যোগফল প্রতিবেদক:
জন্মের পর থেকেই মায়ের সঙ্গে কারাগারে থাকা শিশু মোবাশ্বিরা খানম রাথী এখন বাবার কাছে ফেরার অপেক্ষায়। দীর্ঘ ছয় বছর কারাগারের পরিবেশে শৈশব কাটানোর পর অবশেষে মায়ের মুক্তির পথ তৈরি হয়েছে। নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় খালাস পেয়েছেন রাথীর মা কামরুন নাহার মণি।
২০১৯ সালে নুসরাত হত্যা মামলায় পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গ্রেপ্তার হন কামরুন নাহার মণি। ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর কারাগারে প্রসববেদনা উঠলে তাকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন তিনি। দুই দিন হাসপাতালে পরিবারের সঙ্গে থাকার পর শিশুটিও মায়ের সঙ্গে কারাগারে চলে যায়।
শিশুটির নাম রাখা হয় মোবাশ্বিরা খানম রাথী। মণি তাকে ‘রোজা’ নামে ডাকেন বলেও জানা গেছে। নিম্ন আদালতে মামলার রায় ঘোষণার সময় মাত্র এক মাস বয়সী রাথী ছিল মায়ের কোলে।
দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে সোমবার (২৪ আগস্ট) নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার বেঞ্চ ১০ আসামিকে খালাস দেন। তাদের একজন কামরুন নাহার মণি।
মণির খালাসের পর তার স্বামী রাশেদুল আলম খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি মেয়েকে কাছে না পাওয়ার দীর্ঘদিনের কষ্টের কথা তুলে ধরেন।
রাশেদুল আলম খান লেখেন, বাবা হয়েও এখনো বাবা হওয়ার স্বাদ পাননি তিনি। নিরাপত্তার কারণে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরার সুযোগও হয়নি। কারাগারে দেখা করতে গেলে কখনো জানালার ফাঁক দিয়ে মেয়ের ছোট্ট পায়ের আঙুল ছুঁয়ে দিতেন। পরে কাশিমপুর কারাগারে দুই ফুট দূরত্বের খাঁচার ওপাশ থেকে মেয়েকে দেখতেন। ছোট্ট রাথী বাবাকে চিনত না—এই বিষয়টিই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিত।
আগামী ২১ সেপ্টেম্বর রাথীর সাত বছর পূর্ণ হবে। বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়েকে ছাড়া তিনি এ পর্যন্ত ১৪টি ঈদ ও সাতটি জন্মদিন পার করেছেন। এখন দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর মেয়ের সামনে কীভাবে দাঁড়াবেন এবং রাথী তাকে চিনতে পারবে কি না—তা নিয়েই উৎকণ্ঠায় রয়েছেন তিনি।
২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। ১০ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলার ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে আসামিরা হাইকোর্টে আপিল ও জেল আপিল করেন।
সোমবারের রায়ে তৎকালীন মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। খালাস পাওয়া ১০ আসামির একজন কামরুন নাহার মণি।
দীর্ঘ ছয় বছর পর মায়ের মুক্তির অপেক্ষার পাশাপাশি এখন রাথীর সামনে নতুন এক অধ্যায়—কারাগারের গণ্ডি পেরিয়ে বাবার সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অপেক্ষা।
তানজিলা / অনলাইন
ডেস্ক / যোগফল.কম