যোগফল প্রতিবেদন:
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ গোলাম কিবরিয়া পিয়ালের বিরুদ্ধে ঠিকাদারের থেকে মোটা অঙ্কের অনৈতিক কমিশন দাবি, কাজ আটকে রাখা এবং লাইসেন্স বাতিলের হুমকির মতো মারাত্মক সব অনিয়ম ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ করা সত্ত্বেও বিল পেতে ঠিকাদারকে গুনতে হচ্ছে নির্ধারিত হারের কমিশন-এমন চাঞ্চল্যকর তথ্যে এলজিইডি ও স্থানীয় ঠিকাদার মহলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।
ঘটনাটি আমলে নিয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় অভিযুক্ত ওই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের নেপথ্যে যা ঘটেছে:
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি-৪) আওতায় নান্দাইল উপজেলার নারায়ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং দেউল ডাংরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। নিয়মমাফিক প্রক্রিয়ায় কাজটি পান মেসার্স সাকিন কনস্ট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. সাইফ উদ্দীন হিরা অভিযোগ করেন, কাজ তদারকি ও চলমান প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই নান্দাইল উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ গোলাম কিবরিয়া পিয়াল নানা অজুহাতে স্বেচ্ছাচারিতা শুরু করেন। নির্মাণকাজ চলাকালেই মৌখিক ও বেআইনি আদেশে কাজ বন্ধ রাখার মতো ঘটনা ঘটানো হয়। পরবর্তীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিলের আবেদন করলে প্রকৌশলী কিবরিয়া পিয়াল বিল পাসের বিনিময়ে মোট বরাদ্দের ৫ শতাংশ (৫%) অনৈতিক কমিশন দাবি করেন।
ঠিকাদার মো. সাইফ উদ্দীন হিরা এই কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় বিপত্তি। অভিযোগ অনুযায়ী, কমিশন না দেওয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঠিকাদারের পাওনা বিলের অর্থ আটকে রাখা হয়। শুধু তা-ই নয়, প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া পিয়াল ঠিকাদারকে ভবিষ্যতে আর কোনো কাজ না দেওয়া এবং সরকারি লাইসেন্স বাতিল করিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন বলেও লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালযের তদন্তের নির্দেশ ও চিঠির বিবরণ:
উপজেলা প্রকৌশলীর এমন টানা অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করে ভুক্তভোগী ঠিকাদার মেসার্স সাকিন কনস্ট্রাকশনের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়।
অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন-১ শাখা থেকে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে:
১. উপজেলা প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া পিয়ালের বিরুদ্ধে অনৈতিকভাবে ৫% কমিশন দাবি ও হুমকি দেওয়ার বিষয়টির সত্যতা যাচাই করতে হবে।
২. মৌখিক আদেশে আইনবহির্ভূতভাবে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা এবং পাওনা অর্থ আটকে রেখে ঠিকাদারকে হয়রানি করার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে।
৩. পুরো বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে স্পষ্ট প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে।
অভিযুক্ত প্রকৌশলীর বক্তব্য:
অভিযোগের বিষয়ে নান্দাইল উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ গোলাম কিবরিয়া পিয়ালের মুঠোফোনে যোগফল’কে জানান, অভিযোগ হয়েছে , তদন্ত হবে, তারপর বিস্তারিত সত্য মিথ্যা সামনে আসবে।
স্থানীয় ঠিকাদারদের মধ্যে অসন্তোষ:
নান্দাইলে এলজিইডির অধীনের উন্নয়নমূলক কাজে এমন অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে স্থানীয় অন্যান্য ঠিকাদারদের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, উপজেলার বিভিন্ন অবকাঠামোগত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকাজে নানা অযুহাতে বিল আটকে রেখে কমিশন আদায়ের সংস্কৃতি বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে।
আইনানুযায়ী তদন্ত শেষে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও স্থানীয় সচেতন মহল।
যোগফল ডেস্ক