আজকের শিশুরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে ভবিষ্যতের সমাজ, রাষ্ট্র ও নেতৃত্ব। তাই প্রতিটি শিশুর নিরাপদ, সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করা শুধু একটি পরিবারের দায়িত্ব নয়, বরং রাষ্ট্র, সমাজ এবং প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই অসংখ্য শিশু প্রতিদিন শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। শুধু দরিদ্র পরিবার নয়, বিত্তবান পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এমনকি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও শিশুরা নানা ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে।
শিশুকে শৃঙ্খলাবোধ শেখানো এবং সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা অভিভাবক ও শিক্ষকদের দায়িত্ব। তবে সেই শাসন কখনোই অপমান, ভয়ভীতি, শারীরিক শাস্তি কিংবা মানসিক নির্যাতনে পরিণত হওয়া উচিত নয়।
শাসনের উদ্দেশ্য ভুল সংশোধন করা, আর নির্যাতনের ফল ভয়, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও মানসিক ক্ষত। যে শিশু সম্মানের বদলে ভয় পেয়ে বড় হয়, সে কখনো সুস্থ ব্যক্তিত্ব নিয়ে বিকশিত হতে পারে না।
শুধু শারীরিক আঘাতই নয়, অপমানজনক কথা, অবহেলা, তুলনা কিংবা ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করাও শিশুর জন্য ভয়াবহ মানসিক নির্যাতন।
‘তুমি কিছুই পারবে না’, ‘তুমি আমাদের লজ্জা’—এ ধরনের কথাগুলো শিশুর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়। অনেক মানুষ বড় হওয়ার পরও শৈশবের এসব অপমান ভুলতে পারেন না। শারীরিক ক্ষত একসময় শুকিয়ে যায়, কিন্তু মানসিক ক্ষত অনেক সময় সারাজীবন থেকে যায়।
শৈশবেই মানুষের মস্তিষ্ক সবচেয়ে দ্রুত বিকশিত হয়। এই সময়ে নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও ইতিবাচক পরিবেশ শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিপরীতে ভয় ও সহিংসতার পরিবেশ তার শেখার ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ জীবনকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
ইসলাম শিশুদের প্রতি দয়া, স্নেহ ও সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের সঙ্গে কোমল আচরণ করতেন এবং তাদের মর্যাদা দিতেন।
তিনি বলেছেন, “যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (জামে তিরমিজি)
এ শিক্ষা প্রমাণ করে, শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা ইসলামের মানবিক আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
বিদ্যালয় বা মাদ্রাসা এমন জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে শিশুরা ভয় নয়, আনন্দ নিয়ে শিখবে। শিক্ষক শুধু পাঠদান করবেন না, বরং একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখবেন। ইতিবাচক শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা ও সম্মানই হতে পারে শিক্ষার প্রকৃত ভিত্তি।
বর্তমান সময়ে শিশুদের নিরাপত্তা শুধু বাস্তব জগতেই নয়, ডিজিটাল জগতেও নিশ্চিত করতে হবে। সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ইতিবাচক অভিভাবকত্বের চর্চা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতি বাস্তবায়ন, সহজ অভিযোগ ব্যবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের ওপর। তাই শিশুদের ভয় দেখিয়ে নয়, ভালোবাসা, নিরাপত্তা, নৈতিক শিক্ষা ও সম্মানের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে। কারণ একটি নিরাপদ শৈশবই পারে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
লেখক: সাবেক প্রিন্সিপাল, জামেয়া দ্বীনীয়া এবং প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, তা'মিরুল মিল্লাত মাদ্রাসা, টঙ্গী শাখা।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম