যোগফল প্রতিবেদক:
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত শয্যা, ডায়াগনস্টিক কিট, ওষুধ ও স্যালাইনের সরবরাহ নিশ্চিত করেছে সরকার। ফলে গত তিন বছরের তুলনায় চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের জন্য ডেঙ্গু চিকিৎসা সহজলভ্য করা, ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের কারণে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার ০.৩১ শতাংশে রাখা সম্ভব হয়েছে। ৬ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ২৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয় এবং মৃত্যুর হার ছিল ০.৫৩ শতাংশ। ২০২৪ সালে ৪৮২ জনের মৃত্যুতে এই হার ছিল ০.৪৯ শতাংশ। ২০২৫ সালে ৩২৩ জনের মৃত্যুতে মৃত্যুর হার দাঁড়ায় ০.৩৪ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে মৃত্যুর হার ছিল ০.৪২ শতাংশ।
সরকারি নির্দেশনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস ও ডেডিকেটেড ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু, পর্যাপ্ত ডায়াগনস্টিক কিট ও স্যালাইন মজুত এবং সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু এনএস১ পরীক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে।
রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ২২৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। হাসপাতালের দুটি ফ্লোরকে ডেডিকেটেড ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রূপান্তর করে শয্যা সংখ্যা ৬০ থেকে বাড়িয়ে ২০০ করা হয়েছে। এর মধ্যে শিশুদের জন্য ২০টি এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৪০টি শয্যা নির্ধারিত ছিল।
হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম জানান, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা হয়েছে। এতে রোগীরা ওয়ার্ড থেকে বের না হয়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন।
তিনি জানান, ডেঙ্গু চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের নিয়ে সম্প্রতি ইন-হাউস সেমিনার হয়েছে। এ ছাড়া মেডিসিন ও শিশু বিভাগের চিকিৎসকরা নিয়মিত সকালে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সেশন পরিচালনা করছেন।
অন্যদিকে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ২৩১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। হাসপাতালের ৪০২, ৫০২ ও ৭০২ নম্বর ডেডিকেটেড ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ৭০২ নম্বর ওয়ার্ডটি নারী রোগীদের জন্য নির্ধারিত।
ঢামেক ডেঙ্গু ইউনিটের প্রধান অধ্যাপক শাহনুর শারমিন মুন্নি জানান, প্রতিটি ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যা সংখ্যা প্রায় ৫০টি হলেও রোগীর চাপ অনুযায়ী অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় আইভি ফ্লুইড (স্যালাইন), আইভি সেট, প্যারাসিটামল, বমি ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ এবং প্লাজমা সলিউশনের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে।
ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় কুর্মিটোলা মাল্টিকেয়ার স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসা সক্ষমতা আরও ১০০ শয্যা বাড়ানো হয়েছে। হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাইদুর রহমান জানান, হাসপাতালের অষ্টম তলায় নতুন ১০০টি শয্যা চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫০টি পুরুষ ও ৫০টি নারী রোগীদের জন্য।
তিনি জানান, ডেঙ্গু চিকিৎসায় বিদ্যমান স্বাস্থ্যকর্মীদের সহায়তা করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ছয়জন চিকিৎসক ও ১০ জন নার্স নিয়োগ দিয়েছে।
১ হাজার ২০০ শয্যার এই হাসপাতালে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ১০৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। জরুরি বিভাগের ৫০টি শয্যার পাশাপাশি প্রায় ২০০টি শয্যা বিশেষভাবে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য রাখা হয়েছে।
হাসপাতালটির পরিচালক জানান, সব ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয় না। সাধারণত রক্তপাত, তীব্র ডায়রিয়া বা অনিয়ন্ত্রিত বমির মতো গুরুতর উপসর্গ থাকা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ডেঙ্গু সংক্রমণের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হটস্পট হিসেবে খুলনা আবির্ভূত হওয়ায় সেখানে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সংক্রমণের তীব্রতা বিবেচনায় খুলনা শহরের বিভিন্ন এলাকায় নয়টি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেও সপ্তাহজুড়ে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়েছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চারটি ওয়ার্ড ও সংলগ্ন বারান্দায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কেসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক দিনের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে হাসপাতালে ৩০টি শয্যা সরবরাহ করা হয়েছে। এতে হাসপাতালটির ডেঙ্গু চিকিৎসা সক্ষমতা বেড়ে ১৫০ শয্যায় দাঁড়িয়েছে।
সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ওয়ার্ডে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা এবং খুলনা ডায়াবেটিক সমিতিতে ১০০ টাকায় ডেঙ্গু পরীক্ষার সুবিধা চালু করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মো. নুরুল ইসলাম জানান, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেওয়ায় রোগীর চাপ সামলাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ফিল্ড হাসপাতাল পুনরায় চালুর বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার।
একই সঙ্গে ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি করতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের কিছু রোগীকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তরের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
ডা. নুরুল ইসলাম জানান, বিভিন্ন হাসপাতালের স্যালাইন মজুতের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আগামী মাসগুলোর সম্ভাব্য চাহিদা বিবেচনায় সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপো (সিএমএসডি) ও এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডকে (ইডিসিএল) পর্যাপ্ত মজুত রাখতে বলা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইডস কর্মসূচির মাধ্যমে সম্প্রতি বাংলাদেশকে পাঁচ লাখ ডেঙ্গু এনএস১ র্যাপিড ডায়াগনস্টিক টেস্ট কিট দেওয়া হয়েছে। ফলে দেশের যেকোনো এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ডেঙ্গু রোগীদের শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ নিশ্চিত করতে ২০২৫ সালের ডেঙ্গু চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী ১ হাজার ৬০০ চিকিৎসককে ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান ডা. নুরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, হাসপাতালে ডেঙ্গুর নতুন সংক্রমণ ঠেকাতে রোগীরা যাতে নিয়মিত মশারি ব্যবহার করেন, সেটিও নিশ্চিত করছে কর্তৃপক্ষ।
তানজিলা / অনলাইন
ডেস্ক / যোগফল.কম