আমাদের হাত বাধা : মতিউর রহমান চৌধুরী

যোগফল ডেস্ক

16 Mar, 2020 06:47am


আমাদের হাত বাধা : মতিউর রহমান চৌধুরী
মতিউর রহমান চৌধুরী

মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে তুরস্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি। বার্তা সংস্থাটির সাংবাদিক এসএম নাজমুস সাকিবের নেওয়া ওই সাক্ষাৎকার হুবহু মানবজমিনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। মানবজমিন থেকে যোগফলের পাঠকদের জন্য নিবেদন করা হলো।

রোববার (১৫ মার্চ ২০২০) প্রকাশ হওয়া ওই সাক্ষাৎকারে বলা হয়, বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় সম্পাদক ও আরও ৩১ জনের বিরুদ্ধে দেশের ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’-এর অধীনে মানহানির মামলা করা হয়েছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি তার সাক্ষাৎকার নিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী এই সাক্ষাৎকারে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির কথা জানিয়েছেন। বাংলাদেশে সাংবাদিকতার বিদ্যমান পরিবেশ নিয়ে কথা বলেছেন। আলোকপাত করেছেন এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ওপর। সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা হরণের অভিযোগে অসংখ্য মানবাধিকার সংগঠন এই আইনের সমালোচনা করেছে।

সাক্ষাৎকারে মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক ও এক প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

এতে বলা হয়, সোমবার শাসক দল আওয়ামী লীগের একজন আইন প্রণেতা (এমপি) ৩২ জনের বিরুদ্ধে দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ওই মামলা দায়ের করেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে বলেছে যে, এই আইনের অস্পষ্ট ও অত্যন্ত স্থূল ধারাসমূহ এবং কঠোর শাস্তির বিধান নিয়ে তারা শঙ্কিত। এসব বিধান বাকস্বাধীনতার অধিকার বৈধভাবে প্রয়োগের সুযোগ সঙ্কুচিত করে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই আলোকচিত্রী শফিকুল ইসলাম কাজল কোথায় আছেন, কী অবস্থায় আছেন তা বের করতে জরুরিভিত্তিতে তদন্ত শুরু করতে হবে। তিনি যদি আটক থাকেন, তাহলে তাকে মুক্তি দিতে হবে। তিনি ও বাকি ৩১ জনের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, ২০১৮ সালের অক্টোবরে সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাশ হওয়ার পর ১১ মাসে এই আইনের অধীনে সাইবার ট্রাইব্যুনালে প্রায় ৪০০ মামলা দায়ের হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০টিরও অধিক মামলা প্রমাণ না থাকায় বাতিল করা হয়েছে।

আনাদোলু এজেন্সি (এএ): আপনি যেমনটা জানেন যে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও সম্পাদক পরিষদ (বাংলাদেশের জাতীয় পত্রিকার সম্পাদকদের প্ল্যাটফর্ম) এই মামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রতি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের করা এই মামলা প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কী? এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আপনার পত্রিকার অবস্থানই বা কী?

মতিউর রহমান চৌধুরী (এমআরসি): আমার ও মানবজমিনের জন্য এটি সাহসের বিষয় যে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও সম্পাদক পরিষদ এই ব্যাপারে কড়া বিবৃতি দিয়েছে। এই মামলার যে মাত্রা ও গুরুত্ব, তা সবার জানা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এই বিষয়টি দেশের প্রচলিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী মোকাবিলা করবো।

এএ: একজন জ্যেষ্ঠ আলোকচিত্রী সাংবাদিক, যিনি এই মামলার ৩২ আসামির একজন, তিনি নিখোঁজ বলে খবর বেরিয়েছে। তিনি কি আপনার পত্রিকাতেই কাজ করেন? তার ব্যাপারে কি কোনো বিস্তারিত তথ্য জানা গেছে?

এমআরসি: আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করছি। যেই জ্যেষ্ঠ আলোকচিত্রী সাংবাদিকের কথা আপনি বলছেন, তিনি মানবজমিনের সদস্য নন। তিনি কোথায় আছেন সেই ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনও তথ্য নেই।

এএ: শাসক দলের বহিষ্কৃত একজন নেত্রীর গ্রেপ্তার  (গ্রেপ্তার হওয়ার পর বহিষ্কার) নিয়ে আপনার পত্রিকায় কী খবর ছাপা হয়েছিল যা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে যেতে পারে? মামলা দায়েরকারী আইনপ্রণেতাই বা কেন মনে করলেন যে, তিনি মানহানির শিকার হয়েছেন?

এমআরসি: একজন যুব মহিলা লীগ নেত্রী (শাসক দল আওয়ামী লীগের নারী শাখা) সম্প্রতি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। আমাদের সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের সময় আটক করা ওই নেত্রী বেশ কয়েকজন ব্যক্তির নাম বলেছেন যারা তার ও তার ব্যবসার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে আমাদের প্রতিবেদনে কোনও ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি। এমন কোনও ইঙ্গিতও দেওয়া হয়নি যে ওই ব্যক্তিরা আসলে কারা ছিলেন।

এএ: আপনি কি মনে করেন যে, আপনি ও আরও ৩১ জনের বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে, তার কোনও আইনি ভিত্তি আছে? আপনার সংবাদ প্রতিবেদন কি দেশের কোনও আইন ভঙ্গ করেছে?

এমআরসি: এই মামলার কোনও আইনি ভিত্তি নেই, কেননা মামলা দায়েরকারী ব্যক্তির নাম সংবাদে উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি এমন কোনও ইঙ্গিতও দেওয়া হয়নি যে, আমাদের প্রতিবেদন দেখে কারও মনে হবে, ওই পাপিয়া কেলেঙ্কারিতে (ওই নেত্রীর নাম) তিনি জড়িত ছিলেন। তিনি নিজ থেকেই মামলাটি দায়ের করেছেন আমাদের হয়রানি করার জন্য ও ভয়ভীতি দেখানোর জন্য। তিনি এমন আইন ব্যবহার করেছেন যা অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। সম্পাদক পরিষদ এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে সব সময়ই সোচ্চার ছিল। এই আইন মুক্তমত দমন করা ও কণ্ঠরোধের হাতিয়ার।

এএ: কয়েক মাস আগে আরেকজন শীর্ষস্থানীয় বাংলাদেশি সম্পাদকের বিরুদ্ধে ঢাকায় ৯ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়। কিছু প্রতিবেদন বের হয়েছিল যে খবর প্রকাশের জন্য সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হচ্ছে। আপনি কি মনে করেন, কোনও বিশেষ পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে বা পরোক্ষভাবে পত্র-পত্রিকার ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে আক্রমণ করা হচ্ছে? যদি তা-ই হয়, তাহলে বাংলাদেশি সাংবাদিকরা কাজ করছেন কীভাবে?

এমআরসি: এই পরিস্থিতিতে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন। আমাদের হাত বাধা। আমাদেরকে সেলফ-সেন্সরশিপের আশ্রয় নিতে হয়। অন্যথায় পরিণতি ভোগ করতে হয়।

এএ: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কীভাবে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা লঙ্ঘন করে বা বাধাগ্রস্ত করে?

এমআরসি: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাকস্বাধীনতা হরণ করে। এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন যারাই রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবে, তাদের বাছবিচারহীনভাবে সাজা দেওয়া যায়। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই আইন প্রয়োগের ফলে অনেককেই মারাত্মক দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে, যদিও দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সংগঠন থেকে এর নিন্দা জানানো হয়েছে।

এএ: আপনি কি মনে করেন যে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের যেসব সংগঠন আছে, তারা ঝুঁকির মুখে থাকা সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে যথেষ্ট সমর্থন দিচ্ছে? এই সংগঠনগুলো কি তাদের সাংবাদিক সহকর্মীদের জন্য কাজ করছে? নাকি কোনও প্রভাবশালী মহল এই সংগঠনগুলোকে কলুষিত করেছে?

এমআরসি: আমার ক্ষেত্রে অনেক সংগঠন সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিয়েছে। এটি সত্য যে প্রত্যাশিত সমর্থন পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন মহল থেকে এসব সংগঠনের ওপরও চাপপ্রয়োগ করা হয়।


বিভাগ : কাঠগড়া


এই বিভাগের আরও