জন্মের মাত্র তিন দিনের মাথায় মাকে হারিয়েছিল ৯ বছরের আরিফিন ইসলাম আরফা। মায়ের অভাব যেন মেয়েটি বুঝতে না পারে, সেই চেষ্টা করে একাই তাকে আগলে রেখেছিলেন বাবা তাজুল ইসলাম। কিন্তু গত ১৮ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুতে বাবাকেও হারিয়েছে ছোট্ট আরফা।
এখন দাদি ও চাচাদের স্নেহ-ছায়ায় বেড়ে উঠছে মা-বাবাহারা এই শিশু। তবে তাকে ঘিরে পরিবারের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা—আরফার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
মোবাইল ফোনে বাবার সঙ্গে নিজের ছবি দেখাচ্ছিল আরফা। এরপর দেখায় মা-বাবার বিয়ের ছবি। একপর্যায়ে কবরের পাশে তোলা নিজের ছোটবেলার একটি ছবি দেখিয়ে বলে, ‘এটি মায়ের কবর।’ পরে আরেকটি ছবি দেখিয়ে বলে, ‘এটি বাবার কবর।’ সে জানায়, মাকে নানাবাড়িতে এবং বাবাকে বাবার বাড়িতে দাফন করা হয়েছে।
মা-বাবার কথা বলতে বলতে প্রিয় বিড়াল ‘ভুতুম’কে কোলে নিয়ে কিছুক্ষণ মন খারাপ ভুলে যায় আরফা। এরপর রংপেনসিল নিয়ে ছবি আঁকতে বসে।
রাজধানীর পশ্চিম রামপুরার একটি বাসায় পরিবারের সঙ্গে থাকত আরফা। তাজুল ইসলাম সেখানে একটি মুদিদোকান চালানোর পাশাপাশি ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ডিলার ছিলেন। আরফা রামপুরা একরামুন্নেছা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। আগে বাবার সঙ্গে স্কুলে গেলেও এখন দাদির সঙ্গে স্কুলে যায়।
আরফার দাদি সখিনা বেগম ও বড় চাচা মো. শফিকুল ইসলাম জানান, দাদা-দাদি ও চাচারা সবাই আরফার দেখাশোনা করবেন। তবে বাবা বেঁচে থাকলে মেয়েটি যেভাবে বড় হতো, এখন চাইলেও হয়তো সেভাবে বড় করা সম্ভব হবে না। এত অল্প বয়সে মা-বাবা দুজনকে হারানো শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়েই তাদের দুশ্চিন্তা।
শফিকুল ইসলাম বলেন, স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাজুল ইসলাম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। মেয়ের কথা চিন্তা করে আর বিয়ে করেননি। একাই আরফার মা ও বাবার দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন সময়ে যক্ষ্মা, করোনা ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলেও নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে খুব একটা সচেতন ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।
শফিকুল ইসলাম আরও জানান, মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য তাজুল কোনো সঞ্চয় রেখে যেতে পারেননি। তার মৃত্যুর পর পাওনাদাররা টাকা চাইতে আসছেন। একদিকে দেনা পরিশোধের চাপ, অন্যদিকে আরফার ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে পরিবারটি দুশ্চিন্তায় রয়েছে।
তাজুল ইসলাম ও তার স্ত্রী মারুফা আক্তার দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। প্রেমের সম্পর্কের পর পারিবারিকভাবে ২০১৪ সালে তাদের বিয়ে হয়। ২০১৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি আরফার জন্মের পর শারীরিক জটিলতায় নড়াইল থেকে যশোরে নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সে মারা যান মারুফা। পরে পরিবারের সদস্যরা আরফাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। এরপর দাদি সখিনা বেগম মায়ের মতো আদর-স্নেহে তাকে বড় করে তুলছেন।
সখিনা বেগম বলেন, ‘আমারও তো বয়স হয়েছে। কখন কী হয়। নাতনিটা আরেকটু বড় হলে আমার ছেলেটা মারা গেলে চিন্তা একটু কম হতো। আমার ছেলেরা ভালো জায়গা থেকে পড়াশোনা করেছে, হালাল আয় করে। কিন্তু তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। সরকার বা অন্য কেউ আমার নাতনির পাশে দাঁড়াতে চাইলে আপত্তি করব না।’
বড় চাচা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা তিন ভাই, এক বোন ছিলাম। তাজুল ছিল ছোট। আমরা তো ভাবতেও পারিনি মশার কামড়ে আমাদের ভাইটা সবার আগে চলে যাবে। সরকার ডেঙ্গু মশা নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে, কিন্তু আমরা ফল তো পাচ্ছি না।’
বাবার কথা মনে পড়লে এখনও মন খারাপ হয়ে যায় আরফার। বাবার সঙ্গে দোকানে যাওয়া, ঘুরতে যাওয়া কিংবা বাবার কাছ থেকে টাকা পাওয়ার স্মৃতি মনে করে সে বলে, ‘বাবা ছাড়া কিছুই ভালো লাগে না।’
মা-বাবা দুজনকেই হারিয়ে এখন দাদি-চাচারাই আরফার একমাত্র ভরসা। তাদের স্নেহে শিশুটি বেড়ে উঠবে—এটাই পরিবারের আশা। তবে তার পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি একটি নিরাপদ অবলম্বন।
তুলি আক্তার/ অনলাইন ডেস্ক/ যোগফল. কম