অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের সানশাইন কোস্টের ৪০ বছর বয়সী কোর্টনি ব্রাউন পেশায় একজন লাইসেন্সধারী সাপ ধরার কর্মী। বিশ্বের অন্যতম বিষধর সাপসহ বিভিন্ন প্রজাতির সরীসৃপ ধরে নিরাপদ পরিবেশে ছেড়ে দেওয়াই তার কাজ। তবে কোর্টনির কাছে সাপের চেয়েও বেশি ভয়ংকর অপরিচিত কিছু পুরুষের আচরণ।
লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই সন্তানের মা কোর্টনি প্রায় তিন বছর ধরে পেশাগতভাবে সাপ ধরছেন। গরমের মৌসুমে দিনে তাকে প্রায় ১০টি পর্যন্ত সাপ ধরার ডাক সামলাতে হয়। বিষধর সাপের সামান্য অসতর্কতাতেই কামড়ের শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও এ কাজকে তিনি ভয় পান না।
কোর্টনি জানান, অনেক সময় অপরিচিত মানুষের বাড়িতে তাকে একাই যেতে হয়। বেশিরভাগ মানুষ সহযোগিতা করলেও কিছু পুরুষ তাকে সন্দেহজনক বা নির্জন জায়গায় আসতে বলেন। ফলে প্রতিবার বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় নিজের নিরাপত্তার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হয়।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কাজের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করার কারণে কটূক্তি, অশালীন মন্তব্য ও অনলাইন ট্রলের শিকার হতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সাপ ধরার এই পেশায় আসার আগে করপোরেট চাকরি করতেন কোর্টনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও সেই জীবন তাকে তৃপ্ত করতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই প্রাণী, বিশেষ করে সাপের প্রতি তার আলাদা আগ্রহ ছিল। অবসর সময়ে রাতে হাঁটতে বের হয়ে সাপ খোঁজা এবং স্থানীয় প্রজাতি সম্পর্কে জানার অভ্যাসও ছিল তার।
দুই মেয়ে বড় হওয়ার পর নতুন করে কর্মজীবনে ফেরার সুযোগ পান কোর্টনি। তখন শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, অর্থবহ একটি কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করেন সাপ ধরার পেশা।
এই কাজের জন্য বিষধর সাপ ধরার বিশেষ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসা ও বিভিন্ন প্রজাতির সাপ শনাক্ত করার কোর্স করেন তিনি। প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র পাওয়ার পর শুরু করেন পেশাগতভাবে সাপ উদ্ধার।
কোর্টনির কাছে সবচেয়ে বেশি আসা ডাকগুলোর একটি কার্পেট পাইথন ধরার জন্য। আকারে বড় হওয়ায় এসব সাপ বাড়িতে ঢুকলে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তবে কার্পেট পাইথন বিষধর নয় এবং সাধারণত মানুষকে আক্রমণ করে না।
এর পাশাপাশি ইস্টার্ন ব্রাউন স্নেক ও রেড-বেলিড ব্ল্যাক স্নেকের মতো অত্যন্ত বিষধর সাপও ধরেন কোর্টনি। এসব সাপ দ্রুত চলাফেরা করায় উদ্ধারের সময় তাকে বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়।
কোর্টনির মতে, সাপকে ঘিরে মানুষের মধ্যে অযথা ভয় কাজ করে। তার ভাষায়, সাপ সাধারণত আক্রমণাত্মক নয়; বিপদ অনুভব করলেই আত্মরক্ষার শেষ উপায় হিসেবে কামড় দেয়।
বিষধর সাপ ধরার সময় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে বিশেষ হুক ব্যবহার করেন কোর্টনি। পরিস্থিতি অনুযায়ী সাপকে নিয়ন্ত্রণ করে নিরাপদ ব্যাগে ঢোকানো হয়। এ সময় সাপের নড়াচড়া ও আচরণ খুব সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হয়।
এক মুহূর্তের অসতর্কতাই বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। কয়েকবার অবিষধর সাপের কামড় খেলেও এতে আতঙ্কিত হননি কোর্টনি। কারণ সাধারণত কোন প্রজাতির সাপের সঙ্গে কাজ করছেন, তা আগে থেকেই শনাক্ত করতে পারেন তিনি।
উদ্ধারের পর সাপগুলোকে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া হয়। কোর্টনির দাবি, সঠিক পরিবেশে ছেড়ে দিলে একই সাপ আবার সেই বাড়িতে ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম।
গরমের মৌসুমে তার ব্যস্ততা বেড়ে যায়। দিনে প্রায় ১০টি পর্যন্ত সাপ উদ্ধারের ডাক আসে। একা কাজ করার কারণে একদিকে যেমন শারীরিক চাপ বাড়ে, অন্যদিকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে সাপটিকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চাপও থাকে।
তবে এত ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যেও কোর্টনির কাছে সাপই সবচেয়ে বড় ভয় নয়। তার মতে, অপরিচিত মানুষের আচরণ এবং অজানা জায়গায় একা যাওয়ার ঝুঁকিই এই পেশার সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়।
সাপকে শান্ত ও ভুল বোঝা প্রাণী হিসেবে দেখেন কোর্টনি। মানুষের মধ্যে সাপ নিয়ে অযথা ভয় কমিয়ে সচেতনতা তৈরি করাই তার কাজের অন্যতম উদ্দেশ্য। তার মতে, সবাইকে সাপ ভালোবাসতে হবে না, তবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাপের গুরুত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা জরুরি।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম