যোগফল প্রতিবেদক:
দক্ষ ও উৎপাদনশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে (TVET) জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নীতিনির্ধারক, সরকারি কর্মকর্তা, শিল্পখাতের প্রতিনিধি ও কারিগরি শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলেন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে বিকল্প বা গৌণ শিক্ষা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে TVET-কে শিক্ষাব্যবস্থার মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে।
রোববার (২৩ আগস্ট) রাজধানীর সোবহানবাগের ড্যাফোডিল প্লাজায় ৭১ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘দক্ষ ও উৎপাদনশীল বাংলাদেশের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিষয়ক জাতীয় সংলাপ’-এ বক্তারা এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটস ফোরামের আয়োজনে এবং ড্যাফোডিল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও সিসিএন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের যৌথ ব্যবস্থাপনায় এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. এ. এন. এম. এহসানুল হক মিলন। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (যুব ও কর্মসংস্থান বিষয়ক) সাইয়েদ বিন আব্দুল্লাহ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা এবং বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খান।
সংলাপে বাংলাদেশ কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, ASSET প্রকল্প, বিভিন্ন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের বিশাল তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দেশের জন্য বড় সম্ভাবনা। তবে শুধু কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি হলেই জনমিতিক লভ্যাংশ নিশ্চিত হবে না। শিল্পখাত এবং দেশ-বিদেশের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে সমন্বিত জাতীয় কৌশল প্রয়োজন।
এ জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মসংস্থানযোগ্যতা, উৎপাদনশীলতা, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
সংলাপে TVET প্রসারের অন্যতম বাধা হিসেবে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি উঠে আসে। শ্রমবাজারে কারিগরি দক্ষতার চাহিদা থাকলেও অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক এখনো প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে বেশি মর্যাদাপূর্ণ মনে করেন।
কারিগরি পেশার সামাজিক মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানান বক্তারা। পাশাপাশি সফল TVET গ্র্যাজুয়েট, দক্ষ টেকনিশিয়ান, পেশাজীবী ও উদ্যোক্তাদের সাফল্যের গল্প তুলে ধরে তরুণদের কারিগরি শিক্ষায় উৎসাহিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কারিগরি শিক্ষাকে শ্রমবাজারের উপযোগী করতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা।
পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, দক্ষতার মান নির্ধারণ, মূল্যায়ন ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণে নিয়োগকর্তাদের আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার পাশাপাশি শিক্ষানবিশি, ইন্টার্নশিপ ও কর্মক্ষেত্রভিত্তিক শিক্ষা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে TVET-এর পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষক-প্রশিক্ষকদের দক্ষতা নিয়মিত হালনাগাদ করার আহ্বান জানানো হয়।
অংশগ্রহণকারীরা বলেন, শুধু সার্টিফিকেট বা ডিপ্লোমা অর্জনকে TVET ব্যবস্থার সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষার্থীরা অর্থবহ কর্মসংস্থান পাচ্ছেন কি না, কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন কি না, উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠছেন কি না এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারছেন কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
এ জন্য প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিতকরণ, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদ এবং ব্যবহারিক দক্ষতার মূল্যায়ন জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনার বিষয়টিও সংলাপে গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে গেলেও তাদের একটি বড় অংশ তুলনামূলক কম দক্ষ ও কম আয়ের পেশায় কাজ করছেন।
শ্রম রপ্তানিকারক দেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে বিদেশি ভাষা, যোগাযোগ দক্ষতা, কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পেশাগত সনদ অর্জনের সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে যে দেশে কর্মী পাঠানো হবে, সেই দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
সংলাপ থেকে TVET-কে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার মূলধারায় প্রতিষ্ঠা, শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ, শিক্ষানবিশি ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ বৃদ্ধি, শিক্ষক-প্রশিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সনদের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং উচ্চ-মূল্যের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষায়িত দক্ষতা উন্নয়নের সুপারিশ উঠে আসে।
বক্তারা মনে করেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ, কর্মসংস্থানযোগ্য এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষম জনশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম