যোগফল প্রতিবেদক:
বাংলাদেশে ফাইভ-জি প্রযুক্তির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে শক্তিশালী অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন টেলিকম ও প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি ঘরে সাশ্রয়ী ও মানসম্মত ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে সমন্বিত ও শেয়ারড ফাইবার অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন তারা।
সম্প্রতি গাজীপুরের ছুটি রিসোর্টে টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত দিনব্যাপী কর্মশালা ‘ফিক্সড ব্রডব্যান্ড: ফিউচার অব বাংলাদেশ’-এ এসব কথা উঠে আসে।
কর্মশালায় টেলিকম ও প্রযুক্তি খাতের সাংবাদিক, বিশেষজ্ঞ এবং ব্রডব্যান্ড শিল্পের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় দেশের ব্রডব্যান্ড শিল্পের ভবিষ্যৎ, পুরোনো নীতিমালা সংস্কার, ফাইবার অবকাঠামোর নিরাপত্তা, স্থানীয় বিনিয়োগের সুরক্ষা, ইন্টারনেটের গতি ও মূল্য এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়।
তথ্যপ্রযুক্তি ও নেটওয়ার্ক বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ফাইভ-জি টাওয়ারের পূর্ণ সক্ষমতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি টাওয়ারে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ প্রয়োজন। শক্তিশালী ফাইবার নেটওয়ার্ক ছাড়া ফাইভ-জির শতভাগ সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, শুধু বাসাবাড়িতে নয়, মোবাইল নেটওয়ার্কের অবকাঠামোতেও শক্তিশালী ফাইবার সংযোগ পৌঁছে দিতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের যোগাযোগব্যবস্থা ক্রমেই বেশি ডেটানির্ভর হয়ে উঠছে।
সুমন সাবিরের মতে, শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রতিটি বাসাবাড়িতে আন্ডারগ্রাউন্ড ফাইবার পৌঁছে দেওয়া কোনো একক ছোট আইএসপির পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সর্বজনীন ব্রডব্যান্ড নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ও সমন্বিত অবকাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
কর্মশালায় ফাইবারনির্ভর ডিজিটাল সেবার সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে ইন্টারনেটভিত্তিক সেবার মাধ্যমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে মত দেন সুমন সাবির।
তার মতে, শুধু ফাইবার অবকাঠামো তৈরি করলেই ডিজিটাল বিপ্লব সম্পূর্ণ হবে না। এর পাশাপাশি প্রয়োজন দেশীয় সফটওয়্যার, অ্যাপ্লিকেশন ও ব্যবহারবান্ধব ডিজিটাল সেবা। দেশীয় মেধা ও প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যবসা ও সরকারি সেবায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবল ও আইটিসির মাধ্যমে পর্যাপ্ত ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করলে দেশের ইন্টারনেট ধীর হয়ে যায়—এমন ধারণার বাস্তব ভিত্তি নেই। বিদ্যমান সক্ষমতার সঠিক ব্যবহার ও কার্যকর নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ফাইবার অ্যাট হোমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মইনুল সিদ্দিকী বলেন, দীর্ঘদিন পর দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের নীতিমালায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা সময়োপযোগী।
তিনি বলেন, ২০০৬ সালের আইএলডিটিএস নীতিমালার প্রায় দুই দশক পর নতুন টেলিযোগাযোগ নীতিমালা চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন নীতিমালা প্রণয়নে শিল্পের বাস্তবতা, অংশীজনদের মতামত ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
আইটি ও টেলিকম খাতকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করে কার্যকর নীতিমালা তৈরি করা গেলে দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের গতি আরও বাড়বে বলেও মত দেন তিনি।
মইনুল সিদ্দিকী বলেন, ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক সাধারণত ১৫ থেকে ২০ বছর কার্যকর থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে অবকাঠামো সুরক্ষায় এখনো প্রয়োজনীয় নীতি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে।
তার মতে, একই এলাকায় পরিকল্পনাহীনভাবে বারবার নতুন নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হলে ছোট-বড় সব বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ে। কোন প্রতিষ্ঠান কী ধরনের নেটওয়ার্ক তৈরি করবে, কোথায় অবকাঠামো ভাগাভাগি করা হবে এবং বিনিয়োগ কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে—এসব বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।
বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগকে স্বাগত জানালেও টেলিযোগাযোগ খাতের লাভজনক অংশে স্থানীয় ও দেশীয় কোম্পানিগুলোকেও সমান সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত দেন মইনুল সিদ্দিকী।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় উদ্যোক্তারা এ খাতে বিনিয়োগ করে অবকাঠামো ও দক্ষতা তৈরি করেছেন। তাই টেলিযোগাযোগ খাতের উন্নয়নে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
কর্মশালায় দেশের ব্রডব্যান্ড শিল্পের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও উঠে আসে। মইনুল সিদ্দিকী বলেন, উন্নত দেশগুলোতে একজন ব্রডব্যান্ড গ্রাহক থেকে মাসে ৩০ থেকে ৫০ ডলার পর্যন্ত রাজস্ব পাওয়া গেলেও বাংলাদেশে তা ৫ থেকে ১০ ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
এই সীমিত আয়ের মধ্যেই নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং গ্রাহকদের উচ্চগতির ইন্টারনেট দিতে হচ্ছে। ফলে প্রতিটি ঘরে ১০০ এমবিপিএস বা তার বেশি গতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া শুধু প্রযুক্তিগত নয়, অর্থনৈতিকভাবেও বড় চ্যালেঞ্জ।
কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা বলেন, শক্তিশালী ফাইবার নেটওয়ার্ক, পরিকল্পিত অবকাঠামো, কার্যকর নীতিমালা এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সাশ্রয়ী ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
তাদের মতে, শক্তিশালী ফাইবারভিত্তিক অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশের আগামী দিনের ফাইভ-জি, স্মার্ট স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল শিক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির ভিত আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
তানজিলা / অনলাইন
ডেস্ক / যোগফল.কম