মুক্তিযুদ্ধের ৬৪ পত্রিকা

আসাদুল্লাহ বাদল

29 Feb, 2020 02:29pm


মুক্তিযুদ্ধের ৬৪ পত্রিকা
স্বাধীনতা পত্রিকা

গণমাধ্যমে ইতিহাস চর্চা হয় কখন? গণমাধ্যমে ইতিহাসের খবর প্রচার হয় কখন? এমন সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ হলেও ইতিহাস চর্চার সময় বাড়ানো সহজ মনে হয় না।

মুক্তিযুদ্ধের সময়সীমা ২৬৬ দিনের প্রসঙ্গ থাকলেও মার্চ ও ডিসেম্বর মাস ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা ও খবর প্রকাশে ভাটা রয়েছে।

স্মরণীয়, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও খবর ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপি প্রচার পেলেও ২৬ মার্চের সামান্য আগে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা শুরু হয়। বড়জোর ১ মার্চ থেকে শুরু হলেও ২৬ মার্চের পরে আর এই প্রচার প্রবণতা দেখা যায় না।

১৬ ডিসেম্বরের পরেও এই প্রবণতা দেখা দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে বছরব্যাপি ইতিহাস সূত্রের খবর প্রচার না হওয়ার কারণে গণমাধ্যমের ভূমিকা ও গণহত্যার চিত্র যথাযথ প্রচার পায়নি।

পাকিস্তান সরকার বিদেশি পত্রপত্রিকা দেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছিল একাত্তরে। কিন্তু দেশ থেকে অনেক পত্রিকা প্রকাশ হয়েছিল। ৫৪টি দেশে ১৩৭টি পত্রিকায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নিয়মিত খবর প্রচার হয়েছিল।

প্রথমদিকে জানা যায় দেশে ৪৫টি পত্রিকা প্রকাশের কথা। পরে এই তালিকা দীর্ঘ হয়। সবশেষ হিসাবে এই সংখ্যা ৬৪। এটি আরও বাড়তেও পারে।

যে ৬৪টি পত্রিকা প্রকাশ হয়েছিল, সেসব পত্রিকার নাম কী? যোগফল পাঠকদের মাধ্যমে রক্তঝরা মার্চে নিবেদন করা হলো ক্ষুদ্র একটি চেষ্টা।

পরিস্থিতির কারণে সাতটি পত্রিকায় সম্পাদক প্রকাশকের নাম ছাপা হয়নি। একই নামে ও একই বানানেও পত্রিকা প্রকাশ হয়েছে। আবার একই নামের ভিন্ন বানানেও পত্রিকা প্রকাশ হয়েছে। সাংগঠনিকভাবে প্রকাশ করা পত্রিকায়ও সম্পাদকের নামের স্থলে সংগঠনের নাম প্রচার করা হয়েছে।

হাসিনা আহমেদ ও ডক্টর মুনতাসীর মামুনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে:

০১। অমর বাংলা, সম্পাদক: এ বি ছিদ্দিকী; 
০২। অগ্রদূত, সম্পাদক: আজিজুল হক; 
০৩। অভিযান, সম্পাদক: সিকান্দার আবু জাফর, (তিনি সমকাল সম্পাদক হিসাবে পরিচিত);
০৪। অগ্নিবাণ, সম্পাদক: নাম নেই; 
০৫। আমার দেশে, সম্পাদক: খাজা আহমদ; 
০৬। আমোদ, সম্পাদক: মোহাম্মদ ফজলে রাব্বী; 
০৭। ইশতেহার, সম্পাদক: নাম নেই; 
০৮। উত্তাল পদ্মা সম্পাদক : মুহাম্মদ আবু সাহিদ খান; 
০৯। ওরা দুর্জয় ওরা দুর্বার, সম্পাদক: বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও প্রচার দফতর; 
১০। গণ মুক্তি, সম্পাদক: মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, (তিনি সাপ্তাহিক ইত্তেফাক ও হককথার প্রকাশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন);
১১। গ্রেনেড, সম্পাদক: ‘বিচ্চু’ গেরিলা বাহিনী; 
১২। জয় বাংলা (০১) সম্পাদক: আহমদ রফিক; 
১৩। জয় বাংলা (০২), সম্পাদক: এম জি হায়দার রহমত উল্লাহ; 
১৪। জয় বাংলা (০৩), সম্পাদক: মুক্তিফৌজ (ছদ্মনাম), 
১৫। জয় বাংলা (০৪), সম্পাদক: আব্দুল বাসিত; 
১৬। জন্মভূমি, সম্পাদক: মোস্তফা আল্লামা; 
১৭। জাগ্রত বাংলা, সম্পাদক: বাঙালি (ছদ্মনাম); 
১৮। জাতীয় বাংলাদেশ, সম্পাদক: এ এম এম আনোয়ার; 
১৯। দাবানল, সম্পাদক: মো. জিন্নত আলী; 
২০। দুর্জয় বাংলা, সম্পাদক: তুষার কান্তি কর; 
২১। দেশ বাংলা, সম্পাদক: ফেরদৌস আহমদ কোরেশী; 
২২। ধুমকেতু, সম্পাদক: অমর সাহা; 
২৩। নতুন বাংলা [ন্যাপের প্রকাশনা], সম্পাদক: অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ; 
২৪। প্রতিনিধি, সম্পাদক: আহমেদ ফরিদউদ্দিন; 
২৫। বঙ্গ বাণী, সম্পাদক: কে এম হোসেন (খন্দকার মকবুল হোসেন); 
২৬। বাংলার কথা, সম্পাদক: ওবায়দুর রহমান; 
২৭। বাংলার বাণী, সম্পাদক: আমির হোসেন, (তিনি পরে ডেইলি সান সম্পাদনা করেন);
২৮। বাংলার ডাক (০১), সম্পাদক: দীপক রায় চৌধুরী; 
২৯। বাংলার ডাক (০২), সম্পাদক: সুশীল সেনগুপ্ত; 
৩০। বাংলার মুখ, সম্পাদক: ছিদ্দিকুর রহমান আশরাফী; 
৩১। বাংলাদেশ (০১), সম্পাদক: আবুল হাসান চৌধুরী; 
৩২। বাংলা দেশ (০২), সম্পাদক: অধ্যক্ষ শেখ আব্দুর রহমান; 
৩৩। বাংলা দেশ (০৩), সম্পাদক: এসএম ইকবাল, মিন্টু বসু ও হেলাল উদ্দিন;
৩৪। বাংলাদেশ (০৪), সম্পাদক: কীর্তি (মিজানুর রহমান);
৩৫। বাংলাদেশ (০৫), সম্পাদক: আব্দুল মতিন চৌধুরী;
৩৬। বাংলা দেশ (দৈনিক ০৬), সম্পাদক: কাজী মাজহারুল হুদা;
৩৭। বাংলাদেশ (০৭), সম্পাদক: ফেরদৌস মুরশিদ;
৩৮। বাঙলাদেশ, সম্পাদক: আমিনুল হক বাবুর;
৩৯। বিপ্লবী বাংলাদেশ, সম্পাদক: নুরুল আলম ফরিদ;
৪০। মায়ের ডাক, সম্পাদক: সালেহা বেগম;
৪১। মুক্ত বাংলা (০১), সম্পাদক: আবুল হাসনাত সাআদত খান;
৪২। মুক্তবাংলা (০২), সম্পাদক: ‘দ-জ’ (ছদ্মনাম);
৪৩। মুক্তি (০১), সম্পাদক: শরিফউদ্দীন আহমেদ;
৪৪। মুক্তি (০২), সম্পাদক: সাহাবুদ্দীন খান;
৪৫। মুক্তিযুদ্ধ, সম্পাদক: কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি);
৪৬। রণাঙ্গন (০১), সম্পাদক: রণদূত (ছদ্মনাম);
৪৭। রণাঙ্গন (০২), সম্পাদক: মুস্তাফা করিম;
৪৮। রণাঙ্গন (০৩), সম্পাদক: খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল;
৪৯। লড়াই, সম্পাদক: (নাম নাই);
৫০। স্বদেশ, সম্পাদক: গোলাম সাবদার সিদ্দিকী;
৫১। স্বাধীনতা (প্রতিরোধ), সম্পাদক: (নাম নাই);
৫২। স্বাধীনতা, সম্পাদক: অরুণাভ সরকার;
৫৩। স্বাধীন বাংলা (০১), সম্পাদক: পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (চট্টগ্রাম);
৫৪। স্বাধীন বাংলা (০২); সম্পাদক: সরকার কবীর খান;
৫৫। স্বাধীন বাংলা (০৩), সম্পাদক: জাহানারা কামরুজ্জামান ও এসএ আল মাহমুদ চৌধুরী;
৫৬। স্বাধীন বাংলা (০৪), সম্পাদক: খোন্দকার সামসুল আলম দুদু;
৫৭। স্বাধীন বাংলা (০৫), সম্পাদক: (নাম নাই);
৫৮। স্বাধীন বাংলা (০৬), সম্পাদক: আ.ন.ম আনোয়ার;
৫৯। সংগ্রামী বাংলা (০১), সম্পাদক: আব্দুর রহমান;
৬০। সংগ্রামী বাংলা (০২), সম্পাদক: এমদাদুল হক;
৬১। সাপ্তাহিক বাংলা, সম্পাদক: মাইকেল দত্ত;
৬২। সোনার বাংলা (০১), সম্পাদক: সরকার কবীর খান;
৬৩। সোনার বাংলা (০২), সম্পাদক: ওবায়দুর রহমান ও
৬৪। সোনার বাংলা (০৩), এম এ শাহ (শাহ মোদাব্বির আলী)।

সরকার কবীর খান দুইটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। একটি ‘স্বাধীন বাংলা’ আর একটি ‘সোনার বাংলা’।

ওবায়দুর রহমানও দুইটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। একটি ‘সোনার বাংলা’ ও অপরটি ‘বাংলার কথা’।

সবচেয়ে বেশি একই নামে সাতটি প্রকাশ হওয়া পত্রিকা হচ্ছে ‘বাংলাদেশ’। ‘বাঙলাদেশ’ বানানে আর একটি পত্রিকা প্রকাশ হয়। ‘স্বাধীন বাংলা’ নামে ছয়টি পত্রিকা প্রকাশ হয়।

‘জয় বাংলা’ নামে চারটি পত্রিকা প্রকাশ হয়। ‘সোনার বাংলা’ নামে তিনটি পত্রিকা প্রকাশ হয়। ‘রণাঙ্গণ’ নামেও তিনিটি পত্রিকা প্রকাশ হয়।

‘মুক্তি’ ‘সংগ্রামী বাংলা’ ও ‘মুক্ত বাংলা’ এবং ‘বাংলার ডাক’ নামে দুইটি করে পত্রিকা প্রকাশ হয়।

‘স্বাধীনতা’ নামে দুইটি পত্রিকা প্রকাশ হলেও একটি নামে ব্র্যাকেটে ‘প্রতিরোধ’ লেখা ছিল।

এসব পত্রিকার মধ্যে একমাত্র ‘মায়ের ডাক’ একজন নারী সম্পাদক প্রকাশ করেন। তিনি সালেহা বেগম। এছাড়া যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশ হয় ‘স্বাধীন বাংলা’ নামের একটি পত্রিকা। এতে আর একজন সম্পাদক ছিলেন। এই পত্রিকাটির নারী সম্পাদক জাহানারা কামরুজ্জামান।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সম্পাদনা করা এসব পত্রিকার কয়েকজন সম্পাদক প্রকাশক কখনও সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন না। ফলে কেউ কেউ সম্পাদক প্রকাশক না লিখে পরিচালক লিখে পত্রিকা প্রকাশ করেছেন। [৩৯] ০১ মার্চ ২০২০


বিভাগ : শিকড়


এই বিভাগের আরও