বর্বরতা থামানোর কেউ নাই?

আসাদুল্লাহ বাদল

16 Jan, 2020 11:20am


বর্বরতা থামানোর কেউ নাই?

গোল হয়ে জটলা পাকিয়ে একদল মানুষ ১৩ বছর বয়সী একজন কিশোরকে উল্টা করে ধরে রেখে মারধর করার দৃশ্য দেখছ। বিশেষত পায়ের তালুতে মারছে ওই কিশোরকে। তারা একরকম বিচারক সেজেছে। বাস্তবে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। যাকে মারছে তার নামে অভিযোগ সে একটি গরু চুরি করেছে। গরু চুরির ব্যাপারটি কেবল অভিযোগ, মোটেও প্রমাণিত নয়। গরু চুরি প্রমাণ হলেই ওই কিশোরকে এভাবে মারধর করা যাবে কিনা এই প্রশ্ন জটলা পাকানো ব্যক্তিদের কারও মাথায় একবার আটকায়নি।

এই জটলা পাকানো তামাশা দেখা মানুষগুলো সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করে। ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। তাদের দেওয়া ভোটে মেম্বার, চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। সংসদ সদস্যরা ভোট দিয়ে দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে। সংসদ সদস্যদের মেজরিটিতে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভা নির্বাচিত হয়। এই জটলা পাকানো ব্যক্তিরা চাঁদে দণ্ডিত সাইদী দেখা যাওয়ার হিড়িকে মারা পড়ে। এরাই কখনও মনে করে পদ্মা সেতুতে কল্লা লাগে। ফলে তারা গণপিটুনিতে অংশ নেয়। তাদের ভূমিকাকে ছোট করে দেখছি না। এদের অংশ নেওয়ার মধ্যেই আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সহজাত ভাষা রক্ষা করেছি। স্বৈরাচার পতন ঘটিয়েছি। কিন্তু অনিয়ম, দুর্নীতি ও শোষণমুক্তি ঘটাতে পারিনি। এহেন বর্বরতা থামানোর মতো একটু ‘রা’ উচ্চারণ করাতে পারিনি।

গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ থানার একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া এটি। তথাকথিত এসব বিচারক ও তামাশা দেখা ব্যক্তিরা অভিযুক্ত ও নির্যাতনের শিকার শিশুর পিতার নিকট থেকে ৩ হাজার টাকা নিয়েছে। ১০ হাজার টাকা দাবি করেছিল। দাবি পূরণ করতে না পারার কারণে এইরকম বর্বরতার চিত্র দেখতে পেয়েছে দেশবাসী।

যে গরু চুরি হয়েছে বলে অভিযোগ, ওই গরুর দাম মাত্র ১০ হাজার টাকা! না, অন্য কোন কুমতলবে এই ঘটনা ঘটেছে। বর্বরতা চালানো ব্যক্তিদের একজন ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার শিক্ষক। ওই ব্যক্তি কেমন শিক্ষক? আসলে তিনি কাউকে শিক্ষিত হিসাবে গড়ে তোলার পাঠ দিতে পারে কিনা এই প্রশ্ন জারি থাকল। ছবিতে অন্তত শতেক মানুষের চেহারা দেখা যাচ্ছে। শতেক মানুষের মধ্যে কেউ আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রসঙ্গে অবগত নেই, এমন চিত্র আমাদেরকে কি ইঙ্গিত করে। আমরা কি আসলে শিক্ষাদীক্ষা কিছু অর্জন করেছি, না হুজুগে মেতেই দৌড়াচ্ছি। শিশুটি যখন মা রে, বাবা রে বলে চিৎকার করেছে, তারা কেউ আন্দাজ করতে পারেনি, এহেন ঘটনা দেখাও অন্যায়।

নির্যাতনের শিকার শিশুর মা ও কয়েকজন স্বজন ঘটনাস্থলেই ছিল। কিন্তু তারা বর্বরদের হাত থেকে ওই শিশুকে রক্ষা করতে পারেনি। স্বাভাবিকভাবে ঘটনাটি কেউ কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও জানায়নি। ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার পর অনেকের কানে পৌঁছে ঘটনাটি। তখন পুলিশ নড়েচড়ে বসে।

যিনি ভিডিও ধারণ করেছেন, তাকে সতর্কতাও নাগরিক জ্ঞান সম্পন্ন মনে করি। যেভাবেই হউক অন্তত ঘটনাটি নজরে আনতে পেরেছেন। কিন্তু তিনি কেন ভিডিও ধারণ করার চেয়ে প্রতিরোধে বাধা দেননি এই প্রশ্নও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বিশ্বজিৎকে কুপিয়ে মারার সময়ও একই ঘটনা ঘটেছিল। অবশ্য এখন বলতে পারি বিশ্বজিৎকে কেউ মারেনি। যদি মেরেই থাকে, তাহলে শাস্তি কেউ পেয়েছে কি?

আসাদুল্লাহ বাদল : সম্পাদক, দৈনিক যোগফল।



এই বিভাগের আরও