রংপুর অঞ্চলের তিস্তাপাড়ের মানুষের কাছে তিস্তা নদী যেন আশীর্বাদের চেয়ে অভিশাপই বেশি। নদীতে পানি বাড়লে বন্যায় তলিয়ে যায় ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি, আর পানি কমলেই শুরু হয় ভয়াবহ নদীভাঙন। বছরের পর বছর এই দুই সংকটের মধ্যেই জীবন কাটছে লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার হাজারো মানুষের।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকাল থেকে তিস্তার পানি কমতে শুরু করলেও বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের উদ্বেগ কমেনি। কারণ পানি নামার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়েছে নতুন করে নদীভাঙনের শঙ্কা।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার পশ্চিম হরিণচড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল বাকি জানান, বুধবার সকাল থেকে নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে তাদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। এতে পরিবার ও গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হন তারা। পানিতে তলিয়ে গেছে রোপা আমনের ক্ষেত। কয়েক দিনের মধ্যে পানি না নামলে ফসলের বড় ধরনের ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
স্থানীয় ভাষায় তিনি বলেন, “তিস্তাত পানি বাড়লেও হামার বিপদ, নামি গ্যাইলেও বিপদ। পানি বাড়লে বান হয়, আর পানি নামলেই শুরু হয় নদীভাঙন। হামার কষ্টের যেন শেষ নাই।”
গঙ্গাচড়া উপজেলার চর নেহালি গ্রামের কৃষক আকবর আলী জানান, গত রাতে তার বাড়িতে হাঁটুসমান পানি ছিল। তাই পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছে নিরাপদ স্থানে। তার ভাষ্য, গত দেড় মাস ধরে তিস্তার পানি বারবার বাড়ছে-কমছে। এতে একদিকে বন্যা, অন্যদিকে ভাঙনে তাদের গ্রামের প্রায় ২০০টি বসতভিটা ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে চলে গেছে।
তিনি বলেন, “আমার বাড়িটাও এখন নদীর খুব কাছাকাছি। এবার ভাঙন শুরু হলে শেষ সম্বলটুকুও আর রক্ষা হবে না।”
একই চিত্র কালীগঞ্জ উপজেলার শৈলমারী চরেও। কৃষক হযরত আলী জানান, বুধবার সারাদিন তাদের গ্রাম পানির নিচে ছিল। ঘরে পানি ঢুকেছে, রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। তার ভাষায়, “পানি বাড়লে বন্যা, পানি কমলে ভাঙন—দুই দিক থেকেই সর্বনাশ।”
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় লালমনিরহাটের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি ছিল ৫২.১০ মিটার, যা বিপৎসীমার মাত্র ৫ সেন্টিমিটার নিচে। সকাল ৯টার দিকে পানি আরও ২ সেন্টিমিটার কমে। কাউনিয়া ও তারাপুর পয়েন্টেও পানি বর্তমানে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পাউবোর রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, উজানে ভারত থেকে নতুন করে পাহাড়ি ঢল না এলে পানি আরও কমবে। গত দেড় মাস ধরে তিস্তার পানি ওঠানামা করছে এবং এ অঞ্চলে স্বল্পস্থায়ী বা ফ্ল্যাশ বন্যার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, চলতি বছরে তিন দফা বন্যা ও নদীভাঙনে রংপুর অঞ্চলে ৫ শতাধিক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে এবং কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলায় তৃতীয় দফার বন্যায় প্রায় ৯ হাজার ৬০০ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রংপুর কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম