চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে দেশীয় মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতেন না। যোগাযোগ রাখতেন বিদেশি নম্বর ও বিভিন্ন এনক্রিপটেড মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে। একই সঙ্গে নিয়মিত বদলাতেন অবস্থান, গাড়ি, চালক ও চলাচলের রুট। শেষ পর্যন্ত ভারত পালানোর আগেই যশোরে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তার অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।
তিনি জানান, ডেভিড ইমন ও তার সহযোগীরা সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতেন না। বিদেশি নম্বর ও এনক্রিপটেড অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করায় তাদের অবস্থান শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারের আশঙ্কা তৈরি হওয়ার পর দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করেন ডেভিড ইমন। তদন্তে জানা যায়, বিদেশে অবস্থানরত চট্টগ্রামের আরেক আলোচিত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার পরামর্শে যশোরের ঝিকরগাছা সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে পালানোর ছক কষেন তিনি। সীমান্ত পার হওয়ার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ভারতে পৌঁছানোর পর কারা তাকে গ্রহণ করবে, তাও আগেই নির্ধারণ করা হয়েছিল।
পুলিশ সুপার জানান, প্রথমে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার পথে কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকায় তাকে আটকের চেষ্টা করা হয়। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে যান তিনি। পরে ঢাকায় গিয়ে গাড়ি, চালক ও চলাচলের ধরন পরিবর্তন করেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মুন্সীগঞ্জের পদ্মা সেতুর টোল প্লাজায় চেকপোস্ট বসানো হলেও সেখান থেকেও বেরিয়ে যেতে সক্ষম হন।
এরপর তিনি খুলনার দিকে যাচ্ছেন এমন তথ্যের ভিত্তিতে রূপসা এলাকায় আরেকটি চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে রুট পরিবর্তন করে গোপালগঞ্জ হয়ে নড়াইলের দিকে চলে যান। এভাবে টানা তিনবার পুলিশের নজর এড়িয়ে যান ডেভিড ইমন।
পরবর্তীতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যশোর জেলা পুলিশের সহযোগিতায় বুধবার (২৯ জুলাই) ভোরে যশোর সদর উপজেলার ঝুমঝুমপুর এলাকায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে ডেভিড ইমন ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানায়, গত ১৩ জুন পাহাড়তলীতে যুবদল নেতা মাসুদ চৌধুরী হত্যা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে সন্ত্রাসী চক্রটির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তদন্তের ধারাবাহিকতায় ২২ জুলাই ঢাকার মহানগর এলাকা থেকে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ইলিয়াস ওরফে হামা ইলিয়াসকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে ডেভিড ইমন ও তার সহযোগীদের অবস্থান এবং কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই তার অবস্থান শনাক্তের অভিযান শুরু হয়।
এ ছাড়া ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিডিএনের মালিকের কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি এবং প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায়ও একই চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
উল্লেখ্য, পাহাড়তলীতে যুবদল নেতা মাসুদ চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, ডিডিএনের মালিকের কাছে চাঁদা দাবি এবং একাধিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ডেভিড ইমনের নাম উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বারবার অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকলেও শেষ পর্যন্ত তার পালানোর পরিকল্পনা সফল হয়নি।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম