যোগফল প্রতিবেদক:
দেশে চাহিদার তুলনায় পেঁয়াজের উৎপাদন বেশি হলেও পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে প্রতিবছরই পেঁয়াজ আমদানি করতে হচ্ছে। সংরক্ষণকালীন পচন, ওজন কমে যাওয়া, অঙ্কুরোদগম ও গুণগত মানের অবনতির কারণে উৎপাদিত পেঁয়াজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পেঁয়াজ সংরক্ষণে ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। তাদের দাবি, পরীক্ষামূলক পর্যায়ের ফলাফলে এ প্রযুক্তি ব্যবহারে পেঁয়াজের সংরক্ষণকালীন ক্ষতি প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ কমানোর সম্ভাবনা দেখা গেছে। তবে গবেষণাটি এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাকৃবির আইসিটি সেলের পরিচালক ও কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রোস্তম আলী। গবেষক দলে রয়েছেন সহকারী গবেষক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী নাফিস সাদিক সায়েম এবং স্নাতক শিক্ষার্থী রাহাত মিয়া।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অর্থায়নে ২০২৫ সালের মার্চে শুরু হওয়া গবেষণাটি বর্তমানে পরীক্ষামূলক ও ফলাফল বিশ্লেষণ পর্যায়ে রয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘসময় পেঁয়াজ ভালো রাখতে সংরক্ষণ কক্ষের তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে সংরক্ষণ কক্ষের পরিবেশ পর্যবেক্ষণে সেন্সর ব্যবহার করা হচ্ছে।
সেন্সরের মাধ্যমে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ করা হবে। সংরক্ষণ পরিবেশে প্রয়োজনের তুলনায় পরিবর্তন দেখা দিলে সে অনুযায়ী বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
প্রযুক্তিটির নকশায় এয়ারফ্লো ব্যবস্থাপনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্যানের কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এর ফলে সংরক্ষণ কক্ষে পেঁয়াজের জন্য উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে পচনসহ অন্যান্য ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে।
গবেষণায় শুধু পেঁয়াজ কতদিন সংরক্ষণ করা যাচ্ছে, তা নয়; সংরক্ষণকালীন সময়ে ওজন হ্রাস, পচন ও গুণগত মানের পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিভিন্ন সংরক্ষণ পরিস্থিতিতে পেঁয়াজের তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো বিশ্লেষণ ও তুলনা করছেন গবেষকরা। এখন পর্যন্ত পাওয়া ফলাফলকে আশাব্যঞ্জক বলে জানিয়েছেন তারা।
গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. রোস্তম আলী বলেন, তুলনামূলকভাবে কম খরচে এমন একটি আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য। এর মাধ্যমে পেঁয়াজ সংরক্ষণের পরিবেশ নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
তিনি বলেন, পরিবেশগত পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গেলে পচন, ওজন হ্রাসসহ সংরক্ষণকালীন বিভিন্ন ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২৫ এপ্রিল ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৪২ দশমিক ৬৪ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। বিপরীতে বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ টন। অর্থাৎ উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশি।
এরপরও ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৮৬ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে।
অধ্যাপক রোস্তম আলী বলেন, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় কৃষককে অনেক সময় ফসল তোলার পরপরই পেঁয়াজ বিক্রি করে দিতে হয়। ফলে মৌসুমে বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে কৃষক কিছুদিন পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে বাজার পরিস্থিতি বুঝে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এতে একদিকে কৃষক ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে বছরজুড়ে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।
অধ্যাপক ড. মো. রোস্তম আলী বলেন, এ গবেষণার উদ্দেশ্য ফলন বাড়ানো নয়; বরং উৎপাদনের পরবর্তী অপচয় কমিয়ে কৃষকের আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা।
তিনি জানান, গবেষণাটি এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। পরীক্ষামূলক ফলাফল বিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা আরও উন্নত করার কাজ চলছে। পরবর্তী ধাপে বৃহত্তর পরিসরে বাস্তব সংরক্ষণ পরিবেশে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা যাচাই করা হবে।
ফলাফল সন্তোষজনক হলে কৃষক ও বাণিজ্যিক সংরক্ষণ কেন্দ্রে পাইলট পর্যায়ে প্রযুক্তিটির প্রয়োগ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ ও কারিগরি সহায়তা পাওয়া গেলে আগামী দুয়েক বছরের মধ্যে মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের উপযোগী একটি পাইলট মডেল তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করছেন গবেষকরা।
তানজিলা / অনলাইন
ডেস্ক / যোগফল.কম