোনা চালালেও এসএসসি পরীক্ষা দিয়েই মুনিয়া পাড়ি জমিয়েছিলেন ঢাকার উদ্দেশে।" অর্থাৎ, এখানে দাবি করা হয়েছে মুনিয়া এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় আসেন। কিন্তু এরমধ্যে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোতে মুনিয়ার পড়াশোনা সংক্রান্ত যেসব তথ্য প্রকাশ হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, মুনিয়া এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন ঢাকার একটি স্কুল থেকে। ২৭ এপ্রিল বাংলা ট্রিবিউনের এক রিপোর্টে লেখা হয়েছে, "জানা যায়, নগরীর মনোহরপুরের উজির দীঘির দক্ষিণপাড় এলাকার বাসিন্দা মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি সফিকুর রহমানের মেয়ে মোসারাত জাহান মুনিয়া ঢাকার মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী। এবার এ প্রতিষ্ঠান থেকে তার এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। এর আগে সে কুমিল্লা নগরীর বাদুরতলা এলাকার ওয়াইডব্লিউসিএ নামক একটি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে। পরে সে নগরীর নজরুল অ্যাভিনিউ এলাকার মডার্ন হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে এবং শেষে ঢাকার মিরপুর মনিপুরী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পাস করে। পরিবারে এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সে কনিষ্ঠ।"


বিভাগ : মুক্তমত


এই বিভাগের আরও