যোগফল প্রতিবেদক:
একসময় গ্রামের নিম্নবিত্ত মানুষের খাবার হিসেবে পরিচিত ছিল কচু-লতি। সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা বদলে গেছে। এখন কুমিল্লার বরুড়ায় বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত কচু-লতি দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।
ধানের তুলনায় কচু-লতি চাষে লাভ বেশি হওয়ায় বরুড়ার অনেক কৃষক ধান চাষের পরিবর্তে এ সবজি চাষে ঝুঁকেছেন। বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে কচু-লতি চাষ হচ্ছে। এ চাষকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থানও।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বরুড়ায় বর্তমানে প্রায় ৪৫৯ হেক্টর জমিতে আড়াই হাজারের বেশি কৃষক বাণিজ্যিকভাবে কচু-লতি চাষ করছেন। বছরে প্রায় ১৭০ থেকে ১৮০ মেট্রিক টন কচু-লতি রপ্তানি হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৭ থেকে ১৮ কোটি টাকা।
উপজেলার আগানগর, ভবানীপুর, শিলমুড়ী উত্তর ও খোশবাস দক্ষিণ ইউনিয়নে কচু-লতির চাষ বেশি হচ্ছে। ২০১৫ সালের দিকে এ অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে কচু-লতি চাষ শুরু হয়। কম উৎপাদন খরচ, দ্রুত ফলন এবং তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ায় ধীরে ধীরে কৃষকদের মধ্যে এ চাষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বরুড়া থেকে বিপুল পরিমাণ কচু-লতি দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে পাঠানো হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কৃষকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ক্ষেত থেকে লতি সংগ্রহ করেন। পরে সেগুলো ট্রাকে করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। সেখান থেকে বাছাই করা উন্নতমানের কচু-লতি বিভিন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশের বাজারে পৌঁছে যায়।
ক্ষেত থেকে লতি সংগ্রহের পর তা পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করে আঁটি বাঁধা হয়। এরপর পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হয়। ভালো মানের মোটা ও লম্বা লতিই মূলত রপ্তানির জন্য বাছাই করা হয়।
বরুড়ার আগানগর ইউনিয়নের বিজয়পুর গ্রামে শনি ও মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের অন্যান্য দিন কচু-লতির হাট বসে। দুপুরের পর থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকরা লতি নিয়ে হাটে আসতে শুরু করেন। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররাও সেখানে জড়ো হন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাট জমজমাট হয়ে ওঠে।
বারাইপুর গ্রামের কৃষক হারুন উর রশীদ জানান, বর্তমানে প্রতি কেজি লতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। সপ্তাহে এক থেকে দুইবার লতি সংগ্রহ করে বিক্রি করা যায়। তিনি ৪৫ শতাংশ জমিতে কচু-লতি চাষ করে এ পর্যন্ত ৮০ হাজার টাকার বেশি বিক্রি করেছেন। তাঁর মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা।
আরেক কৃষক আব্দুল মতিন বলেন, এখন তাঁদের বাজারে নিয়ে যেতে হয় না। ব্যবসায়ীরাই অনেক সময় বাড়ি থেকে লতি সংগ্রহ করে নিয়ে যান। ভালো মানের মোটা লতি কেজিপ্রতি ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং চিকন লতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
পাইকারদের ভাষ্য, ভালো মানের কচু-লতি স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও পাঠানো হয়। ঢাকার বিভিন্ন আড়তে পাঠানোর পর রপ্তানিকারকদের মাধ্যমে এসব পণ্য বিদেশের বাজারে পৌঁছে যায়।
একজন পাইকার জানান, গত কয়েক বছর ধরে তিনি বরুড়া থেকে কচু-লতি কিনে ঢাকার যাত্রাবাড়ীর আড়তে পাঠাচ্ছেন। ভালো মানের লতি কয়েক ধাপ হাতবদল হয়ে রপ্তানিকারকদের মাধ্যমে বিদেশে যায়।
বরুড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, উপজেলার প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ সরাসরি কচু-লতি চাষের সঙ্গে জড়িত। কৃষকদের উৎপাদন বাড়ানো এবং বিদেশে রপ্তানির উপযোগী মান বজায় রাখতে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে কচু-লতি চাষ সম্প্রসারণে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে কৃষি বিভাগ। সঠিক চাষাবাদ ও মান নিশ্চিত করা গেলে এ সবজি রপ্তানির মাধ্যমে কৃষকদের আয় আরও বাড়ানো সম্ভব।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম