যোগফল প্রতিবেদক:
মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-২০২৬’ পাসের ফলে দেশে কিডনি ও লিভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ প্রতিস্থাপনে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নিকটাত্মীয়ের বাইরে ‘ইমোশনাল ডোনার’ বা নিঃস্বার্থবাদী দাতার অঙ্গদানের আইনি সুযোগ তৈরি হওয়ায় রোগীদের বিদেশমুখিতা কমার পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয়ও সাশ্রয় হবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও আইনজীবীরা।
আইন অনুযায়ী, সরকারের অনুমতি নিয়ে অনুমোদিত নির্দিষ্ট হাসপাতালেই মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন করা যাবে। সুস্থ ও স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন কোনো জীবিত ব্যক্তি অঙ্গ বিযুক্তির ফলে নিজের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি না হলে নিকটাত্মীয়ের জন্য অঙ্গ দান করতে পারবেন। একই শর্তে নিঃস্বার্থবাদী দাতাও নিকটাত্মীয় নন এমন কোনো ব্যক্তিকে অঙ্গ দান করতে পারবেন।
তবে চক্ষু, চর্ম, টিস্যু ও অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয় বা নিঃস্বার্থবাদী দাতা হওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।
নিঃস্বার্থবাদী দাতা নির্ধারণ ও অনুমতি প্রদান কমিটির সভাপতি এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, নতুন আইন দেশে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে। ইমোশনাল ডোনারের সুযোগ তৈরি হওয়ায় নিকটাত্মীয়ের বাইরে থেকেও অঙ্গদানের আইনি ব্যবস্থা হয়েছে।
তিনি জানান, গত ১০ আগস্ট বিএমইউতে প্রথমবারের মতো ইমোশনাল ডোনারের কাছ থেকে পাওয়া কিডনি সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। দেশে কিডনি ও লিভার প্রতিস্থাপনের সুযোগ বাড়লে এসব চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান হাওলাদার জানান, সরকারি অনুদানে বিএমইউতে ইতোমধ্যে ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। একটি লিভার প্রতিস্থাপনে প্রায় ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। বিদেশে চিকিৎসা নিতে গেলে এর সঙ্গে বিমানভাড়া, হোটেলসহ অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হয়। দেশে উন্নত ও নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করা গেলে চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
নতুন আইনে ব্রেইন ডেথ ঘোষণার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে ব্রেইন ডেথ ঘোষণা করতে হলে কিছু শর্তসাপেক্ষে তাকে অন্তত ১২ ঘণ্টা সুস্পষ্ট কারণে অবিরাম কোমা অবস্থায় থাকতে হবে।
২ থেকে ১৩ বছর বয়সী শিশুর ব্রেইন ডেথ ঘোষণার ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রোএনসেফালোগ্রাম (ইইজি) পরীক্ষার মাধ্যমে অন্তত ১২ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
মেডিসিন, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন, নিউরোলজি ও অ্যানেসথেশিওলজি বিষয়ের অন্তত তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি ব্রেইন ডেথ ঘোষণা করতে পারবে। তবে এ কমিটির কোনো চিকিৎসক বা তার নিকটাত্মীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারবেন না।
আইন অনুযায়ী, ব্রেইন ডেথ ঘোষিত ব্যক্তির ক্যাডাভেরিক অঙ্গ সংগ্রহের ক্ষেত্রে দাতার বয়স ২ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে হতে হবে। জীবিত দাতার ক্ষেত্রে বয়স হতে হবে ১৮ থেকে ৬৫ বছর। বিশেষ প্রয়োজনে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে বয়সসীমা শিথিল করা যাবে।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গ্রহীতার বয়স ২ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে হতে হবে। তবে ১৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী ব্যক্তিরা অঙ্গ গ্রহীতার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। কর্নিয়া, চর্ম ও টিস্যু প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য নয়।
আইনে নিঃস্বার্থবাদী বা ইমোশনাল ডোনারের জন্যও নির্দিষ্ট যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। দাতাকে ১৮ বছরের বেশি বয়সী, মানসিকভাবে সুস্থ এবং সজ্ঞানে সম্মতি প্রদানে সক্ষম হতে হবে। কোনো আর্থিক প্রলোভন বা চাপ ছাড়া স্বেচ্ছায় অঙ্গদানে আগ্রহী হতে হবে। তিনি গ্রহীতার নিকটাত্মীয় না হলেও দীর্ঘদিনের পরিচিত হতে পারেন।
তবে মাদকাসক্ত, আর্থিক প্রলোভনে অঙ্গদানে আগ্রহী ব্যক্তি কিংবা সাধারণ অঙ্গদাতা হিসেবে অনুপযুক্ত কোনো ব্যক্তি নিঃস্বার্থবাদী দাতা হতে পারবেন না। এ ধরনের দাতাকে নির্ধারণ ও অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ প্রয়োজন হবে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, আগে আইনে দাতার সংজ্ঞা সংকীর্ণ থাকায় মূলত নিকটাত্মীয়দের মধ্যেই অঙ্গদানের সুযোগ সীমিত ছিল। এ সীমাবদ্ধতা দূর করতে তিনি হাইকোর্টে রিট মামলা করেন।
তিনি বলেন, হাইকোর্টের রায়ের পর যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে ইমোশনাল ডোনারের কাছ থেকে কিডনিসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গ্রহণের পথ তৈরি হয়। এর ধারাবাহিকতায় নতুন আইন পাস হয়েছে। আইনটির সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে দেশে অঙ্গদানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং রোগীদের বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা কমবে।
আইনের ১৮ ধারায় মানবদেহের কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয়, এর বিনিময়ে কোনো সুবিধা গ্রহণ এবং এ বিষয়ে বিজ্ঞাপন বা প্রচারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নিকটাত্মীয়তার বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়া, কাউকে এমন তথ্য দিতে উৎসাহিত বা প্ররোচিত করা কিংবা ভয় দেখানো অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
এ ছাড়া আইনের অন্য কোনো বিধান লঙ্ঘন বা লঙ্ঘনে সহায়তা করলে সর্বোচ্চ তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
কোনো চিকিৎসক এ আইনের অধীনে অপরাধে দণ্ডিত হলে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল কর্তৃক দেওয়া তার নিবন্ধন বাতিল হবে। কোনো হাসপাতালে এ আইনের অধীনে অপরাধ সংঘটিত হলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজনের অনুমতি বাতিলের পাশাপাশি অর্থদণ্ড আরোপ এবং হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিত করা যেতে পারে।
নতুন আইন কার্যকর হলে দেশে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি রোগীদের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমবে এবং ব্যয়ও সাশ্রয় হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তানজিলা / অনলাইন
ডেস্ক / যোগফল.কম