যোগফল প্রতিবেদক:
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী জাকারিয়া খান হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে মামলায় আসামি করা কয়েকজন ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন না বলে দাবি করেছেন তাদের স্বজনরা। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে শিক্ষার্থীরা এ বিক্ষোভ ও কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় জাকারিয়া হত্যায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানানো হয়।
এর আগে শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে সাতক্ষীরা শহরের পশু হাসপাতালের পাশে একটি চায়ের দোকানে কয়েকজন যুবকের সঙ্গে দোকানির কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে দোকানিকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে জাকারিয়া খানকে এক যুবক বুকে ও পেটে ছুরিকাঘাত করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় শনিবার জাকারিয়ার ভাই শাহারিয়ার খান বাদী হয়ে সাতক্ষীরা সদর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৬ থেকে ৭ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
মামলার পর হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা যাচাই করতে শহরের ইটাগাছা এলাকার মুহিদ হাসান বনিকে আটক করে পুলিশ। পরে তাকে মামলার ২ নম্বর আসামি করা হয়। তবে বনির পরিবারের দাবি, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না।
পরিবারের দাবি, ঘটনার রাতে বনি ইটাগাছায় নিজ বাসায় ছিলেন। রাত ১১টা ২৪ মিনিটে তিনি বাসা থেকে বের হয়ে নিউ মার্কেট এলাকার একটি ফলের জুসের দোকানে যান। রাত ১১টা ৩৫ থেকে ১১টা ৩৯ মিনিট পর্যন্ত তাকে ওই দোকানে দেখা গেছে বলেও দাবি পরিবারের। এ ছাড়া ঘটনার সময় দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের পোশাকের সঙ্গে বনির পোশাকের মিল নেই বলেও দাবি করা হয়েছে।
বনির মা মাজেদা খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলে সম্পূর্ণ নির্দোষ। ঘটনার সময় সে বাড়িতে আমার পাশেই ছিল। রাতে হঠাৎ পুলিশ এসে তাকে নিয়ে যায়। আমি চাই সঠিক তদন্ত হোক এবং প্রকৃত দোষীদের বিচার হোক।’
তিনি জানান, আগামী ১৪ অক্টোবর থেকে বনির অনার্স প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। তাকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ারও দাবি জানান তিনি।
মামলার ৫ নম্বর আসামি জুয়েল হোসেনও নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তার ভাষ্য, ঘটনার দিন বিকেল ৫টার দিকে মাছের গাড়ি নিয়ে তিনি চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হন। পথে বিভিন্ন স্থানে টোল দিয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছান। তার মোবাইলের লোকেশন ও কলের তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা তদন্তের দাবি জানান তিনি।
এদিকে মামলার ৬ নম্বর আসামি সাগর হোসেনের পরিবারের দাবি, তিনি গত ১৪ সেপ্টেম্বর কাজের জন্য ঢাকা বিমানবন্দর থেকে সৌদি আরবে যান এবং বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন। ৭ নম্বর আসামি রনি সম্প্রতি বিদেশ থেকে দেশে ফিরে বিয়ে করেছেন এবং ঘটনার দিন শ্বশুরবাড়িতে ছিলেন বলেও দাবি করেছে তার পরিবার। বনি ও রনি আপন ভাই বলে জানা গেছে।
এদিকে মঙ্গলবার ভোররাতে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও সদর থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে মামলার প্রধান আসামি নাহিদ হাসান (২৬) এবং তদন্তে সন্দিগ্ধ অমিত হাসান ওরফে শিপনকে (৩০) গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, ভারতে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিকালে কালিগঞ্জের শুইলপুর গ্রাম থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নাহিদ মামলার এজাহারভুক্ত ১ নম্বর আসামি।
নিহত জাকারিয়ার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ ও রিফাত বলেন, জাকারিয়া একজন সাধারণ শিক্ষার্থী ছিলেন এবং কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। গোলযোগ থামাতে গিয়ে তিনি হামলার শিকার হন। তারা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
মামলার বাদী শাহারিয়ার খান বলেন, ‘আমার ভাই একজন সাধারণ কলেজছাত্র। আমি তার হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই। যারা হত্যার সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হোক।’
সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি জনবহুল বাজার এলাকার একটি চায়ের দোকানের কাছে ঘটে। সেখানে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছিল। প্রাথমিকভাবে চা খাওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে জাকারিয়া হামলার শিকার হন।
ওসি বলেন, তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। এরপর আইন অনুযায়ী আদালত পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।
তানজিলা / অনলাইন
ডেস্ক / যোগফল.কম